‘চোখ-হাত বেঁধে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ থেকে পদ্মায় ফেলে দেয় পাকবাহিনী’

আমিন ইসলাম জুয়েল আমিন ইসলাম জুয়েল , জেলা প্রতিনিধি ,পাবনা
প্রকাশিত: ০৪:৪২ পিএম, ১৬ ডিসেম্বর ২০২১
সেই দিনের কথা মনে উঠলে আজও শিউরে ওঠেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ সেলিম

কিশোর বয়সে সাঁতার প্রতিযোগিতায় ১৯৬৭, ১৯৬৮, ১৯৬৯ ও ১৯৭০ সালে পর পর চার বছর চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন পাবনা শহরের পৈলানপুর মহল্লার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ সেলিম। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সীমাহীন বর্বরতার শিকার হয়েছিলেন তিনি। হাত-পা বেঁধে প্রমত্ত পদ্মায় ফেলে দেওয়া হয় তাকে। তবে একজন দক্ষ সাঁতারু হওয়ায় নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরেছিলেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। সেই দিনের কথা মনে উঠলে আজও শিউরে ওঠেন জাতির এই বীর সন্তান।

আব্দুল লতিফ সেলিম মুক্তিযোদ্ধা সংসদ পাবনা জেলার ডেপুটি কমান্ডার। তার বাবার নাম এস্কেন্দার আলী সেখ। মা ওলিমা খাতুন। দশম শ্রেণির ছাত্র (বয়স ১৬-১৭) থাকাকালীন বঙ্গবন্ধুর ডাকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন সেলিম।

সত্তর ছুঁইছুঁই তিন ছেলে আর তিন মেয়ের বাবা আব্দুল লতিফ সেলিম। শুনিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে ভয়াবহ, রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা। বললেন, ‘১৯৭১ সালে বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা শুরু করলে পাবনা শহরেও মিলিটারিদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ হয়। মিলিটারিরা পুনরায় শহর দখল করে অত্যাচারের মাত্রা অসম্ভব বাড়িয়ে দিলে ট্রেনিং নিতে এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে ভারত চলে যাই। প্রথমে চুয়াডাঙ্গা থেকে বালুরঘাট, পরে বিহার প্রদেশের পানিহাটায় এক ট্রেনিং সেন্টারে সামরিক ট্রেনিং নিই। ট্রেনিং শেষ করে আগস্টের ৮ তারিখে পাবনাতে চলে আসি। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, মুসলিম লীগ, পিডিপি ইত্যাদি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে কার্যরত বাংলাদেশ স্বাধীনতা বিরোধীদের নকশাল বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে যাই। তারা আমাকে মিলিটারি ক্যাম্পে সোপর্দ করে। এরপর থেকেই আমার ওপর শুরু হয় ভয়াবহ অত্যাচার। শতেক অত্যাচার করেও ওরা আমার কাছ থেকে মুক্তিফৌজের কোনো গোপন কথা বের করতে পারেনি।’

১৯৭১ সালের ২১ আগস্ট একটা গাড়িতে করে আমাকে বাড়ি নিয়ে আসে এবং এক খানসেনা তখন আমাকে পাঞ্জাবি ভাষায় জিজ্ঞেস করে, ‘তুম এই আচ্ছা হায় না?’ ওরা কী বলছে আমি বুঝতে পারিনি। আবার আমাকে বলে মুক্তিফৌজের কথা বলো না হলে তোমার বাড়িঘর সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেবো। আমি তখনও বলি আমি জানি না। তখন ১২ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের মেজর মীর নেওয়াজ খোকন আমার সামনে আমার বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিলো। পরে আমাকে পাকবাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে গেল। আমার সব খেলার সনদপত্র দেখে আমাকে প্রশ্ন করে, ‘তুমি বক্সিং আচ্ছা’। আমি বলি, ‘আমি ছোটদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে প্রথম হয়েছিলাম’।

jagonews24

তখন ১২ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের একজন আমাকে বলে, ‘হাম ভি এ রেজিমেন্ট মে ফার্স্ট হায়। তুম হামারা সাথ লড়ে গা?’ তখন আমি একটু চিন্তা করলাম যে, আজ পাঁচদিন ধরে ওরা আমাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে মারধর করছে। ওর সঙ্গে বক্সিং খেলে ওকে যদি একটা মারি তাও আমার জীবন সার্থক। তাই বললাম, ‘মওকা দেগা তো জরুর লড়ে গা’।

এই কথা বলার পর তাহের সাহেব আমাকে ‘জরুর মওকা দেগা তুমকো’ বলে একজন খানসেনাকে ডেকে আমার হাত দুটো শক্ত করে বাঁধলো। তারপর ঝড়ের মতো আমার বুকের ওপর বক্সিং মেরে যেতে লাগলো। তখন আমি তাকে বললাম, ‘মরদ হ তো মরদ কা তরফ লড়িয়ে’। এ কথা শুনে মারা বন্ধ করে আবার প্রশ্ন শুরু করলো, ‘মুক্তিফৌজ কোথায় এবং নাম দাও’। আমি তখনও একই কথা বললাম কিন্তু ওই বর্বর দস্যুরা তবু আমাকে ছাড়লো না। মারতে শুরু করলো। একটানা ঘণ্টাখানেক আমার শরীরে এলোপাতাড়ি আঘাত করে যেতে থাকলো।

অত্যাচার সহ্য সহ্য করতে না পেরে আমি যখন ঢলে মাটিতে পড়ে গেলাম তখন আমাকে দুজন খানসেনা ধরে একটি ঘরের মধ্যে নিয়ে রাখলো। এভাবে আরও দুদিন আমার ওপর নির্যাতন চালালো। ২৩ সেপ্টেম্বর আমাকে ছেড়ে দেওয়ার হুকুম দেয়। কিন্তু আমি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আরেকটি চালাকি করেছিলাম ওই পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে। আমি তখন মুক্তি নিতে অস্বীকার করি এবং অনুরোধ জানাই, বাইরে গেলে নকশাল ও বদর বাহিনীর লোকেরা ব্যক্তিগত আক্রোশে আমাকে মেরে ফেলবে। তাই রাতে থাকার আশ্রয় চাই।

মনে হয় আমার এই চালাকিটুকু তারা বুঝতে পারেনি। তাই সেদিন আমাকে তারা থাকার অনুমতি দিয়েছিল। আমি তখন পাকবাহিনীর সঙ্গে থেকে যা দু-একটা খবর সংগ্রহ করতাম তা আমাদের মুক্তিফৌজের কাছে পাঠাতে থাকি। এভাবে আমি কৌশল করে চলতে লাগলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই চালাকি বেশিদিন করতে পারলাম না। কারণ পাকবাহিনীর আইবি আমার পেছনে লাগানো ছিল তা আমি বুঝতে পারিনি। তাই ৯ অক্টোবর রাতে আমাকে নতুন আদেশে গ্রেফতার করে এবং ওই রাতেই আমাকে অমানসিক অত্যাচার করে পাবনা শহর থেকে প্রায় ২৩-২৪ মাইল দূরে পাকশি হার্ডিঞ্জ ব্রিজে নিয়ে যায়। ব্রিজের মাঝখানে নিয়ে আমাকে চিত করে শুইয়ে দেয়।

একজন সৈনিক লাফ দিয়ে আমার বুকের ওপর উঠে পড়ে। তখন আমি হাত-চোখ বাঁধা অবস্থায় ছিলাম। তখন আমি যন্ত্রণায় কাতর হয়ে পড়ি এবং পিপাসার জন্য আমার প্রাণ যায় যায়। এ অবস্থায় আমি পানি খেতে চাই। তারা আমাকে হা করতে বলে। আমি হা করি আর অমনি একজন হানাদার পশু আমার জিহ্বায় ছুরিকাঘাত করে। আমার গাল বেয়ে রক্ত পড়তে থাকে। আমি চিন্তা করলাম যে এভাবে থাকলে মারা যাবো। কিন্তু তখনও আমি মনোবল হারাইনি। আমার বিশ্বাস ছিল আমি বেঁচে যাবো। তাই আমি এমন ভাব দেখালাম যে, আমি মারা গেছি।

আমি চোখ বন্ধ করে চুপ করে পড়ে ছিলাম। তখন একজন খানসেনা আর একজনকে বললো, ‘ছোড় দো ইয়ার, মর গিয়া’। তারপর বর্বর হানাদার শত্রুরা আমাকে বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এটা বোঝার সঙ্গে সঙ্গে আমি দুই পায়ের বুড়ো আঙুল এক করে গোড়ালি দুটো একটু ফাঁক করে রাখি। এই অবস্থা দেখে তারা হয়তো ভেবেছিল মরে যাওয়াতেই এমন বাঁকা অবস্থায় শক্ত হয়ে রয়েছে। হাত-চোখ বাঁধা অবস্থায় গভীর অন্ধকারে আমাকে ফেলে দেয় পদ্মার প্রায় ১০০ ফুট নিচে।

প্রথমে আমি পানির গভীরে চলে যাই। যাই হোক পানিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেই বাঁকা হয়ে থাকা পা দুটো সোজা করে নেওয়ায় পা দুটো একটু ঢিলা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু চোখ আর হাঁত বাধা ছিল বলে সে বাঁধন খুলতে পারিনি। পরে বাধা পা দুটো মুক্ত করে চিৎকার দিতে থাকি। ‘বাঁচাও’ ‘বাঁচাও’ চিৎকার করে পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ থেকে প্রায় চার পাঁচ কিলোমিটার দূরে দাদাপুর ঘাটে চলে গিয়েছিলাম।

jagonews24

আমার চিৎকার শুনে এক জেলে আমাকে পদ্মা থেকে টেনে তুলেছিল। এরপর উদ্ধারকারী জেলেরা আমার হাত-পা আর চোখের বাঁধন খুলে দেন। তখন রাত প্রায় শেষ। তখনও আমার ছিদ্র জিভের ক্ষতস্থান থেকে অবিরাম রক্ত ঝরছিল। আমার অনুরোধে জেলেরা দাদাপুরের মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার ওয়াসেক আলীর বাড়িতে পৌঁছে দেন। ওখানে একদিন থাকি। সেখানে একজন গ্রাম্যডাক্তার দিয়ে আমাকে দেখানো হয়। ডাক্তার ওষুধ দিলেন, কিন্তু তখন আমি কিছুই খেতে পারছিলাম না। সারা শরীরও ফুলে ব্যথা। আশ্রয়দাতাদের সেবায় সামান্য সুস্থ হওয়ার পর আমার বাড়ি আসি।

এই বীর মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি হাতড়ে বলতে থাকেন—‘পাবনা শহর আমার জন্য কোনোভাবেই নিরাপদ ছিল না। বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করে তার পরদিন রাতেই আবার ভারত অভিমুখে চুয়াডাঙ্গার পথে রওনা দেই। চুয়াডাঙ্গা হয়ে কলকাতা গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হই। একটু সুস্থ হওয়ার পর যুদ্ধের প্রস্তুতি নেই। মনের মধ্যে একটাই চিন্তা—আমি তো মারাই গিয়েছিলাম। এখন দেশের জন্য যা করবো সেটাই প্রাপ্তি। সেখানে ১৫ দিন চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে আবার চলে আসি পাবনায়। পাবনায় এসে শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর ক্যাম্পে উঠলাম।

এরপর মুক্তিবাহিনীর মেজর ইকবালের সঙ্গে চলে আসি পাবনার রাণীনগরে। এরপর ২৫ জন মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার হয়ে একের পর এক অপারেশন করে সুনাম অর্জন করি। মনে পড়ে, ভারতের আমার ভাই শহীদ আব্দুস সাত্তার লালু হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। ওখানে এক ডাক্তারের প্রশ্ন ছিল—‘আমি কিভাবে বেঁচে ছিলাম?’। বলেছিলাম, ‘মাতৃভূমির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করিনি তাই বেঁচে আছি।’

মুক্তিযুদ্ধে কেন গিয়েছিলেন, জানতে চাইলে আব্দুল লতিফ সেলিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আকাশচুম্বী যে স্বপ্ন ছিল, তার কিছু পূরণ হয়েছে আবার কিছু হয়নি। কিন্তু আমরা স্বাধীন দেশ পেয়েছি, একটা পতাকা, মানচিত্র পেয়েছি। এদেশে এখন কেউ না খেয়ে মরে না। দেশের অবকাঠামোর প্রভূত উন্নয়ন হয়েছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশের জয় জয়কার। আর এসবই হয়েছে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে বলেই। কিন্তু আদর্শগতভাবে যে বাংলাদেশের স্বপ্ন ছিল, তা এখনও অনেক দূরে। এজন্য আরও সংগ্রাম করতে হবে।’

আমিন ইসলাম জুয়েল/এসআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।