কবর নিয়ে দুশ্চিন্তায় ২ হাজার পরিবার, পুলিশের উদ্যোগে সমাধান

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি লক্ষ্মীপুর
প্রকাশিত: ০৫:০৯ পিএম, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

মেঘনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে গত ২০ বছরে লক্ষ্মীপুরের কমলনগর ও রামগতি উপজেলার প্রায় অর্ধেক তলিয়ে গেছে। নদীতে ভিটে-মাটি হারানো অন্তত দুই হাজার পরিবার এখন রামগতি-লক্ষ্মীপুর সড়কের ওপর বসবাস করছে।

ভবানীগঞ্জ থেকে তোরাবগঞ্জ এলাকা পর্যন্ত আট কিলোমিটার এলাকায় সড়কের দুই পাশে কোনোমতে অস্থায়ী ঘর তুলে তারা বেঁচে থাকার লড়াই করে যাচ্ছেন। পরিবারের কোনো সদস্য মারা গেলেই বিপাকে পড়তে হয় তাদের। নিজস্ব কোনো জায়গা ও কবরস্থান না থাকায় বাধ্য হয়েই যেখানে সেখানে করতে হয় মরদেহ দাফন। এছাড়া মসজিদ না থাকায় অনেক দূরে গিয়ে অথবা যেখানে সেখানে আদায় করতে হয় নামাজ।

অবশেষে নদীর ভাঙনে নিঃস্ব হওয়া এসব পরিবার পুলিশের পক্ষ থেকে পাচ্ছে অকল্পনীয় উপহার। তাদের জন্য সাড়ে ২৯ শতাংশ জমি কিনে করা হচ্ছে গণকবর। সেখানে একসঙ্গে অন্তত ৪৫০ থেকে ৫০০ মানুষকে কবর দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। একই সঙ্গে তাদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে মসজিদও। এতে কপালে চিন্তার ভাঁজ আর থাকছে না সর্বহারা মানুষগুলোর।

jagonews24

চলতি মাসেই পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নের পশ্চিম চরমনসা গ্রামে কবরস্থান ও মসজিদটি উদ্বোধন করার কথা রয়েছে। মূলত পুলিশের আইজিপির উদ্যোগে জেলা পুলিশ কাজটি বাস্তবায়ন করছে। এজন্য পুলিশের প্রশংসা করছেন স্থানীয় লোকজন।

এর আগে ৪ সেপ্টেম্বর গণকবরের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম বিভাগের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. আনোয়ার হোসেন। এ সময় জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) ড. এএইচএম কামরুজ্জামানসহ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

স্থানীয়রা জানান, স্বজন হারানোর বেদনার চেয়েও তাদের কাছে বেশি চিন্তার বিষয় কবরের জায়গা না থাকা। অনেক সময় মরদেহ নিয়ে ছয়-সাত ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। কোথায়, কার জমিতে মরদেহ দাফন করা যাবে, তা নিয়ে সবসময় কাজ করে অস্থিরতা। কারও মৃত্যু হলে শুরু হয় এদিক-ওদিক ছোটাছুটি। বর্তমানে কবরস্থানে জায়গাও দিতেও অনীহা জানান অনেকে।

jagonews24

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, পুলিশের আইজিপির উদ্যোগে জেলা পুলিশ সদর উপজেলার লাহারকান্দি ইউনিয়নের কুতুবপুর গ্রামের আবদুর কুদ্দুসের কাছ থেকে পশ্চিম চরমনসা গ্রামে সাড়ে ২৯ শতাংশ জমি কেনে। গত বছরের ১ ডিসেম্বর জমিটি রেজিস্ট্রি হয়। এরপর থেকে পুরো জমিতে সীমানা প্রাচীর তুলে কবরস্থান ও মসজিদ নির্মাণকাজ শুরু করা হয়। সেখানে গভীর নলকূপ, মরদেহ ধোয়ার ঘর ও শৌচাগার রয়েছে। প্রধান সড়ক থেকে গণকবরে যাওয়ার জন্য রাস্তাও সংস্কার করা হয়েছে।

স্থানীয় মো. আবদুর রহমান বলেন, আমাদের বাড়ি কালকিনিতে ছিল। নদীতে তা চলে গেছে। তিন বছর আগে বন্ধু রিয়াদের বাবা দুলাল মিস্ত্রি মারা যান। তারাও নদীভাঙনের শিকার। তখন মরদেহ নিয়ে আমরা ছয়-সাত ঘণ্টা বসেছিলাম। দাফন করার জায়গা নেই। ১০ হাজার মানুষের প্রায় একই গল্প। আগে মালিকরা বাধা না দিলেও কয়েক বছর ধরে জমির দাম বাড়ার কারণে কেউ এক ইঞ্চি জমি দিতে রাজি নয়। সেই কষ্ট আমাদের কাঁদাতো।

jagonews24

ভবানীগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) মুজতুবা আহমেদ তুহিন বলেন, সড়কের পাশে বসবাসকারীরা নদীভাঙনের শিকার। তারা সহায়-সম্বলহীন। কোনো মতে অস্থায়ীভাবে তারা বসবাস করে আসছে। তাদের জন্য আধুনিক কবরস্থান করে পুলিশের আইজিপি আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এখন বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, চলতি মাসের মধ্যেই পুলিশের আইজিপি এসে কবরস্থান ও মসজিদটি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।

কাজল কায়েস/এসজে/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]