বেচাকেনা থেকে কম্পিউটার চালানো, সবই পা দিয়ে করেন কামরুল

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ফরিদপুর
প্রকাশিত: ০৩:০৮ পিএম, ৩০ মে ২০২১

জন্মেছিলেন সুস্থভাবেই। কিন্তু দুর্ঘটনায় দুই হাত হারিয়ে ফেলেন ফরিদপুরের কামরুল হাসান (৩৫)। তবে তাতে কী, তিনি দমে যাননি একটুও। হাত পাতেননি কারও কাছে। অদম্য ইচ্ছার জোরে পা দিয়েই করছেন কম্পিউটার চালানোসহ নিত্যনৈমিত্তিক সব কাজ। এই পায়ের ওপর ভরসা করেই জীবন ও জীবিকার চাকা ঘোরানোর চেষ্টা করে চলেছেন কামরুল হাসান।

ফরিদপুর সদর উপজেলার কাফুরা গ্রামের ইলেকট্রিক মিস্ত্রি কামরুল হাসান। স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসে ডে-লেবার হিসেবে কাজ করতেন। আর সেই উপাজর্নে স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে নিয়ে চলছিল সংসার। কিন্তু ২০১৮ সালের ১৫ আগস্ট বিদ্যুৎ লাইনে কাজ করার সময় দুর্ঘটনায় পুড়ে যায় দুই হাত। যা পরে আর রক্ষা করা যায়নি।

সে যাত্রায় জীবন নিয়ে কোনোরকমে বেঁচে ফেরেন তিনি। এরপরও জীবনযুদ্ধে পরাজিত হননি কামরুল হাসান। দুই পা দিয়েই সব কাজ করতে শিখে নিয়েছেন তিনি। পা দিয়ে কাজ করে নিজের জীবিকা তো বটেই, চালিয়ে নিচ্ছেন পরিবারের ভরণপোষণও। কামরুল এখন অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে সব বাধা ডিঙিয়ে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোড়।

ফরিদপুর সদরের সম্প্রসারিত পৌরসভার ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের অধীনে কাফুরা এলাকায় একটি মুদিদোকান চালাচ্ছেন কামরুল। ওই এলাকার কুমার নদের পূর্ব পাশে কাফুরা-বাখুন্ডা সড়কের পাশেই এই দোকান। মুদিদোকান হলেও সেখানে ফ্লেক্সিলোড, বিকাশ, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের কাজও করে থাকেন কামরুল। দোকানের বিকিকিনি থেকে হিসাব রাখা—সব কাজই কামরুল করেন দুই পা দিয়ে। পায়ের ওপর ভরসা করেই শিখেছেন কম্পিউটার ও মোবাইল চালানোর কাজ।

ফরিদপুর শহরের কাফুরা মহল্লার শেখ আইউব আলী ও আমেনা বেগমের ছেলে কামরুল। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি বড়। তার স্ত্রী জুলিয়া বেগম (২৩) গৃহিণী। কামরুল-জুলিয়া দম্পতির এক ছেলে ও এক মেয়ে। শৈশবে সংসারে অভাবের কারণে পড়াশোনা বেশি দূর করতে পারেননি কামরুল। পঞ্চম শ্রেণিতে পাস করার পরই তাকে নেমে পড়তে হয় জীবনসংগ্রামে।

প্রথমে কাঠমিস্ত্রির কাজ দিয়ে শুরু, পরে রিকশা চালানো ও মাটি কাটার কাজও করতে হয়েছে তাকে। পরে নিজ দক্ষতায় শিখে নিয়েছিলেন ইলেকট্রিকের কাজ।

২০১৪ সাল থেকে বিদ্যুৎ লাইনের শ্রমিক হিসেবে পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো) ফরিদপুরের অধীনে বাখুন্ডা ফিডারের অধীনে কাজ শুরু করেন কামরুল।

সেদিনের দুর্ঘটনার বর্ণনা দিয়ে কামরুল বলেন, ‘মই লাগিয়ে উঠে তারে দুই হাত দিয়ে ত্রুটি মেরামতের কাজ শুরু করি। এতটুকুই আমার মনে আছে। তারপর কী ঘটেছে, বলতে পারব না। জ্ঞান ফেরার পরে দেখি, আমি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে। পাশে বসা মা।’

বিদ্যুৎস্পৃষ্টে ঝলসে যায় কামরুলের দুটি হাত। তাকে প্রথমে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে সেখান থেকে ঢাকায় নিতে বলা হয়। ওজোপাডিকো ফরিদপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন মো. মোরশিদ আলম। তিনিই সব ব্যবস্থা করেন।

একমাস ১৪ দিন কামরুলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিতে হয়। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তিন দিনের মধ্যে ডান হাত এবং ১০ দিনের মধ্যে বাম হাত কেটে ফেলা হয়।

কামরুল বলেন, ‘সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আমি দুই চোখে অন্ধকার দেখতে পাই। মনে মনে ভাবতাম আমার মৃত্যু হলো না কেন, সেটাই তো বেশি ভালো হতো। কীভাবে পরিবার চালাব, কীভাবে খরচ আসবে ভেবে ভেবে আমি চরম হতাশার মধ্যে পড়ে যাই। অনেকে আমাকে নিয়ে তামাশা করতেন। তবে বিদ্যুৎ বিভাগ আমার হাসপাতালের সব খরচ বহন করে এবং নগদ দুই লাখ টাকা দেয়। সেই টাকা দিয়ে চারটি ব্যাটারিচালিত রিকশা কিনে ভাড়া দিতে শুরু করি।’

এরমধ্যে কামরুলের পরিচয় হয় চরভদ্রাসন উপজেলার হাজীগঞ্জ বাজারের কাঁচামাল ব্যবসায়ী লুৎফর খালাসির সঙ্গে। তিনি কামরুলকে সাহস জোগান। তিনি তাকে বলেন, হাজীগঞ্জ বাজারে মো. জসিম (২২) নামে এক ব্যবসায়ী আছেন, তারও দুই হাত নেই। তারপরও তিনি দুই পা দিয়ে দোকান চালান। শুধু তা–ই নয়, জসমি নদীতে সাঁতার কাটতে পারেন, বাইসাইকেলও চালাতে পারেন।

জসিমের কাছে গিয়ে তিনি কীভাবে দুই পা দিয়ে সব কাজ করেন, দোকানে বেচাকেনা করেন, তা দেখে আসেন। এরপর থেকে কামরুলের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। তিনি বাড়িতে এসে রিকশা বিক্রি করে নিজের বাড়ির সামনের সড়কে ২০১৯ সালের মার্চ মাসে ছেলে জিহাদের নামে ‘জিহাদ ভ্যারাইটি স্টোর’ নামে একটি মুদিদোকান দেন।

এরপর দুই পা দিয়ে সব কাজ করতে শিখে যান কামরুল। এখন পা দিয়ে কাজ করতে কোনো সমস্যা হয় না তার। তিনি এখন সাঁতারও কাটতে পারেন, চালাতে পারেন বাইসাইকেলও।

কামরুল বলেন, সবমিলিয়ে এখন তিনি সুখী। দোকানের কাজে তার স্ত্রী জুলিয়া এবং শাকিল (১৮) নামের এক প্রতিবেশী তাকে সাহায্য করেন।

কামরুলের স্ত্রী জুলিয়া বলেন, স্বামীর দুই হাত কেটে ফেলার পর চরম দুঃখ আর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছিলেন। ভয় হয়েছিল কীভাবে বেঁচে থাকবেন, আগামী দিনগুলো কীভাবে কাটবে ভেবে। আজ তারা সুখী।

কামরুল হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আর দশজন স্বাভাবিক মানুষের মতো আমার জন্ম হলেও কপাল আর ভাগ্য দোষে আমার এ অবস্থা, দুটি হাত হারিয়েছি। এ দোষ আর কারো নয়। তবে আমি কারো করুণা আর দয়ায় বাঁচতে চাই না। সৃষ্টিকর্তার দোয়ায় পরিশ্রম করে নিজে কিছু একটা করে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছি।’
ওজোপাডিকো ফরিদপুরের বিদ্যুৎ ও বিতরণ বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোরশিদ আলম বলেন, অসাধারণ মানসিক শক্তির অধিকারী কামরুল। এ শক্তির জোরেই তিনি জীবনের চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। পাশাপাশি তিনি মেধাবীও। তার পাশে সব সময় থাকবে বিদ্যুৎ বিভাগ।

এসআর/এমকেএইচ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।