কক্সবাজারে পর্যটক ধর্ষণ: তিনজন শনাক্ত, হোটেল ম্যানেজার আটক

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কক্সবাজার
প্রকাশিত: ০৮:১৩ পিএম, ২৩ ডিসেম্বর ২০২১
অভিযুক্ত আশিকুল ইসলাম (বাম দিক থেকে), মেহেদী হাসান বাবু ও ইসরাফিল হুদা জয়

কক্সবাজারে নারী পর্যটককে তুলে নিয়ে ধর্ষণের ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তিনজনকে শনাক্তের কথা জানিয়েছে র‌্যাব-১৫। এছাড়া রিয়াজ উদ্দিন ছোটন (৩৩) নামে এক হোটেল ম্যানেজারকে আটক করা হয়েছে।

শনাক্তরা হলেন কক্সবাজার শহরের মধ্যম বাহারছড়া এলাকার মৃত আব্দুল করিমের ছেলে আশিকুল ইসলাম (২৩) ও মোহাম্মদ শফিক ওরফে গুন্ডা শফির ছেলে ইসরাফিল হুদা জয়।

তবে অন্যজনের পরিচয় জানাতে পারেনি র‌্যাব। তবে অন্যজন আবুল কাসেমের ছেলে মেহেদী হাসান বাবু ওরফে গুন্ডায়া বাবু বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

এ ঘটনায় কক্সবাজার র‌্যাব-১৫ হোটেল ম্যানেজার রিয়াজ উদ্দিনকে আটক করলেও বৃহস্পতিবার (২৩ ডিসেম্বর) সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত মামলা হয়নি। তবে মামলার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন বলে জানিয়েছেন সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মুনীর উল গীয়াস।

এর আগে বুধবার (২২ ডিসেম্বর) রাতে শহরের লাবণী পয়েন্ট থেকে ওই নারী পর্যটককে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। খবর পেয়ে শহরের লাইট হাউজ এলাকার জিয়া গেস্ট ইন নামের একটি হোটেল থেকে একই রাত দেড়টার দিকে তাকে উদ্ধার করে র‌্যাব-১৫।

স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, অভিযুক্ত আশিক সম্প্রতি কারাগার থেকে মুক্ত হয়েছেন। ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত তিনজনই কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি এসএম সাদ্দাম হোসেনের অনুসারী। ঘটনার পর থেকে সাদ্দামের সঙ্গে আশিক ও অন্যদের বিভিন্ন সময় তোলা নানা ধরনের ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেকে আমার কাছে এসে ছবি তুলেছেন। এরাও তাদের মতো। ছবি থাকলে কি ছাত্রলীগ হয়? অভিযুক্তরা কেউ ছাত্রলীগের পদ-পদবিতে নেই বলেও দাবি করেন তিনি।’

ধর্ষণের শিকার ওই নারী গণমাধ্যমকে জানান, বুধবার সকালে ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে স্বামী-সন্তানসহ কক্সবাজারে বেড়াতে আসেন তারা। ওঠেন শহরের হলিডে মোড়ের একটি হোটেলে। বিকেলে সৈকতের লাবণী পয়েন্টে ঘুরতে গিয়ে অপরিচিত এক যুবকের সঙ্গে তার স্বামীর ধাক্কা লাগলে কথা-কাটাকাটি হয়। সন্ধ্যায় পর্যটন গলফ মাঠের সামনে থেকে তার আট মাসের সন্তান ও স্বামীকে সিএনজি অটোরিকশায় করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

কক্সবাজারে পর্যটক ধর্ষণ: তিনজন শনাক্ত, হোটেল ম্যানেজার আটককক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি এসএম সাদ্দাম হোসেনের সেলফিতে আশিকুল ইসলামসহ (চিহ্নিত) অন্যরা

আরেকটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তিন যুবক তাকে তুলে নিয়ে যান পর্যটন গলফ মাঠের পেছনে একটি ঝুপড়ি চায়ের দোকানের পেছনে। সেখানে তারা পালাক্রমে তাকে ধর্ষণ করেন। এরপর তাকে নেওয়া হয় জিয়া গেস্ট ইন নামের একটি হোটেলে। সেখানে ইয়াবা সেবনের পর আরেক দফা তাকে ধর্ষণ করেন ওই তিন যুবক। ঘটনা কাউকে জানালে সন্তান ও স্বামীকে হত্যা করা হবে জানিয়ে রুম বাইরে থেকে বন্ধ করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন তারা।

ওই নারী আরও জানান, জিয়া গেস্ট ইনের তৃতীয় তলার জানালা দিয়ে এক যুবকের সহায়তায় কক্ষের দরজা খোলেন তিনি। তারপর ফোন দেন ৯৯৯-এ। পুলিশ তাকে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরামর্শ দেয়। আরেকজনের সহযোগিতায় কল দেন র‌্যাবকে। পরে র‌্যাব অভিযান চালিয়ে ওই নারীকে উদ্ধার করে পর্যটন গলফ মাঠ এলাকা থেকে স্বামী ও সন্তানকে উদ্ধার করে।

ভুক্তভোগীর স্বামী বলেন, ‘বারবার হাতে-পায়ে ধরলেও তারা আমার স্ত্রীকে ফেরত দেয়নি। বেড়াতে এসেছিলাম বেতন পেয়েছি সেই খুশিতে। এখন স্ত্রীর অবস্থা ভালো নয়।’

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, জেলা ছাত্রলীগ সভাপতির অনুসারী পরিচয় দিয়ে আশিক, বাবু জয়া, রেশাদ, হাসান, আমিনসহ আরও অনেকে হোটেল-মোটেল জোন এলাকায় মাদক, ছিনতাই, দখলসহ নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। ভয়ে কেউ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে চান না। বুধবারও নারীকে নিয়ে এমন ঘটনা ঘটিয়েছেন আশিকসহ অন্যন্যরা।

কক্সবাজারে পর্যটক ধর্ষণ: তিনজন শনাক্ত, হোটেল ম্যানেজার আটককক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি এসএম সাদ্দাম হোসেনের (বামে) সঙ্গে আশিকুল ইসলাম

কক্সবাজার র‌্যাব-১৫ এর সিপিসি কমান্ডার মেজর মেহেদী হাসান বলেন, খবর পেয়ে আমরা হোটেল থেকে ওই গৃহবধূকে উদ্ধারের পর তার স্বামী-সন্তানকে উদ্ধার করি। এরই মধ্যে তিনজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে হোটেল জিয়া গেস্ট ইনের ম্যানেজারকে আটক করা হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

এদিকে, স্বামী-সন্তানকে জিম্মি করে গৃহবধূকে ধর্ষণের ঘটনায় জাতীয় সেবা ৯৯৯ ফোন করে সহযোগিতা চাইলেও ওই নারীকে উদ্ধারে এগিয়ে আসেনি পুলিশ—এমন অভিযোগ অস্বীকার করে কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মুনীর উল গীয়াস বলেন, ‘বুধবার বিকেল থেকে বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত ৯৯৯ থেকে কোনো ফোন কক্সবাজার সদর থানায় সংযুক্ত করা হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ওই নারী পর্যটককে উদ্ধার করে জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিসে (ওসিসি) ভর্তি করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত (সন্ধ্যা সােয়া ৬টা) এজাহার আসেনি। মামলাটি প্রক্রিয়াধীন বলা যায়।’

পুলিশ ধর্ষণের শিকার নারীকে উদ্ধারে এগিয়ে না আসা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কক্সবাজার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ভিকটিমের অভিযোগ গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলে দায়িত্বে অবেহলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সায়ীদ আলমগীর/এসআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।