‘দেশ স্বাধীন করে ফিরে আসবো বলেই বেরিয়ে পড়ি’

সৈয়দ এখলাছুর রহমান খোকন
সৈয়দ এখলাছুর রহমান খোকন সৈয়দ এখলাছুর রহমান খোকন হবিগঞ্জ
প্রকাশিত: ০৩:২৯ পিএম, ০৫ ডিসেম্বর ২০২১

বীর প্রতীক নূর উদ্দিন আহমেদ। ১৯৫২ সালের ৫ জুন হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার দেবপাড়া ইউনিয়নের সাতাইহাল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন চঞ্চল প্রকৃতির। স্কুল জীবনেই জড়িয়ে পড়েন ছাত্র রাজনীতিতে। ১৯৭০ সালে দশম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় তৎকালীন নবীগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৭১ সালে দিনারপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরিক্ষার্থী ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ প্রচণ্ডভাবে মনে নাড়া দেয় ২০ বছরের টগবগে এ যুবকের। যুদ্ধ শুরু হলে কাউকে কিছু না বলে নিজেও ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে। যুদ্ধ করেন ৪নং সেক্টরে। সেক্টর কমান্ডার মেজর সিআর দত্ত বীর উত্তম এবং সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মাহবুবুর রব সাদি বীর প্রতীক। যুদ্ধ করেছেন মৌলভীবাজারের বড়লেখা, ছোটলেখা, জুড়ি, লাঠিটিলা টি স্টেট এলাকায়। যুদ্ধ চলাকালে ক্যাম্পে খবর পৌঁছে তিনিসহ তার সঙ্গীয় ১১ যোদ্ধা শহীদ হয়েছেন। তাই তার নামে প্রথমে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সনদ ইস্যু হয়। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তিনি এটি জানতে পেরে তা সংশোধন করেন। ১৯৭৩ সালে পান বীর প্রতীক খেতাব। তার বীরত্ব গাঁথা সেদিনের কথা উঠে এসেছে জাগো নিউজের কাছে দেয়া সাক্ষাৎকারে।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাগো নিউজের হবিগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি সৈয়দ এখলাছুর রহমান খোকন।

জাগো নিউজ: কখন যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন?

নূর উদ্দিন আহমেদ: বয়স তখন ২০। এসএসসি পরিক্ষার্থী। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণই মূলত যুদ্ধে যাওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছিল। তখনই মনে হলো আর কোনো পথ নেই। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এখন দেয়াল ভেঙেই বের হতে হবে। ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞের পরই সিদ্ধান্ত নেই-যুদ্ধে যেতেই হবে। দেশ স্বাধীন করতেই হবে। তখনই প্রস্তুতি শুরু। যুদ্ধে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে কাউকে কিছু না বলে এপ্রিলের মাঝামাঝি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ি। প্রথমে হবিগঞ্জ, এরপর মৌলভীবাজার হয়ে ভারত সীমান্তবর্তী বাঁশবাড়ি এলাকায় ৩১ বা ৩৩ জনের একটি দল (প্লাটুন) ট্রেনিংয়ের জন্য যাই। মাত্র দুই মাস ট্রেনিং নিয়েই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি। ট্রেনিং শেষে প্রথমেই সিলেটের জকিগঞ্জের আস্টগ্রাম এলাকায় একটি ব্রিজ ধ্বংস করার মাধ্যমে স্বশস্ত্র যুদ্ধ শুরু করি। এখানে আমাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন মেজর তাহের। আমাদের গ্রুপে ছিল মোট ১২ যোদ্ধা। পাক বাহিনীর সঙ্গে আমাদের গোলাগুলি হয়।

জাগো নিউজ: শুরুর দিকে মনোভাব কেমন ছিল বা কারও দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয়েছিলেন কি না?

নূর উদ্দিন আহমেদ: ২৫ মার্চ হানাদার বাহিনী যখন হত্যাযজ্ঞ চালাতে শুরু করলো তখনই মনে হলো আমাদের যুদ্ধ করতেই হবে। আন্দোলন করে কিছু হবে না। যে করেই হোক দেশ স্বাধীন করতেই হবে। যুদ্ধে যেতে কারও দ্বারা বাধাগ্রস্ত হওয়ার প্রশ্নই আসে না। কারণ আমি তো কাউকে কিছু বলেই যাইনি। শুধু আমার দাদিকে বলেছিলাম যে, যুদ্ধে যাচ্ছি। তিনি এতো কিছু বুঝতেন না। কান্না করছিলেন, আর শুধু বলেছেন যুদ্ধে গেলে কি মানুষ ফিরে আসে? আমি বললাম দেশ স্বাধীন করে ফিরে আসবো। এই বলেই বেরিয়ে পড়ি। আর কারও সঙ্গে পরামর্শ করে যেতে পারিনি।

jagonews24

জাগো নিউজ: তখনকার প্রতিটি মুহূর্তই ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। এমন কোনো ঘটনা যা আপনার মনকে আজও শিহরিত করে?

নূর উদ্দিন আহমেদ: যুদ্ধ চলাকালে এক সময় লাঠিটিলা সীমান্তে কুকিতলা ক্যাম্পে অবস্থান করছিলাম। ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কাদের ছিলেন আমাদের ক্যাপ্টেন। আমাদের সঙ্গে ক্যাম্পে অবস্থান করছিল সহযোদ্ধা লাখাই উপজেলার বাসিন্দা ইন্দ কুমার চক্রবর্তী। তিনি সশস্ত্র যুদ্ধ বেশ ভয় পেতেন। প্রায়ই অপারেশন এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেন। এটি বুঝতে পেরে তাকে নিতাম না এ কারণে যে, তার জন্য অন্যদের ক্ষতি হয় কি না। একদিন দিলকুশা চা বাগানে পাক সেনাক্যাম্পে আক্রমণের পরিকল্পনা করি। এজন্য চারটি গ্রুপ হলো। একটি এসাল্ট গ্রুপ। তারা ক্রলিং করে ক্যাম্পে প্রবেশ করবে। একটি কাভারিং গ্রুপ। একটি কাটআপ গ্রুপ। অন্যটি অভজারভেশন গ্রুপ। ওই যুদ্ধে তিনি যাওয়ার জন্য উদগ্রিব হয়ে উঠলেন। যথারীতি তাকে নেয়াও হলো। সেখানে যুদ্ধ করতে করতে যখন আমরা ক্যাম্পে প্রবেশ করলাম পাক বাহিনী তখন পিছু হটে। আমরা ভাবছিলাম তারা হয়তো পালিয়ে গেছে। কিন্তু তারা টিলায় ওঁৎ পেতে ছিল। ফেরার সময় ইন্দ কুমার চক্রবর্তী পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে এবং মারা যান। এ ঘটনাটি এখনও মনে হলে আমাকে বেশ পীড়া দেয়।

জাগো নিউজ: বিজয়ের প্রাক্কালে আপনি যেখানে দায়িত্ব পালন করতেন সেখানকার অবস্থা কেমন ছিল?

নূর উদ্দিন আহমেদ: বিজয়ের প্রাক্কালে ৬ ডিসেম্বর আমরা আসি মৌলভীবাজারের শেরপুরে। এখানে এসেই জানতে পারি পাক বাহিনী সবকিছু গুটিয়ে সালুটিকর বিমানবন্দরে জমায়েত হয়েছে। ভারতীয় মিত্র বাহিনী আমাদের জানালো, সেখানেই পাক বাহিনী আত্মসমর্পণ করবে। এরপর আমরা মুক্তিযোদ্ধারা আর অগ্রসর হইনি। আমরা সিলেটে চলে যাই। সেখানে বর্তমান সার্কিট হাউজের পাশে একটি পুলিশ ক্যাম্পে অবস্থান নেই। সে সময় বিজয়ের আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন মুক্তিযোদ্ধাসহ সাধারণ মানুষ।

jagonews24

জাগো নিউজ: বিজয়ের ৫০ বছর পর দেশকে নিয়ে কিছু বলুন?

নূর উদ্দিন আহমেদ: তখন আমাদের যে আশা ছিল। তা আমরা অত্যন্ত ধীরগতিতে অর্জন করছি। এখনও পুরো পাইনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশকে অনেক পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। আজ বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকলে দেশ অনেক আগেই সোনার বাংলা হয়ে যেতো। আমি চাই এ দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক। মানুষ গণতন্ত্র ফিরে পাক। একটি সুখী সমৃদ্ধ দেশ গড়ে উঠুক।

জাগো নিউজ: ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন?

নূর উদ্দিন আহমেদ: ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধরে রেখে কাজ করে তবে দেশ অবশ্যই সোনার বাংলায় পরিণত হবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নও বাস্তবায়ন হবে।

জাগো নিউজ: ধন্যবাদ আপনাকে।

নূর উদ্দিন আহমেদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সৈয়দ এখলাছুর রহমান খোকন/এএইচ/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]