খোদ লবণচাষিরাই খান না আয়োডিনযুক্ত লবণ
দেশের চাহিদার শতভাগ উৎপাদিত দেশীয় পণ্য লবণ। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর কিছু অংশ এবং কক্সবাজারের কয়েকটি উপজেলায় প্রায় ৭০ হাজার একর মাঠে এসব লবণ উৎপাদন করছেন প্রায় ২৭ হাজার লবণচাষি। আর এসব লবণ প্রক্রিয়াজাত করতে ঈদগাঁও উপজেলার ইসলামপুর শিল্প এলাকায় সচল রয়েছে অর্ধশতাধিক লবণ মিল।
জেলার বিভিন্ন স্থানে উৎপাদিন লবণ স্থল ও জলপথে আনা হয় ইসলামপুরের বিভিন্ন মিলে। এসব মিল থেকে প্রক্রিয়াজাত শেষে লবণ চলে যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে।
দেশের মানুষের আয়োডিনের চাহিদা পূরণের চেষ্টায় শরিক হচ্ছেন কক্সবাজার জেলার লবণচাষে জড়িত ২২ হাজার ৫শ চাষি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো এসব চাষির পরিবার রান্নায় নিয়মিত মাঠের লবণই ব্যবহার করেন। আয়োডিনযুক্ত লবণ সম্পর্কে চাষিদের পরিবারে ধারণা কম।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের ২০১৯ এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে কক্সবাজারের ৭৭ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ সঠিক পরিমাণের আয়োডিনযুক্ত লবণ পরিবারে ব্যবহার করছেন না।
তাই চাষি পরিবারে আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিনামূল্যে আয়োডাইজ লবণ বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে ইউনিসেফ। লবণচাষিদের শতভাগ পরিবারকে আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে চাষিদের মাঝে বিনামূল্যে আয়োডিনযুক্ত লবণ বিতরণ কর্যক্রম শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ লবণচাষ শুমারির আওতাভুক্ত সাড়ে ৮শ লবণচাষি পাচ্ছেন প্রতিমাসে দু’কেজি করে আয়োডিনযুক্ত লবণ।
মঙ্গলবার (১৯ এপ্রিল) সকালে ইসলামপুর এলাকায় লবণচাষিদের মাঝে আয়োডিনযুক্ত লবণ বিতরণ এবং সচেতনতামূলক প্রচারভিযানের আয়োজন করা হয়।

এতে আয়োডিনযুক্ত লবণ নিতে আসা চাষি জয়নাল আবেদীন বলেন, আমরা ‘র’ লবণ উৎপাদন করি। সেই লবণে আয়োডিন মেশানো হয় এটা শুনেছি কিন্তু কখনও মিশাইনি। যেহেতু আমরাই চাষ করি, সেহেতু আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারে উদ্যোগী হয়নি। মাঠের লবণ ব্যবহারে আমাদের তেমন কোনো সমস্যাও হয়নি। তবে আয়োডিনযুক্ত লবণ না খেলে গলগণ্ড রোগসহ নানা সমস্যার কথা শোনার পর আমরা এখন থেকে আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করবো।
লবণচাষী আব্দুল কাদের বলেন, শিশু এবং গর্ভবতী মায়ের জন্য আয়োডিন দরকার। আমরা এই তথ্য আগে শুনলেও গুরুত্ব দিইনি। অনুষ্ঠানে এসে জানলাম এটির অভাবে কী অঘটন ঘটতে পারে।
আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার না করায় মানবদেহে ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে মন্তব্য করে পুষ্টি বিশেষেজ্ঞ ইউনিসেফ বাংলাদেশের পুষ্টি অফিসার ড. আইরিন আখতার চৌধুরী বলেন, লবণ যেখানে উৎপাদন হয়, আগে সে এলাকার মানুষকে সচেতন করতে হবে। আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহারে অভ্যস্ত করতে হবে তাদের। এলাকার লবণ মিল মালিকরা আয়োডিনযুক্ত লবণ উৎপাদনে আগ্রহী হলে আয়োডিনবিহীন লবণ ব্যবহার অনেকটা কমে আসবে বলে মনে করেন এই পুষ্টি বিশেষজ্ঞ।

তিনি আরো বলেন, ইসলামপুল মিল মালিক সমিতির আওতায় ৫২টি মিল লবণ প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু তারা নিজস্ব মিলে লবণে আয়োডিন মেশাতে চান না। এরকম হতে থাকলে দেশে আয়োডিনের ঘাটতি থেকেই যাবে।
তিনি বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে ইসলামপুরের সাড়ে আটশ চাষিদের একটি ডাটাবেজ তৈরি করেছি। এসব চাষি এবং মিলারদের সব ধরনের তথ্য একটি ওয়েবসাইটে সংরক্ষণ থাকবে। বিনামূল্যে লবণ পেতে সমিতির নিজস্ব ওয়েবসাইড থেকে সরাসরি চাষিদের মোবাইলে ক্ষুদে বার্তা চলে যাবে। এই ক্ষুদে বার্তা দেখালে সমিতির নির্দ্দিষ্ট বুথ থেকে দুই কেজি করে বিনামূল্যে আয়োডিনযুক্ত লবণ পাবেন চাষিরা।
বিসিক সূত্র জানায়, দেশের ২০২১-২২ অর্থবছরে লবণের লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ করা হয় ২৩ লাখ ৫৭ হাজার মেট্রিক টন। তার বিপরীতে লবণ মৌসুমের এই চার মাসে উৎপাদন হয়েছে ১৫ লাখ সাড়ে ১৭ হাজার মেট্রিক টন। প্রতিবছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি লবণ উৎপাদন হলেও অধিকাংশ মিলাররা মাঠ থেকে তোলা লবণে আয়োডিন মেশাতে চান না।
সায়ীদ আলমগীর/এফএ/জেআইএম