ফেনীতে অটোমোবাইল ওয়ার্কশপে নীরব বিপ্লব
<> তিন শতাধিক ওয়ার্কশপ রয়েছে ফেনীতে
<> প্রতি মাসে অর্ধশত বাস-ট্রাকের বডি তৈরি
<> বছরে ৬০ কোটি টাকার লেনদেন
জরাজীর্ণ, ভাঙা, দুমড়ানো-মোচড়ানো চেহারার একটি গাড়ি মাত্র কদিনের ব্যবধানে সম্পূর্ণ নতুন চেহারা নিয়ে রাস্তা দাপিয়ে বেড়ায়। নতুন জীবন পেয়ে টিকে থাকে বছরের পর বছর। সুনিপুণ কারিগরি দক্ষতায় এমনটি সম্ভব করে তোলেন ফেনীর অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ শ্রমিকরা। নামকরা কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সুপরিসর ক্যাম্পাসে নয়, এ নৈপুণ্য তারা অর্জন করেছেন গুরুর কাজ দেখে, শিখে।
শহরের কয়েকটি অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ ঘুরে জানা গেছে, ফেনীতে মোটর ওয়ার্কশপের যাত্রা বেশি দিনের নয়। ১৯৯০ সালের প্রথম দিকে ফেনী শহরের একাডেমি সড়কে অটোমোবাইল ওয়ার্কশপের যাত্রা শুরু হয়। এরপর শহরের অদূরে হাজারী সড়ক, পাঁচগাছিয়া, লালপুল, মহিপাল, দাগনভূঞা ও ছাগলনাইয়ায় এর বিস্তার ঘটে।

একটি বিকাশমান শিল্প হিসেবে দ্রুত এর প্রসার ঘটতে থাকে। বৃহত্তর নোয়াখালী, কুমিল্লার দক্ষিণাংশ ও চট্টগ্রামের উত্তরাংশে ফেনীর ওয়ার্কশপগুলো হয়ে ওঠে প্রসিদ্ধ। বিশেষ কোনো প্রশিক্ষণ বা তত্ত্বজ্ঞান ছাড়াই এখানকার ওয়ার্কশপ শ্রমিকরা অগ্রজ মিস্ত্রিদের কাজ দেখে আর নিজেদের মেধা খাটিয়ে এ বিষয়ে অর্জন করেছেন অসাধারণ দক্ষতা।
সূত্র জানায়, ফেনী শহর ও উপজেলাগুলোতে প্রায় তিন শতাধিক ওয়ার্কশপ রয়েছে। এগুলোতে কাজ করেন চার হাজারের বেশি শ্রমিক। এসব ওয়ার্কশপে প্রতি মাসে অর্ধশত বাস ও ট্রাকের বডি তৈরি হয়। আর মেরামত কাজ কী পরিমাণ হয় তার হিসাব নেই। এর মাধ্যমে বছরে ৬০ কোটি টাকারও বেশি লেনদেন হচ্ছে। তবে এখানে প্রযুক্তির ব্যবহারে অনেক পিছিয়ে শ্রমিকরা।
একাডেমির জনতা মোটরসের মালিক এনামুল হক। তিনি জাগো নিউজকে জানান, ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রামের যে কোনো ওয়ার্কশপের একটি হিনো গাড়ির বডি তৈরিতে খরচ হয় ২০ লাখ টাকা। অথচ ফেনীতে এটি ১৫ লাখ টাকায় তৈরি করা হয়। একইভাবে মিনিবাসের বডি তৈরিতে ১০ লাখ টাকা লাগলে তা এখানে ৭-৮ লাখ টাকায় তৈরি করা যায়। ট্রাকের বডি তৈরিতে ঢাকার ওয়ার্কশপগুলো চার লাখ টাকা নিয়ে থাকে। ফেনীতে এটি তৈরিতে খরচ হয় তিন লাখ টাকা।

এনামুল হক বলেন, ক্রেতা হাতে রাখার স্বার্থে অনেকে তৈরি খরচ কমিয়ে দিয়ে বাজারে অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করেন। এতে ওয়ার্কশপ মালিকদের লোকসান গুনতে হয়। ওয়ার্কশপ মালিকদের প্রতিযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে এ প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে। যে কারণে সব জিনিসের দাম বাড়লেও গাড়ির বডি তৈরির মজুরি কমেছে।
‘শুধু নতুন বডি তৈরি নয়, অনেকে ওয়ার্কশপ গাড়ি রিমডেলিংয়ের কাজ করে থাকেন। অর্থাৎ বডি নষ্ট হয়ে যাওয়া অতি পুরোনো জরাজীর্ণ গাড়ির চেসিস মেরামত করে নতুন বডি তৈরি করা হয়, যা ৩০-৪০ বছর পর্যন্ত টেকসই হয়’, যোগ করেন জনতা মোটরসের মালিক এনামুল হক।

কাজের মান ভালো হওয়ায় আশপাশের ১৫ উপজেলার গাড়িমালিকরা বডি তৈরির জন্য ফেনীতে আসেন বলে জানান মহিপালের মোহাম্মদীয়া অটো মোবাইলসের মালিক মো. আইয়ুব।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানে শুধু বডি তৈরি নয়; ইঞ্জিন, পার্টস লাগানো, ওয়্যারিং, ডেন্টিং, পেইন্টিং, লোহার কাজসহ যাবতীয় কাজ করা হয়। এজন্য গাড়িমালিকরা এখানে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
ফেনীর বেশিরভাগ ওয়ার্কশপ গড়ে উঠেছে শহরতলীর একাডেমি রোড, হাজারী রোড়, পাঁচগাছিয়া, লালপুল, মহিপালসহ ছয় উপজেলায়।

তবে একাডেমি এলাকার ব্যবসায় কিছুটা ভাটা পড়েছে বলে জানান ফেনী একাডেমির স্মৃতি মোটরসের মালিক শাহ জাহান। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না। রাস্তায় পানি জমে থাকে। এজন্য এদিকে কেউ আসতে চান না।
ওয়ার্কশপ মালিকরা বলছেন, এ শিল্পে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে যে কোনো মডেলের গাড়ির বডি তৈরি করা সম্ভব। এ খাত থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব বলেও জানান তারা।
পাঁচগাছিয়ার বিসমিল্লাহ অটো মোবাইলসের স্বত্বাধিকারী আবদুল হক জানান, এ শিল্পের উপাদান লোহা, অক্সিজেন, গ্যাসসহ অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়েছে। সে হিসেবে তৈরির মজুরি বাড়েনি। এতে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা কোনোরকমে দিনাতিপাত করছেন।

তিনি বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে বেশিরভাগ সময় কাজ বন্ধ থাকে কিন্তু শ্রমিকদের বেতন ঠিকই দিতে হয়। সম্ভাবনাময় শিল্পটিকে এগিয়ে নিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
জানতে চাইলে ফেনী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আইনুল কবির শামীম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ফেনীতে অটোমোবাইল তথা গাড়ির বডি তৈরির প্রতিষ্ঠানগুলো আছে। এগুলো আসলে শিল্প বা ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে পড়ে না। তারা আমাদের এখানকার সদস্য নয়। তবে বিচ্ছিন্নভাবে তারা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছেন।’
এসআর/জিকেএস