৫ বছরে মেঘনার পেটে চার শতাধিক ঘরবাড়ি

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশিত: ০৬:২৭ পিএম, ২৩ আগস্ট ২০২১

৮০ বছরে বৃদ্ধ হিরেন্দ্র পাল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার পানিশ্বর ইউনিয়নের পালপাড়ার বাসিন্দা। এক সময় মেঘনা নদীর তীরে বিশাল বাড়ি ছিল তার। বাড়ির পাশেই ছিল বিশাল দিঘি। এর চারপাশে ঘিরে ছিল আরও প্রায় চার শতাধিক পাল পরিবারের বসবাস।

কিন্তু মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে পরিবার নিয়ে বাড়ি-ছাড়া হয়েছেন হিরেন্দ্র পাল৷ মেঘনা নদী কেড়ে নিয়েছে তার বিশাল বাড়ি। এখন বসবাস করছেন নদীর পাড়ের সরকারি জায়গায় ছোট্ট একটি কুঁড়েঘরে।

রোববার (২২ আগস্ট) মেঘনা নদীর তীরে হিরেন্দ্র পালের সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজের। এ সময় তিনি আঙুল উঁচিয়ে মেঘনা নদীর মাঝে তীর হতে প্রায় তিনশত ফুট দূরে দেখি বলেন, সেখানে বাড়ি ছিল তার। হিরেন্দ্র পাল আক্ষেপ করে বলেন, আমার বাড়ি গেছে, দিঘিরও কোনো অস্তিত্ব নেই। এখানে চার শতাধিক পরিবার ছিল। এখন গ্রামে মাত্র ৫০-৬০টি পরিবার আছে।

jagonews24

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত চার দশকে অব্যাহত ভাঙনে পানিশ্বর গ্রামের তিন–চতুর্থাংশ মেঘনায় বিলীন হয়েছে। এখন বাকিটুকু বিলীন হওয়ার পথে। উপজেলার পানিশ্বর ইউনিয়নের পাঁচ গ্রামের দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এ বছরও মেঘনা নদীর ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইউনিয়নের শোলাবাড়ি, পালপাড়া, পানিশ্বর, শাখাইতি ও দেওবাড়িয়া গ্রামের দুই শতাধিক পরিবার এখন মেঘনা নদী ভাঙন আতঙ্কে রয়েছেন।

সরেজমিনে জানা গেছে, গত চার বছরে মেঘনা নদীর ভাঙন তীব্র হচ্ছে। এর মধ্যে ভাঙনে বিলীন হয়েছে শোলাবাড়ি গ্রামের ৯টি, পানিশ্বর গ্রামের তিনটি ও শাখাইতি গ্রামের ১৪টি চাতাল। সম্পূর্ণভাবে ভিটাছাড়া হয়েছে শতাধিক পরিবার। অর্ধশতাধিক পরিবার আংশিক ভাঙনের শিকার। বেকার হয়েছেন চাতালের কয়েকশ শ্রমিক।

jagonews24

ক্ষতিগ্রস্ত হিরেন্দ্র পালের ছেলে কার্তিক পাল জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের এতো বড় বাড়ি মেঘনা নদী গিলে খেয়েছে। নিজেদের এক টুকরো জমিও রইলো না। যেভাবে নদীভাঙন চলছে, তা অব্যাহত থাকলে দ্রুত পানিশ্বর বাজার, পানিশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়, শাখাইতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও শোলাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পানিতে বিলীন হয়ে যাবে।

রঞ্জিত পাল নামের আরেকজন বলেন, গত দুই বছরে আমাদের ৬২ শতাংশ জমি নদীতে তলিয়ে গেছে। গত বছর নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবারকে ১৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। অথচ আমাদের নামই সেই তালিকায় দেওয়া হয়নি। আমরা একটি টাকাও অনুদান পাইনি।

সুভাষ পাল নামের এক ভূমি মালিক বলেন, তীর থেকে ৪-৫টি বাড়ির পর আমাদের বাড়ি ছিল। আমাদের বাড়ি মেঘনা নদীতে চলে গেছে। সবাই নতুন করে অল্প-অল্প জায়গা কিনে ঘর তৈরি করে বসবাস করছি। সরকারি অনুদান কিছু পায়নি আমরা। শুধু নদীর তীরে কিছু বালুর বস্তা ফেলতে দেখেছি।

jagonews24

সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুল হক মৃদুল বলেন, নদী ভাঙন এলাকায় পরিদর্শনে যাব। ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকরা আবেদন করলে আমরা সহায়তা করবো। তারা যদি আবেদন না করেন তাহলে আমরা কিভাবে বুঝবো কারা কারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের বিষয়ে এর আগে কেউ অবহিত করেননি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জন কুমার দাস বলেন, পানিশ্বর মেঘনা নদীর তীর একটি ভাঙন প্রবণ এলাকা। এ বিষয়টি নিয়ে আমার জরুরি ভিত্তিতে কাজ করবো। সেখানে আমরা ২৫০ কেজি ওজনের সাড়ে ১৩ হাজারের মতো বালুর বস্তা ফেলবো। প্রতি বছরই আমরা বালুর বস্তা ফেলে থাকি।

তিনি আও বলেন, একটি স্থায়ী প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন আছে। সেখানে ১.৭ কিলোমিটার প্রতিরক্ষা বাঁধ তৈরি করা হবে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৬ কোটি টাকা। সেটি অনুমোদন হলে আমরা দ্রুত কাজ শুরু করবো।

আবুল হাসনাত মো. রাফি/আরএইচ/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।