গোয়াল ঘরেই জীবন পার আফজালের

মো. আতিকুর রহমান মো. আতিকুর রহমান
প্রকাশিত: ০৬:৩৬ পিএম, ১১ জুন ২০২১

গরিবের ঘরে জন্ম নেয়া আফজাল হোসেনের নেই কোনো পৈত্রিক ভিটেমাটি। পিতার সঙ্গে যে ঘরে বসবাস করে শিশুকাল পার করেছে তা ছিল মায়ের পক্ষ থেকে পাওয়া জমি। বাবা-মা মারা যাওয়ার পরে ওই জমি এক মামা তার নামে রেকর্ড করে নেয়। কৈশোর বয়সেই সম্পত্তিহীন হয়ে কখনো রান্নাঘর, কখনো বারান্দা কখনোবা গোয়াল ঘরে জীবন পার করেছেন।

প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরে আরেক গরিবের কন্যার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। স্থানীয় এবং প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় অব্যবহৃত স্থানে শুরু হয় সংসার জীবন। এরপর একে একে তিন পুত্র ও তিন কন্যা সন্তানের বাবা হন আফজাল হোসেন। এখন তার বয়স ৬০ বছরের কোটায়।

জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও একটুও মাথা গোজার ঠাঁই নেই আফজাল হোসেনের। কখনো পরিত্যক্ত গোয়ালঘর, কখনো খালি বারান্দা আবার কখনো অব্যবহৃত রান্না ঘরে আশ্রয় নিয়ে জীবন অতিবাহিত করছেন তিনি। তার জন্মস্থান রাজাপুর উপজেলার শুক্তাগড় ইউনিয়নের সাকরাইল গ্রামে।

আফজাল হোসেনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তার করুণ জীবন কাহিনী।

তিনি জানান, সাকরাইল গ্রামের নুরুল ইসলামের ঘরে ষাট বছর পূর্বে জন্ম হয় এক বোন ও তিন ভাইয়ের। কিশোর বয়সেই বাবা মারা যান। মায়ের বাবার বাড়ি থেকে একখণ্ড জমিতে কোনোমতে ঘর করে আমাদের নিয়ে বসবাস করত। প্রথমে বাবা মারা গেলে মায়ের সঙ্গেই আমরা থাকতাম।

তিনি আরও জানান, অতিকষ্টে জীবনযাপন চলতে থাকে। ইতোমধ্যে মা রোকেয়া বেগমও মারা যান। এরপরে জ্ঞাতি এক মামা তার নামে জমিটুকু রেকর্ড করে নেন। ভূমিহীন হয়ে পড়েন তারা। এসব কারণে লেখাপড়া করতে না পারায় অক্ষরজ্ঞানহীনই রয়েছেন। বোন ও অন্যরা মাথা গোজার ঠাঁই না থাকায় এলাকা ছেড়ে বিভিন্ন স্থানে কাজ নেন।

স্মৃতি ধরে রাখতে জন্মস্থান ত্যাগ করেননি আফজাল। কয়েক বছর পরে প্রাপ্তবয়স্ক হলে বিয়ে করার উদ্যোগ নেন। ভূমি ও সম্বলহীন আফজাল বিয়েও করেন এক দরিদ্র পরিবারের কন্যা রুমাকে। প্রতিবেশীর সহযোগিতায় তাদের পরিত্যক্ত বারান্দায় শুরু হয় দাম্পত্য জীবন। পরিত্যক্ত গোয়ালঘর, কখনো খালি বারান্দা আবার কখনো অব্যবহৃত রান্না ঘরে বসবাস করেই জীবনের সময়টুকু অতিবাহিত করছেন।

ইতোমধ্যে তাদের সংসার জীবনে তিন পুত্র ও তিন কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। শ্রমজীবী আফজাল দিন-মজুরি করে যতটুকু উপার্জন করতেন তা আটজনের সংসারে দু’বেলা দু’মুঠো খাবার জোগানোই কষ্ট সাদ্য বিষয় ছিল। তারমধ্যে থেকেও সন্তানদের অক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন করেছেন। তিন সন্তানের বড় দু’জন ঢাকায় পোশাক শ্রমিকের কাজ করছেন।

১৪ বছর বয়সী ছোট ছেলে বাবার সঙ্গেই শ্রমজীবীর কাজ করছে। বড় কন্যাকে পাত্রস্থ করতে পারলেও বাকি দু’কন্যা ঢাকায় পোশাক শ্রমিকের চাকরি করছেন। লেখাপড়া না জানায় কোথাও কাউকে চেনেন না তিনি। এ কারণে কারো কাছে আবেদনও করতে পারেনি। অসহায় আফজাল প্রধানমন্ত্রীর উপহার আবাসনে একটু মাথা গোজার ঠাঁই পেতে আকুল অনুরোধ জানান জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মনির হোসেন সিকদার জানান, আফজাল হোসেনের একখণ্ড জমিও নেই যেখানে তিনি মাথা গোজার ঠাঁই করে নেবেন। শ্রমজীবীর কাজ করে যা উপার্জন করে তা দিয়ে খেয়ে বেঁচে থাকাই দুঃসাধ্য। আমরা জনপ্রতিনিধিরা পারি তাকে সরকারি চাল সহায়তা দেয়ার একটি কার্ড দিতে। তা দিয়ে তো জমি কিনে ঘর করে থাকা সম্ভব না।

আমাদের গ্রামে সরকারি পরিত্যক্ত জায়গা আছে। যেখানে একটু মাথার গোজার ঠাঁই নিতে পারে আফজাল। সরকারের আবাসন ব্যবস্থার মহতী উদ্যোগে ভূমিহীন আফজালকে যদি এমন সুযোগ করে দেয়া হত তাহলে শেষ বয়সে একটু শান্তিতে বসবাস করত বলেও জানান ইউপি সদস্য মনির।

এমআরএম/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]