উৎপাত বেড়েছে ফিটফাট বাহিনীর
ট্রেন আসার সঙ্গে সঙ্গে তৎপর হয়ে পড়ে ১০-১৫ জনের একটি দল। চেহারা যেনতেন হলেও পোশাক আশাকে ফিটফাট। সান্তাহার রেল স্টেশনে তাদের পরিচয় ‘ফিটফাট বাহিনী’ হিসেবে। তাদের অনেকের হাতে ব্যাগও রয়েছে। প্রথমে যে কেউ দেখলে যাত্রী মনে করবে। কিন্তু আসলে তারা প্রত্যেকেই প্রতারক। হুড়োহুড়ি করে ট্রেনে ওঠার ভান করে সাধারণ যাত্রীদের পকেট কাটে। চুরি করে মোবাইল ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী।
গত ছয় মাসে রেলওয়ে পুলিশের হাতে থাকা এ ধরনের ১৮টি অভিযোগের একটিও সুরাহা না হওয়ায় বেপরোয়া ফিটফাট বাহিনী।
সান্তাহার জংশন দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করা হাজার হাজার যাত্রী জিম্মি রয়েছে মাত্র ১৫ জনের এই ফিটফাট বাহিনীর কাছে।
এরফান আলী একটি এনজিওর পরিচালক। ২০ দিন আগে স্ত্রী আঞ্জুমান লুনাকে নিয়ে কেনাকাটার জন্য ঢাকা যাচ্ছিলেন। জানালেন এক হাতে ব্যাগ ও অন্য হাতে মোবাইল ফোন নিয়ে আন্তঃনগর পঞ্চগড় এক্সপ্রেসের অপেক্ষা করছিলেন সান্তাহার স্টেশনে। ট্রেনটি স্টেশনে দাঁড়ানোর পর সুশৃঙ্খল ভাবেই উঠছিলেন। এ সময় যাত্রীদের ভিড় না থাকলেও হঠাৎ তাদের সামনে দলবদ্ধভাবে ৫-৭ জন এসে ট্রেনে আগে ওঠতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এদের কেউ পাশে দাঁড়িয়ে আবার কেউ দরজায় ভিড় করছিল। ট্রেন ছেড়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কায় ভিড় ঠেলেই উঠে গেলেন। এরপর নির্দিষ্ট সিটে বসে পকেটে হাত দিয়ে দেখেন ২৫ হাজার টাকা মূল্যের মোবাইল ফোনটি চুরি গেছে। তখন ট্রেনের বগিতে খোঁজ করে দেখলেন ‘যাঁরা ট্রেনে ওঠার জন্য বেশি ব্যস্ততা দেখাচ্ছিলেন তাদের কেউ ট্রেনে ওঠেনি’। অর্থাৎ এরা সকলেই ছিল যাত্রী বেশে পকেটকাটা চক্রের সদস্য।
একদিন পর ঢাকা থেকে ফিরে বিষয়টি সান্তাহার রেলওয়ে থানা পুলিশকে অবগত করে একটি সাধারন ডায়েরি করেন এরফান। কিন্তু আজ পর্যন্ত অভিযোগের কোনো সুরাহা পুলিশ করতে পারেনি বলে জানান তিনি।
শুধু এরফান আলীই নয় মোবাইল চুরি অথবা পকেট কাটার এমন ঘটনা সান্তাহার জংশনে প্রতিদিনই ঘটছে। সর্বশেষ গত শুক্রবার ১৯ মার্চ একই ঘটনায় সান্তাহার স্টেশন রোডের রহমান ফুডসের প্রোপাইটার জনি রহমানও মোবাইল ফোন চুরির ঘটনায় জিআরপি থানায় অভিযোগ করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ট্রেনে উঠতে গিয়ে মোবাইলসহ বিভিন্ন মালামাল খুঁইয়েছেন সান্তাহার পৌর শহরের একাডেমি স্কুল এলাকার শিক্ষার্থী শুভ রায়, ঢাকায় প্যাকেজিং কোম্পানিতে কর্মরত সান্তাহারের সান্দিড়া গ্রামের বাসিন্দা আতিকুর রহমান আতিক, নওগাঁর গণমাধ্যমকর্মী আব্বাস আলী, প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা আফজাল হোসেনসহ প্রায় অর্ধশতাধীক ট্রেন যাত্রীর। গত ছয় মাসে সান্তাহার জংশন স্টেশনে প্রায় অর্ধশতাধিক মোবাইল ফোন ও মালামাল চুরির ঘটনা ঘটেছে। এদের মধ্যে ১৮ জন রেলওয়ে থানায় অভিযোগ করলেও অন্যরা পুলিশি ঝামেলা এড়াতে অভিযোগ করেননি।
ভুক্তভোগী আব্দুর রহমান বলেন, রেলওয়ে থানায় জিডি বা অভিযোগ করে মোবাইল ফোন ফেরত পাওয়া যায় না। তাই তিনি মোবাইল হারানোর পর বিষয়টি কাউকে না জানিয়েই বাড়ি ফিরেছেন।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্বহীনতার কারণে চোরচক্র সক্রিয় হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পকেটমার চক্রের সদস্যরা সমাবেত হয় সান্তাহার রেল ফুটওভার ব্রিজে। ভালো শার্ট, প্যান্ট, হাতে ঘড়ি ও কাধে ব্যাগ ঝুলিয়ে ভদ্রযাত্রীর বেশ ধারে বিভিন্ন গন্তব্যের ট্রেনের অপেক্ষা করতে থাকেন। ট্রেন আসলে তারা সেখান থেকে ৬-৭ জন মিলে একটি টিম করে ছুটে যায়। ট্রেনের এই বগি থেকে ওই বগি আবার কখনো এই ট্রেন থেকে ওই ট্রেনে শুধু টার্গেট যাত্রীর জন্য ছুটোছুটি শুরু করে। কাজ হয়ে গেলে তারা কোনো ট্রেনেই ওঠেন না। ভুক্তভোগিরা এই চক্রের নাম দিয়েছে ফিটফাট বাহিনী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফিটফাট বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে রয়েছে দলনেতা দুপচাঁচিয়া কামতা গ্রামের সিদ্দিক, কাহালুর ফরুক, বগুড়ার কালিয়া, রহমান, নওগাঁর বোয়ালিয়ার জুয়েল ও সান্তাহার ইয়ার্ড কলোনীর অনিকসহ আরও ১৫ জন।
রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর পরিদর্শক নূর নবী জানান, একটি সংঘবদ্ধ চক্র নানা অপকর্ম করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে তারা অভিযানকালে কাউকে পায় না।
ফিটফাট বাহিনীর উৎপাতের বিষয়টি স্বীকার করে সান্তাহার রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনজের আলী বলেন, যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য পুলিশের তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। সেই সঙ্গে সতর্কতা অবলম্বনের জন্য যাত্রীদের বলা হচ্ছে।
তিনি বলেন অভিযানকালে কাউকে পাওয়া যায় না। থানায় জমা থাকা অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এএইচ/এমএস