মা-হারা শিশুটির ওপর কেন এই বর্বরতা?

নূর মোহাম্মদ
নূর মোহাম্মদ নূর মোহাম্মদ কিশোরগঞ্জ
প্রকাশিত: ০৮:৩৪ পিএম, ১১ জুন ২০২১ | আপডেট: ০৮:৫২ পিএম, ১১ জুন ২০২১

জন্মের পাঁচ মাস বয়সে শিশুটিকে ফেলে এক ব্যক্তির হাত ধরে পালিয়ে যান মা। দুধের শিশুকে বাঁচিয়ে রাখতে আবারো বিয়ে করেন বাবা আব্দুল কদ্দুস। তবে বিধি বাম! কিছুদিন যেতে না যেতেই অভাবের তাড়নায় দিনমজুর স্বামী আর সতীনের সন্তানকে ছেড়ে পালিয়ে যান দ্বিতীয় স্ত্রীও! এরপর থেকে শিশুটিকে লালন-পালনের দায়িত্ব নেন বড় বোন চুমকি আক্তার। জন্মের পর মায়ের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত শিশুটিকে এবার অবিশ্বাস্য নৃশংসতার শিকার হতে হলো।

কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে রাতের আঁধারে ঘুমন্ত অবস্থায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আড়াই বছরের শিশু আব্দুল্লাহ আল-মামুনের পুরুষাঙ্গ কেটে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় হতবাক শিশুটির স্বজন ও প্রতিবেশীরা। রহস্যজনক এ ঘটনার পর শিশুটি প্রাণে বেঁচে গেলেও কাটছে না আতঙ্ক। টাকার অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে পারছেন না দিনমজুর বাবা।

করিমগঞ্জ উপজেলার গুজাদিয়া ইউনিয়নের জাটিয়াপাড়া গ্রামে এ বর্বরোচিত ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় এখনো থানায় মামলা হয়নি। তবে পুলিশ বলছে, বিষয়টি তারা অবগত আছেন। এ ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

পরিবার ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাটিয়াপাড়া গ্রামের দিনমজুর আব্দুল কদ্দুসের দুই মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে আবদুল্লাহ আল-মামুন সবার ছোট। শিশুটির জন্মের পাঁচ মাস বয়সে তার মা পার্শ্ববর্তী গ্রামের এক যুবকের হাত ধরে চলে যান। এ অবস্থায় ছেলেকে বাঁচাতে আবারো বিয়ে করেন কুদ্দুস। কিন্তু অভাবের সংসারে স্বামী ও সতীনের সন্তান রেখে চলে যান সেই স্ত্রীও। এ অবস্থায় আব্দুল কদ্দুসের ছোটমেয়ে চুমকি আক্তার ছোটভাইকে লালন-পালনের দায়িত্ব নেন।

গত ৩১ মার্চ সন্ধ্যার পর আড়াই বছর বয়সী ভাই আব্দুল্লাহ আল-মামুনকে বিছানায় ঘুম পাড়িয়ে রেখে পাশের বাড়ির নলকূপ থেকে পানি আনতে যান চুমকি আক্তার। এসময় তার বাবা বাড়িতে ছিলেন না। এসময় ঘুমন্ত শিশুটি হঠাৎ করে চিৎকার শুরু করে। চিৎকার শুনে দৌড়ে ছুটে আসেন চুমকি। এসময় চৌকিতে শুয়ে ছটফট করতে থাকা শিশুটির পুরুষাঙ্গ থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে দেখেন।

তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে শিশুটির গোপনাঙ্গ গোড়া থেকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কেটে নেয়া অবস্থায় দেখতে পান।

আশঙ্কাজনক অস্থায় শিশুটিকে প্রথমে করিমগঞ্জ উপজেলা হাসপাতালে ও পরে তাকে কিশোরগঞ্জ শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। ছেলেটির অবস্থার অবনতি হলে রাতেই তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসকদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও আন্তরিকতায় শিশুটি প্রাণে বেঁচে যায়। ১০ দিন চিকিৎসা শেষে তাকে বাড়িতে আনা হয়।

নিষ্পাপ শিশুটির সঙ্গে নৃশংসতার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেসবুকে প্রকাশ পেলে এ নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্য দেখা দেয়। বিষয়টি নজরে আসে গণমাধ্যমকর্মীদের।

শুক্রবার (১১ জুন) বিকেলে জাটিয়াপাড়া গ্রামে আব্দুল কদ্দুসের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাবার কোলে শিশুটি ছটফট করছে। লোকজন দেখলেই ভয়ে চিৎকার করে ওঠে। নল দিয়ে বিকল্প উপায়ে প্রস্রাবের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

শিশুটির বোন চুমকি আক্তার বলেন, ‘মা চলে যাওয়ার পর ভাইটিকে তিলে তিলে বড় করে তুলছি। তাকে রেখে কোথাও যাই না। সেদিন তাকে খাওয়ানোর পর ঘুম পাড়িয়ে বাইরে রান্না করছিলাম। এক ফাঁকে পাশের বাড়ির টিউবওয়েল থেকে পানি আনতে যাই। এসময় তার চিৎকার শুনে ঘরে এসে দেখি তার যৌনাঙ্গ থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। ঘরে কাউকে দেখতে পাইনি। আমি চিৎকার করতে থাকলে লোকজন ছুটে আসে। তারা দেখতে পান আমার ভাইয়ের গোপনাঙ্গ গোড়া থেকে ধারালো কিছু দিয়ে কেটে নেয়া হয়েছে। কীভাবে এটা হলো, কারা করেছে জানি না। তবে আমি এর বিচার চাই।’

শিশুটির বাবা আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘আমি বাড়িতে ছিলাম না। ভাইয়ের ফোন পেয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেলে যাই। দুই স্ত্রী চলে যাওয়ার পর ছেলেকে নিয়ে বিপাকে পড়ি। মেয়েটি তার ভাইকে লালন-পালন করছে।’

এসময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। বলেন, ‘আমার নিষ্পাপ সন্তানের সঙ্গে এ কেমন শত্রুতা। তারা আমাকে মেরে ফেলতো। আমার সন্তান কার কী ক্ষতি করেছে? আমি এ জঘন্য ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই।’

এ ঘটনায় বিষ্ময়ে হতবাক এলাকাবাসী। জাটিয়াপাড়া গ্রামের সমাজসেবক মোজাম্মেল হক অপু বলেন, ‘এমন ঘটনা আমরা কখনো শুনিনি। আমরা হতবাক। এ ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’

গুজাদিয়া হাইধনখালী গ্রামের ইমরানুল হক ইমরান বলেন, ‘একটি দরিদ্র পরিবারের সন্তান ওই শিশুটি। হাসপাতাল থেকে ছুটি দেয়া হলেও তাকে আবারো হাসপাতালে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা দিতে হবে। কিন্তু টাকার অভাবে তার বাবা শিশুটিকে চিকিৎসা দিতে পারছেন না। আমরা সাধ্যমতো পরিবারটিকে সাহায্য করার চেষ্টা করছি। জঘন্য এ ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।’

যোগাযোগ করা হলে করিমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোমিনুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি শোনার পর পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তবে শিশুটির স্বজনরা হাসপাতালে থাকায় কেউ এখনো অভিযোগ দায়ের করেননি। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

নূর মোহাম্মদ/এসআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]