‘মোর ডাকে একটু সাড়া দেও ভাই’

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি বরগুনা
প্রকাশিত: ০৮:৩৮ এএম, ১৫ মার্চ ২০২২
লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের দরজা ধরে কাঁদছেন হাদিসুরের ছোট ভাই তারিক

‘ভাইয়া দ্যাখ, কত মানুষ তোরে দেখতে আইছে। কত ভাইরা আইছে মোগো বাড়িতে। তুই একটু কতা ক। সবারই ভাই কতা কয়, মোর ভাই কতা কয়না। ঢাকা হইতে বাড়ি পর্যন্ত কতবার যে ডাকছি, একবারও তুই সাড়া দেও নাই, এবার তুই মোর ডাকে একটু সাড়া দেও ভাই।’

এভাবে বিলাপ করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরে রকেট হামলায় নিহত এমভি বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজের থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুর রহমানের (৩৩) ছোট ভাই গোলাম মাওলা প্রিন্স।

সোমবার (১৪ মার্চ) রাত পৌনে ১০টার দিকে হাদিসুরে মরদেহ বরগুনার বেতাগী উপজেলার হোসনাবাদ ইউনিয়নের কদমতলা গ্রামে তার নিজ বাড়িতে পৌঁছায়। এর আগে দুপুরে তার মরদেহ নিয়ে ঢাকা বরগুনার পথে রওনা হন স্বজনরা।

jagonews24

ফ্রিজার অ্যাম্বুলেন্সে হাদিসুরের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছাতেই মা-বাবা, ভাই-বোন ও স্বজনদের আহাজারিতে সেখানকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। হাজারো মানুষের ভিড় জমে যায় বাড়িতে। অপরদিকে শোকে মুহ্যমান মা-বাবা ফ্যালফ্যাল করে শুধু প্রিয় সন্তানের মুখ খুঁজছিলেন।

ভাইয়ের মরদেহ বাড়িতে আসছে শুনে সোমবার সকালেই শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবার বাড়ি আসেন হাদিসুর রহমানের বড় বোন সানজিদা আক্তার। রাতে বাড়িতে অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছাতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

কাঁদতে কাঁদতে গোলাম মাওলা প্রিন্স বলেন, ‘ভাই কি আমারে আর ডাক দেবে না। ভাই আমার ঠান্ডা সহ্য করতে পারতো না। সেই ভাই আজ লাশ হইয়া ফ্রিজার গাড়িতে বাড়ি আইছে।’

jagonews24

কাঁদতে কাঁদতে সানজিদা বলেন, ‘ও বলেছিল, বিয়েটা তো করবো তার আগে ছোট দুই ভাইয়ের পড়াশোনা শেষ হোক। সে কারণেই বিয়ে করতে চাইছিল না হাদিসুর। ও বলছিল, ঘরটা একটু ঠিক করে নেই, পরেরবার এসে বিয়ে করবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘সাধারণত সেপ্টেম্বর-অক্টোবর এ দুমাস জাহাজের চাকরিতে অবসর থাকে। মারা যাওয়ার তিন-চার দিন আগে ওর সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। বলেছিলাম ভাই এইবার ছুটিতে বাড়িতে এসে বিয়েটা করে নে। মা প্রায়ই অসুস্থ থাকে। আম্মাকে দেখাশোনার জন্য তো একটা লোক দরকার। ছোট দুই ভাইয়ের পড়া শেষে বিয়ে করবে বলেছিল। সেই ভাই আমার বাড়িতে ফিরলো, কিন্তু লাশ হয়ে।’

jagonews24

হাদিসুরের আরেক ভাই (মেজ) তারিকুল ইসলাম তরিক লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের দরজা ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘ভাইয়া কোথায় গেলি তুই? তোর তো ওখানে থাকার কথা না। তোর তো শেরওয়ানি পরে আসার কথা ছিল ভাইয়া, কিন্তু এটা কি হলো, তুমি আসলা লাশ হইয়া।’

বেতাগী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও হাদিসুরে চাচা মাকসুদুর রহমান ফোরকান জাগো নিউজকে বলেন, ‘মঙ্গলবার সকাল ১০টায় জানাজা নামাজ শেষে দাদা-দাদির কবরের পাশে হাদিসুরকে দাফন করা হবে।’

বেতাগী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুহৃদ সালেহিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘মরদেহ দাফনের জন্য সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।’

jagonews24

জানা গেছে, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন জাহাজ বাংলার সমৃদ্ধি ড্যানিশ কোম্পানি ডেল্টা কর্পোরেশনের অধীনে ভাড়ায় চলছিল। গত ২২ ফেব্রুয়ারি মুম্বাই থেকে তুরস্ক হয়ে জাহাজটি ইউক্রেনের ওলভিয়া বন্দরে যায়। ওলভিয়া থেকে সিমেন্ট ক্লে নিয়ে ২৪ ফেব্রুয়ারি ইতালির রেভেনা বন্দরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার কথা ছিল জাহাজটির।

কিন্তু এর আগেই ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হলে ২৯ জন ক্রু নিয়ে ওলভিয়া বন্দরে আটকা পড়ে জাহাজটি। পরবর্তীতে বুধবার (২ মার্চ) রকেট হামলায় জাহাজের থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুর রহমান মারা যান। তবে জাহাজে থাকা বাকি ২৮ জনকে পরের দিন বৃহস্পতিবার অক্ষত অবস্থায় সরিয়ে নেওয়া হয়।

jagonews24

এরপর একটি আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সহযোগিতায় শনিবার (৫ মার্চ) বাংলাদেশ সময় দুপুরে ইউক্রেনের ওলভিয়া বন্দর সংলগ্ন বাংকার (শেল্টার হাউজ) থেকে বেরিয়ে মালদোভার পথে যাত্রা শুরু করেন নাবিকরা। পরের দিন রোববার (৬ মার্চ বেলা) তারা ইউক্রেন সীমান্ত পেরিয়ে মালদোভা হয়ে রোমানিয়া পৌঁছান।

বুধবার (৯ মার্চ) ২৮ নাবিক রোমানিয়ার বুখারেস্ট বিমানবন্দর থেকে তার্কিশ এয়ারের একটি ফ্লাইটে ইস্তাম্বুল হয়ে ঢাকায় ফেরেন। এরমধ্যে ১২ নাবিক বুধবার রাতেই নভো এয়ারের একটি লোকাল ফ্লাইটে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে পৌঁছান। সোমবার দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায় হাদিসুরের মরদেহ আসে।

এসজে/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।