বাঁশ-বেতে গাঁথা বিউটির সফলতার গল্প

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি খাগড়াছড়ি
প্রকাশিত: ০৯:০৭ এএম, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২১

বাঁশ আর বেত। এই দুটো জিনিস দিয়ে নিপুণ হাতে বানিয়ে চলেছেন একেকটি মোড়া। হাতেখড়ি মায়ের কাছে। তারপর থেকে গত ১২ বছর ধরে নিজেই মোড়া তৈরি করে পরিবারে ফিরিয়ে এনেছেন আর্থিক সচ্ছলতা। এখন স্বপ্ন দেখছেন দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও নিজের প্রতিভা তুলে ধরতে। এই গল্প খাগড়াছড়ি বিউটি বেগমের। তীব্র ইচ্ছাশক্তি আর কঠোর পরিশ্রম এই দুইয়ের মিশেলে তিনি হাটছেন সফলতার পথে।

মাটিরাঙ্গা পৌর শহরের ডাক্তারপাড়া গ্রামের মো. আকতার হোসেন ও সাজেদা বেগমের চার ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে সবার বড় বিউটি বেগম। মাঝে কিছুদিন ঠিকানা বদল হলেও স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর ২০০৭ সালে আবার তার ঠিকানা হয় বাবার বাড়ি। খুচরা বাজারে কলা বিক্রি করে সংসার চালান বাবা। সংসারের হাল ধরতে তাই বাঁশ-বেত হাতে তুলে নেন বিউটি। নিপুণ হাতে শুরু করেন মোড়া তৈরির কাজ। এখন তার ছোট ঘর যেন হয়ে উঠেছে কুটির শিল্পের কারখানা।

jagonews24

জানা যায়, বিউটির হাতে তৈরি মোড়া স্থানীয় পাইকারদের হাত ধরে এরই মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ফেনী, কুমিল্লা ও নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলায়। রাজশাহী এবং যশোর মোড়া পাঠান তিনি নিজেই। আকার ও মান অনুযায়ী প্রতি জোড়া মোড়া বিক্রি হয় ৬০০ টাকা থেকে শুরু করে ১৮০০ টাকায়। প্রতি সপ্তাহে ৫-৬ জোড়া মোড়া তৈরি করতে পারেন বিউটি বেগম।

তবে মোড়া তৈরিতে নানা প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করে বিউটি বেগম জানান, বাঁশের দাম আগের তুলনায় অনেক বেশি। এছাড়া মোড়া বানাতে সাইকেলের যে টায়ার ব্যবহৃত হয় তারও সংকট রয়েছে। আর খরচ অনুযায়ী মোড়ার কাঙ্খিত দামও পাওয়া যায়না। তারপরও সারাদেশের গ্রাহকের চাহিদার কথা মাথায় রেখে মোড়া তৈরি করে বলে জানান তিনি।

jagonews24

বিউটি বেগম জাগো নিউজকে জানান, এর আগে স্থানীয় এবং ফেনী ও চট্টগ্রাম থেকে আসা পাইকাররা বাড়ি থেকে মোড়া কিনে নিয়ে যেত। পাইকারদের মাধ্যমে বিক্রির কারণে মোড়ার কাঙ্খিত দাম পাওয়া যেতনা। তাই গত চার মাস ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ‘বাই অ্যান্ড সেল ইন খাগড়াছড়ি’ গ্রæপের মাধ্যমে মোড়া বিক্রি করছেন তিনি। এতে মোড়ার চাহিদা যেমন বেড়েছে তেমনি পাচ্ছেন ভালো দামও। আর ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে তার মোড়ার আলাদা বাজার।

বিউটি বেগম স্বপ্ন দেখেন মোড়া তৈরির কারখানা গড়ে তোলার। সেখানে সমাজের স্বামী পরিত্যাক্তা ও অসহায় নারীদের মোড়া তৈরির প্রশিক্ষণ দিতে চান তিনি। মোড়া তৈরির শিল্পকে দিতে চান প্রাতিষ্ঠানিক রূপ, হতে চান সফল উদ্যোক্তা। সুযোগ পেলে বিদেশেও মোড়া রফতানি করতে চান আত্মপ্রত্যয়ী এ নারী।

jagonews24

বিউটি বেগম বলেন, ‘সরকারি-বেসরকারি সহায়তা পেলে এ শিল্পকে এগিয়ে নিতে পারবো। আমি চাই আমার হাতে তৈরি মোড়া দেশের সীমানা ছাড়িয়ে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ুক। আমি চাই আমার দেখাদেখি সমাজের আরো অনেকেই এ কাজে নিজেকে যুক্ত করুক।’

মেয়ের স্বপ্ন পূরণে সবাই পাশে দাঁড়াবে এমন প্রত্যাশা জানিয়ে বিউটি বেগমের মা সাজেদা বেগম বলেন, ‘আমার মেয়ে অযথা সময় নষ্ট না করে সংসারের হাল ধরেছে। জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য লড়াই করছে। অনলাইনে মোড়া বিক্রি করে খাগড়াছড়িকে সারাদেশের কাছে পরিচিত করছে।’

jagonews24

মাটিরাঙ্গা পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. শহিদুল ইসলাম সোহাগ জানান, মানুষ চাইলে যে সফলতা স্পর্শ করতে পারে বিউটি তার অনন্য দৃষ্টান্ত। মা-বাবার সংসারের বোঝা না হয়ে সংসারের হাল ধরেছেন তিনি। ছোট ভাই-বোনদের লেখাপড়ার পথ সুগম করেছেন। তার দেখাদেখি এলাকার অনেক নারীই এখন স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছে।

মাটিরাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. হেদায়েত উল্যাহ বলেন, মোড়াকে বিশেষ শিল্প হিসেবে ঘোষণা করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হবে। এছাড়া এ শিল্পের বাজার তৈরি করতেও সব ধরনের উদ্যোগ নেয়া হবে। এছাড়া বিউটি বেগমসহ যেসব নারী নানাভাবে নিজেদের স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করছেন তাদের সরকারি ঋণ সহায়তা দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

মুজিবুর রহমান ভুইয়া/এফআরএম/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]