বিয়ে বিচ্ছেদে দিনাজপুরে পুরুষের চেয়ে দ্বিগুণ এগিয়ে নারীরা

এমদাদুল হক মিলন এমদাদুল হক মিলন , দিনাজপুর
প্রকাশিত: ০৬:০১ পিএম, ১৮ মার্চ ২০২২
প্রতীকী ছবি

দিনাজপুরে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বিয়ে বিচ্ছেদ। আর এই বিচ্ছেদে পুরুষের চেয়ে দ্বিগুণ এগিয়ে জেলার নারীরা। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯ সালে মোট বিয়ের ৩৬ শতাংশই বিচ্ছেদ হয়েছে। ২০২০ সালে তা বেড়ে ৪৫ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। আর করোনা প্রাদুর্ভাবের দ্বিতীয় বছর ২০২১ সালে বিচ্ছেদ হয়েছে ৩৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

তবে বিয়ে বিচ্ছেদ কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী নারীরাই বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বেশি। এছাড়া বর্তমান সময়ে বিয়ে বিচ্ছেদের জন্য পরকীয়াও একটি বড় কারণ।

দিনাজপুর পৌরসভার তালাক সংক্রান্ত সালিসি পরিষদের বৈঠক বসে মাসে দুইবার। গত ১ মার্চ ৩৬টি তালাক সংক্রান্ত বৈঠক ডাকা হয়। এই ৩৬টি বিয়ের বেশির ভাগই ছিল প্রেমের সম্পর্ক। তালাক দেওয়া দম্পতিদের তালিকায় ছিলেন চিকিৎসক, অ্যাডভোকেট, পুলিশসহ সাধারণ দম্পতিরা। ওই ৩৬টি তালাক সংক্রান্ত বৈঠকের ২৭টিই মেয়ের পক্ষ থেকে ডাকা হয়েছিল।

ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আগের চেয়ে কর্মক্ষেত্রে কাজের হার বাড়ায় লোকলজ্জার চেয়ে আত্মসম্মানকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন নারীরা। তাই সংসারে অশান্তি নিয়ে থাকার চেয়ে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তকেই উপযুক্ত বলে মনে করছেন তারা। তবে দিনাজপুর পৌরসভার তালাক সংক্রান্ত সালিসি পরিষদের প্রধান, আইনজীবী ও কাজীরা বলছেন- প্রেম, পরকীয়া ও মাদকের কারণে এখন সবচেয়ে বেশি তালাক হচ্ছে। সালিশ করেও বাঁচানো যাচ্ছে না সংসার।

তালাকের নিয়ম অনুযায়ী, তালাক দেওয়ার পর কাজি অফিস থেকে পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে চিঠি পাঠানো হয়। তালাকের পর পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ ৯০ দিন সময় পান সালিশ করে তালাকের চূড়ান্ত পরিণতি সম্পন্ন করার। সেই নিয়ম অনুযায়ী, দিনাজপুর পৌরসভার তালাক সংক্রান্ত সালিশি পরিষদে সালিশ চলাকালে মাসে দুই দিন ৪০-৪৫টি তালাক সংক্রান্ত নথি উপস্থাপন করা হয়, যার মধ্যে প্রতি সালিশেই কোনো না কোনো তালাক চূড়ান্ত হয়

জেলা রেজিস্ট্রার অফিস সূত্রে জানা যায়, দিনাজপুরে ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মুসলিম সরিয়া অনুযায়ী বিয়ে হয়েছে ১৫ হাজার ৮০২টি, আর তালাক হয়েছে ছয় হাজার ১২৪টি। বিয়ের অনুপাতে বিচ্ছেদের পরিমাণ ৩৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এর মধ্যে ছেলেপক্ষ থেকে তালাক দিয়েছে ১ হাজার ১৮০ জন। আর মেয়েপক্ষ থেকে তালাক দিয়েছে দুই হাজার ৫৫৫ জিন। অন্যদিকে ছেলে-মেয়ে উভয়পক্ষ থেকে তালাক দিয়েছে দুই হাজার ৩৮৯ জন।

দিনাজপুরে ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিয়ে হয়েছে ১২ হাজার ২৬৭টি, আর তালাক হয়েছে পাঁচ হাজার ৫৩০টি। বিয়ের অনুপাতে বিচ্ছেদের পরিমাণ ৪৫ শতাংশ। এর মধ্যে ছেলেপক্ষ থেকে তালাক দিয়েছে ৯৭৭ জন। আর মেয়েপক্ষ থেকে তালাক দিয়েছে দুই হাজার ২১৩ জন। অন্যদিকে ছেলে-মেয়ে উভয়পক্ষ থেকে তালাক দিয়েছে দুই হাজার ৩৪০ জন।

এর আগে ২০১৯ সালে বিয়ে হয় ১৫ হাজার ৬৮৮টি, আর তালাক হয় পাঁচ হাজার ৬৭৬টি। বিয়ের অনুপাতে তালাকের পরিমাণ ৩৬ শতাংশ। ২০১৮ সালে বিয়ে হয় ১৫ হাজার ৫৫৯টি, আর তালাক হয় পাঁচ হাজার ২০৮টি। ২০১৭ সালে বিয়ে হয় ১৪ হাজার ২৬৪টি, আর তালাক হয় পাঁচ হাজার ৩৪৫টি। বিয়ে ও বিচ্ছেদ থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় হয়েছে ১০ লাখেরও বেশি টাকা।

দিনাজপুর পৌরসভার তালাক সংক্রান্ত সালিশি পরিষদের প্রধান প্যানেল মেয়র আবু তৈয়ব আলী দুলাল বলেন, নারীদের তালাক দেওয়ার হার পুরুষের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত মোবাইল ব্যবহারকারী মেয়েরা বেশি পরকীয়ায় জড়িয়ে সংসার নষ্ট করছে। কোনোভাবেই তাদের সংসার রক্ষা করা যাচ্ছে না। পরকীয়া, মাদক ও মোবাইলে প্রেমের ঘটনা তালাকের জন্য সবচেয়ে দায়ী।

দিনাজপুর পৌরসভার ১১নং ওয়ার্ডের কাজী মো. জাকারিয়া বলেন, মেয়েরা বেশি তালাক দিচ্ছে। আর কিছু তালাক হচ্ছে তথ্য গোপন করে বিয়ের কারণে। আবার কিছু মেয়ে বিয়ে ও তালাককে অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

দিনাজপুরের আইনজীবী সাথী দাস বলেন, পারিবারিক বন্ধনের চেয়ে এখন অনেক নারী নিজের পেশাজীবনকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তাছাড়া মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ফলে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিতে এখন আর দ্বিধা করছেন না নারীরা। তবে সংসার রক্ষার ক্ষেত্রে মেয়েদের সক্ষমতার পাশাপাশি পরিবারের প্রতি যত্নবান হওয়া উচিত।

দিনাজপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এপিপি অ্যাডভোকেট মিন্টু কুমার পাল বলেন, আমাদের আকাশ সংস্কৃতি এবং মোবাইলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেয়েরা পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে তালাকের মতো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ছেলেরা মাদকে জড়িয়ে পড়ে সংসার ভাঙছে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থাকায় একজন নারী পারিবারিক বন্ধনের চেয়ে নিজের পেশাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, একমাত্র ধর্মীয় অনুশাসন ও মানসিকতার পরিবর্তন ছাড়া এ অবস্থা থেকে উত্তরণের কোনো বিকল্প নেই।

এমআরআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।