রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে ভুলতে পারেননি বৈরাগীরচালার মানুষ
ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুতে তার স্মৃতিবিজড়িত গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বৈরাগীরচালা গ্রামের মানুষও শোকাহত। কালো পতাকা উত্তোলন করে শোক প্রকাশ করছেন তারা। ১৯৮৩ সালের ১৬ নভেম্বর স্বনির্ভর গ্রামের চিত্র দেখতে এখানে এসেছিলেন তিনি। আজ রানি নেই কিন্তু সেই স্মৃতি ভুলতে পারেনি এলাকাবাসী।
শ্রীপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. শফিকুল ইসলাম জানান, তার আগমনে শ্রীপুরের বৈরাগীরচালা গ্রামে বিদ্যুতের ছোঁয়া লাগে। শ্রীপুর-বৈরাগীরচালা সড়ক ও রেলস্টেশনের প্লাটফর্মটি পাকা করা হয়। উপজেলা পরিষদ ও হাসপাতালের নতুন ভবন ও অবকাঠামো নির্মিত হয়। সে সময় শ্রীপুরকে নতুন করে সাজানো হয়। বৈরাগীরচালা গ্রামটি বিশ্বে আলোচিত হয়।
তিনি জানান, আমি তখন শ্রীপুর সরকারি পাইলট হাইস্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। রানির আগমনের দিন সবাইকে একই ড্রেস পড়ে শ্রীপুর রেলওয়ে স্টেশনের পাশে রানিকে রিসিভ করার জন্য নেওয়া হয়। ছাত্রদের দুই হাতে বাংলাদেশ ও ব্রিটেনের পতাকা এবং ছাত্রীরা ফুল নিয়ে বরণ করার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রানি ঢাকা থেকে বলাকা কমিউটার ট্রেনে করে শ্রীপুর আসেন। পরে সেখান থেকে গাড়িযোগে তিন কিলোমিটার দূরে বৈরাগীর চালা গ্রামে যান। সেখানে লাল গালিচা ও ফুলেল সংবর্ধনা দেন দেওয়া হয়। সেদিন থেকে রানিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণে রেখেছেন এ গ্রামের মানুষ।
বৈরাগীরচালা গ্রামের মানুষের কাছে রানির পরিচিতি ছিল একটু ভিন্ন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে বৈরাগীরচালা গ্রামটি স্বনির্ভর গ্রাম হয়ে উঠে। ওই বছরের ১৬ নভেম্বর থেকে গ্রামবাসী স্বনির্ভর গ্রাম হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন। ওই সময় দ্বিতীয় রাণি এলিজাবেথের স্বাধীন বাংলাদেশে একমাত্র সফর। প্রেসিডেন্ট এরশাদও সে সময় সফরসঙ্গী ছিলেন।
বৈরাগীরচালা গ্রামের বাসিন্দা একেএম মো. সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, ১৯৮৩ সালে গ্রামটি ছিল স্বনির্ভর গ্রাম। রানি বাংলাদেশে সফরে আসবেন। তৎকালীন মেজর জেনারেল আব্দুর রহমান খান বাবাকে জানিয়েছিলেন রানি বৈরাগীরচালা স্বনির্ভর গ্রামটি পরিদর্শনে যাবেন। রানি আসার চার মাস আগে মেজর রহমানও গ্রামটি দেখে গেছেন। তখন গ্রামের মানুষের গোয়াল ভর্তি গরু-ছাগল, খামার ভর্তি মুরগি, পুকুর ভর্তি মাছ, ফসলি জমি, শাকসবজি-তরি-তরকারি সবকিছু ছিল। কোনো কিছুর অভাব ছিল না এ গ্রামের মানুষের মধ্যে। তারা বাইরে থেকে কিছু আমদানি করতেন না। মূলত এ দৃশ্য দেখতে ব্রিটেনের দ্বিতীয় রানি এলিজাবেথ গ্রামটিতে আসেন।

তিনি আরও জানান, ওই সময় তার বাবা মিজানুর রহমান খান শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। বাড়ির চারপাশ ঘুরে দেখে স্বনির্ভর গ্রামের পরিচয় গ্রহণ করেন ব্রিটেনের রানি। গ্রামবাসীর পক্ষ থেকে রানিকে একটি রুপার চাবি উপহার দেওয়া হয়।
সালেহা আক্তার নামের সত্তরোর্ধ এক নারী বলেন, কাঁঠাল বাগানে বসে স্থানীয় নারীদের সঙ্গে গল্প করেন রানি।
বৈরাগীরচালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের (অব.) সহকারী শিক্ষক আব্দুর রহিম বলেন, তখন স্কুলটি টিনশেডের চাপড়া ঘর ছিল। পাশের বৈরাগীরচালা হাইস্কুলটি ছিল সেমিপাকা টিনশেডের। এখন সেই স্কুল দুইটি পাকা ও বহুতল ভবন বিশিষ্ট। তবে রানি এলিজাবেথ বৈরাগীরচালা গ্রামে এসে যে পুকুরে মাছ অবমুক্ত করেছিলেন সে পুকুরটি এখন পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। পুকুরের পাড় ভেঙে গেছে।
রেডক্রিসেন্ট মাতৃসদনের মিড ওয়াফ আঞ্জুমান আরা শিউলি জানান, তখনকার সময়ে গড়ে উঠা বৈরাগীরচালা রেড ক্রিসেন্ট মাতৃসদন, পোস্ট অফিস এখনও চালু রয়েছে। সেখানে গড়ে উঠা অগ্রণী ব্যাংকের বৈরাগীচালা শাখাটি আর সেখানে নেই। রানি ওই সময় এ মাতৃসদনটিও দেখে গেছেন। তার স্মৃতি বিজড়িত মাতৃসদনটি থাকলেও আজ রানি নেই।
রোকয়া বেগম নামের আরেক বৃদ্ধা বলেন, রানিকে কাছ থেকে আমরা দেখেছি। রানির সঙ্গে বসে গল্প করেছি। তার কথা আমরা বুঝিনি, তবে সঙ্গে থাকা লোকজন আমাদের বুঝিয়ে দিতেন। আমাদের ভাগ্য ব্রিটেনের রানিকে খুব কাছ থেকে দেখতে পেয়েছি। তিনি পুকুর ঘুরে দেখন, পুকুরের পাশে স্থাপিত কুঁড়েঘর তিনি বসেছিলেন। পুকুরের পাড়ে ছিল কুটির শিল্প, তাঁতশিল্প, পোল্ট্রি ফার্ম ও সেখানে ধান থেকে ঢেঁকি দিয়ে চিড়া ও চাল তৈরি কার্যক্রম দেখেছেন।
শ্রীপুর পৌরসভার মেয়র মো. আনিছুর রহমান বলেন, ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের শ্রীপুরে আগমন বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের গৌরবান্বিত করেছিল। রানির পদচারণায় শ্রীপুরের উন্নয়নের সূচনা হয়। আমরা রানির স্মৃতিকে কখনো ভুলব না। ব্রিটেনর রানির প্রয়াণে আমরা গভীর ভাবে শোকাহত। তার আত্মার শান্তি কামনা করি।
আরএইচ/এএসএম