৭ দিন ধরে নৌকায় মানবেতর জীবন জালাল-মহিরন দম্পতির

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কুড়িগ্রাম
প্রকাশিত: ০৪:৫৮ পিএম, ২৩ জুন ২০২২

‘সাতদিন ধরে বাড়িতে পানি। আমরা ঘরে যেতে পারি না। এখন ভাত এই নৌকায় পাকাইলাম (রান্না করলাম)। হাড়ি-পাঁতিল, খ্যাতা-বালিশও (কাঁথা-বালিশ) এখানে। ভাত খ্যায়া-দ্যায়া (খাওয়ার পর) সন্ধ্যার দিকে সরকারি স্কুলঘরের বারান্দায় গিয়ে নৌকায় শুয়ে থাকি।’

কথাগুলো বলছিলেন কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের পোড়ারচর এলাকার বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব জালাল উদ্দিন।

ভারি বর্ষণ ও উজানের ঢলে ব্রহ্মপুত্রের পানি বেড়ে প্লাবিত হয়ে তলিয়ে গেছে জালাল উদ্দিনের বসতবাড়ি। থাকার জায়গা না থাকায় সাতদিন ধরে নৌকায় বসবাস করছেন জালাল উদ্দিন ও তার স্ত্রী মহিরন বেগম।

৭ দিন ধরে নৌকায় মানবেতর জীবন জালাল-মহিরন দম্পতির

বুধবার (২২ জুন) সরেজমিন কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের পোড়ারচর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নৌকার এক প্রান্তে বসে নৌকা চালাচ্ছেন জালাল উদ্দিন। অপর প্রান্তে বসে আছেন স্ত্রী মহিরন বেগম। বালিশ, কাঁথাসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নৌকায় ছড়ানো-ছিটানো। মাঝে একটি মাটির চুলা। চুলায় একটি হাড়িতে করে ভাত রান্না করা হচ্ছে। কিছু ঢেঁড়স সিদ্ধ করতে দেওয়া হয়েছে।

সকালে কী খেয়েছেন আর দুপুরে কী খাবেন জানতে চাইলে জালাল উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘রাতের পান্তা ভাত ছিল তা সকালে খেয়েছি। এখন ভাত রান্না করলাম। তাতে ঢেঁড়স সিদ্ধ করেছি। সিদ্ধ ঢেঁড়স ভর্তা করে ভাত খাবো।’

৭ দিন ধরে নৌকায় মানবেতর জীবন জালাল-মহিরন দম্পতির

জালাল উদ্দিনের স্ত্রী মহিরন বেগম বলেন, ‘আমগোর অহন (এখন) বন্যা আইছে (এসেছে)। বাড়ি-ঘরটর (বসতঘর) ডুবি গেছে, কিচ্ছু নাই। আবাদ তো নাই। খাওয়া-দাওয়ারও সমস্যা।’

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনমাস আগে ব্রহ্মপুত্রের কবলে বসতভিটে হারিয়ে জালাল উদ্দিনসহ তারা সবাই পোড়ারচরে এসে বসতি গড়েন। কিন্তু ভারি বর্ষণ ও উজানের ঢলে ব্রহ্মপুত্রের পানি বেড়ে তাদের বসতবাড়ি তলিয়ে গেছে। এতে সবাই পরিবার নিয়ে নিজ নিজ নৌকায় আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের মতো জালাল উদ্দিন ও তার স্ত্রীও আশ্রয় নিয়েছেন নৌকায়। সবাই এখন শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানিসহ নানা সংকটে ভুগছেন।

অনেকে গবাদিপশুগুলো আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে রেখে এসেছেন। জালাল উদ্দিনও তার একটি মাত্র গরু একই ইউনিয়নের ভগবতীপুর এলাকায় তার একমাত্র মেয়ের বাড়িতে রেখেছেন। তার এক মেয়ে ছাড়াও দুই ছেলে রয়েছে।

বড় ছেলে ঢাকায় দিনমজুরের কাজ করেন। বড় ছেলের আয়ের টাকায় ছোট ছেলের লেখাপড়ার খরচ চলছে। তাই জালাল উদ্দিনকে রোজগার করেই সংসার চালাতে হয়।

৭ দিন ধরে নৌকায় মানবেতর জীবন জালাল-মহিরন দম্পতির

স্থানীয় ইউপি মেম্বার আনোয়ার হোসেন জানান, বন্যার পানিতে বাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় জালাল উদ্দিনসহ ওই গ্রামের ৭০টি পরিবারের তালিকা চেয়ারম্যানের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।

যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর বলেন, উপজেলা প্রশাসন থেকে ৫০০ জন বন্যার্তের জন্য ত্রাণ বরাদ্দ পেয়েছিলাম। প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে মোট ৫০০ জনের তালিকা করে আজ তাদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম জানান, ৯ উপজেলার বন্যাকবলিত মানুষের জন্য ৩৩৮ মেট্রিক টন চাল, নগদ ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ১ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার, ১৮ লাখ ৯৫ হাজার টাকার শিশুখাদ্য ও ১৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকা গোখাদ্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এগুলো বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

মাসুদ রানা/এসআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।