স্ত্রীর সঙ্গে অভিমান, ২৬ বছর পর ঘরে ফিরলেন চাঁন মিয়া
সময়টা ১৯৯৬ সালের ১৬ জানুয়ারি। স্ত্রীর সঙ্গে অভিমান করে ঘর ছেড়েছিলেন চাঁন মিয়া। এরপর আর বাড়ি ফেরেননি। দীর্ঘ ২৬টি বছর ভবঘুরে জীবনযাপন করেছেন।
কখনও রেলস্টেশন আবার কখনও বাসস্টেশনে ঘুরে ঘুরে তার সময় কেটেছে। আবার কখনও দুমুঠো আহারের জন্য ভিক্ষাবৃত্তিও করতে হয়েছে। অবশেষে অভিমান ভেঙেছে চাঁন মিয়ার। দীর্ঘ ২৬ বছর পর ফেনী থেকে নিজ জেলা শেরপুরে ফিরেছেন। তাকে ঘরে ফিরতে সহযোগিতা করেছে ফেনীর স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘সহায়’।
সবাই তাকে ‘চাঁন মিয়া’ নামে চিনলেও তার আসল নাম মকমুল ইসলাম। তিনি শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার গৌরিপুর ইউনিয়নের নলকরা মণ্ডল বাড়ির মফিজুল ইসলামের ছেলে।
স্বেচ্ছাসেবী মোহাম্মদ দুলাল তালুকদার বলেন, গতবছরের ১০ ডিসেম্বর ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার একটি সড়কের পাশ থেকে অসুস্থ ও অজ্ঞান অবস্থায় চাঁন মিয়াকে তুলে এনে জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে পুলিশ। বেওয়ারিশ রোগী হিসেবে আমাদের সংগঠন ‘সহায়’ থেকে তার তত্ত্বাবধান ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। নিবিড় পরিচর্যায় ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন চাঁন মিয়া। তবে অনেক চেষ্টা করেও তার কাছ থেকে পরিবার ও স্বজনদের কোনো তথ্য বের করা যাচ্ছিল না।
তিনি বলেন, নানা চেষ্টার পর এক পর্যায়ে আংশিক একটি ঠিকানা পান সহায়ের কর্মীরা। পরে ওই ঠিকানা আর ছবি নিয়ে শেরপুরের বিভিন্ন ফেসবুকে ট্যাগ করা হয়। তার স্বজনদের খোঁজ করা হয়। এক পর্যায়ে ফেসবুক পোস্ট দেখে চাঁন মিয়াকে চিনতে পারেন তার স্বজনরা। পরিবারের লোকজন ভিডিও কলে চাঁন মিয়ার সঙ্গে কথা বলে তাকে শনাক্ত করেন। পরে তার মান ভাঙাতে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে চলে আসেন।
বাবাকে নিতে এসে চাঁন মিয়ার মেয়ে আঞ্জুমান আরার ভাষ্যমতে, ১৯৯৬ সালের ১৬ জানুয়ারি স্ত্রীর সঙ্গে অভিমান করে ঘর থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন চাঁন মিয়া। পরে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। এক পর্যায়ে দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে বাঁচাতে ভূমি অফিসে একটি ছোট চাকরি নেন স্ত্রী রিক্তা আক্তার। তারা ধরেই নিয়েছিলেন চাঁন মিয়া হয়তো বেঁচে নেই।

মেয়ে আঞ্জুমান আরা বলেন, ‘বেশ কিছুদিন ধরে মা খুবই অসুস্থ। এখন বাবাকেও পেয়ে গেলাম। আশা করি এর মাধ্যমে আমাদের সংসারে পূর্ণতা ফিরে আসবে ।’
ফেনী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ইকবাল হোসেন ভূঞা জানান, দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকে চাঁন মিয়া এখন কিছুটা ভালো আছেন। তবে বয়সের ভারে কিছুটা নুয়ে পড়েছেন তিনি। নিয়মিত পারিবারিক যত্নে থাকলে তিনি ভালো থাকতে পারবেন।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সহায়ের সহ-সভাপতি জুলহাস তালুকদার জানান, দীর্ঘ সময় ভবঘুরে থাকায় চাঁন মিয়ার জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা জন্মনিবন্ধন কিছুই করা হয়নি। যে কারণে তাকে শনাক্ত করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের পর তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়। শনিবার (১৫ জানুয়ারি) শেরপুর থেকে চাঁন মিয়ার ছোট ভাই শাহজাহান, মেয়ে আঞ্জুমান আরা, চাচাতো ভাই রফিকুল ইসলাম ফেনীতে আসেন। পরে তাদের হাতে চাঁন মিয়াকে তুলে দেওয়া হয়। দীর্ঘ ২৬ বছর পর বৃদ্ধ এ ব্যক্তিকে কাছে পেয়ে স্বজনদের মাঝে ঈদের আনন্দ নেমে আসে।
নুর উল্লাহ কায়সার/এসআর/এমএস