মির্জাপুরে পুলিশ ফাঁড়িতে হত্যা মামলার আসামির ‘মৃত্যু’

উপজেলা প্রতিনিধি উপজেলা প্রতিনিধি মির্জাপুর (টাঙ্গাইল)
প্রকাশিত: ০৬:২৪ পিএম, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২
বাঁশতৈল পুলিশ ফাঁড়িতে মারা যাওয়া লেবু মিয়া

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার বাঁশতৈল পুলিশ ফাঁড়িতে হত্যা মামলার আসামি মো. লেবু মিয়া (৫০) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। পুলিশের দাবি, তিনি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তবে স্বজনদের দাবি, পুলিশের নির্যাতনে মারা গেছেন তিনি।

মঙ্গলবার (২৭ সেপ্টেম্বর) ভোর সাড়ে ৬টার দিকে ফাঁড়ির হাজতখানার টয়লেট থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। লেবু বাঁশতৈল গ্রামের বাহার উদ্দিনের ছেলে।

এদিকে, লেবুকে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ তুলে এলাকাবাসী ও পরিবারের
লোকজন দুপুর পৌনে ২টা থেকে গোড়াই-সখিপুর আঞ্চলিক সড়কের বাঁশতৈল বাজারে সড়ক অবরোধ করেন। এসময় বিক্ষুব্ধ জনতা সড়কের ওপর টায়ার জালিয়ে বিক্ষোভ করেন। সখিপুর সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার এস এম রাকিবুর রাজা ঘটনাস্থলে গিয়ে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচারের আশ্বাস দিলে সোয়া ৩টার দিকে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। এসময় সড়কের উভয়পাশে কমপক্ষে আট কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়।

পরিবারের লোকজন অভিযোগ করে বলেন, লেবু মিয়া নির্দোষ। তাকে সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বাঁশতৈল ফাঁড়ির পুলিশ আটক করে নিয়ে আসে। রাতে ওই ফাঁড়িতে লেবুকে আটক রাখে। মঙ্গলবার সকালে তারা মৃত্যুর খবর পান। লেবুকে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেন।

jagonews24

লেবুর ভাতিজা সাদ্দাম হোসেন অভিযোগ করে বলেন, দুপুরে আটক করলেও তার বিরুদ্ধে রাতে কেন হত্যা মামলা হলো? হাজত খানার ভেতর কিভাবে রশি যাবে, এটি আমার প্রশ্ন। তাছাড়া যেখানে ফাঁস লাগিয়েছে সেখানে কিভাবে ওঠা সম্ভব? মরদেহ নামানোর আগে আমাদের পরিবারের কাউকে জানানো হয়নি কেন?

লেবুর স্ত্রী আলেয়া বেগম বিলাপ করতে করতে বলেন, আমার স্বামী দিনমজুরি করে সংসার চালায়। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে। মেজো মেয়ে ডিগ্রি ফাইনাল ও ছোট ছেলে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। সোমবার দুপুরে কাজ থেকে বাড়ি ফেরার পর গোসল করে দুপুরের খাবার খায়। এর কিছুক্ষণ পর বাঁশতৈল ফাঁড়ি পুলিশ বাড়ি থেকে আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে যায়।

তবে পুলিশ জানায়, পাঁচ বছর আগে তিন সন্তানের জননী সখিনা বেগমের (৪৩) সঙ্গে বাঁশতৈল গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে মফিজুর রহমানের (৪৭) বিচ্ছেদ হয়। এরপর থেকে তিনি একই গ্রামে আলাদা বাড়ি তৈরি করে দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে বসবাস করতেন। মেয়েদের বিয়ে হওয়ায় প্রবাসী ছেলের স্ত্রীকে নিয়ে ওই বড়িতে থাকতেন তিনি। রোববার রাতে সখিনা বাড়িতে একা ছিলেন। সোমবার দুপুরে সখিনার মা ও পাশের বাড়ির লোকজন ওই বাড়িতে যান। ভেতর তার মরদেহ দেখতে পেয়ে বাঁশতৈল পুলিশ ফাঁড়িতে খবর দেন। পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে।

ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে সখিনার সাবেক স্বামী মফিজুর রহমান এবং একই গ্রামের বাসিন্দা লেবু মিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে পুলিশ। এরপর সখিনার বড় ভাই বাদশা মিয়া সোমবার রাতে মফিজুর রহমান ও লেবু মিয়াকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। বাঁশতৈল ফাঁড়ি পুলিশ মফিজুর এবং লেবু মিয়াকে সোমবার রাতে পৃথক হাজতখানায় রাখে। ভোরে হাজতখানায় লেবু মিয়ার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

লেবু মিয়ার বড় ভাই নারপুরের ভাদ্রা ইউনিয়নের সচিব মো. বজলুর রশিদের অভিযোগ, পুলিশের নির্যাতনে তিনি মারা গেছেন। তিনি এর বিচার দাবি জানিয়েছেন।

বাঁশতৈল ইউপির এক নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য মো. ইদ্রিস আলী অভিযোগ করে বলেন, বাঁশতৈল ফাঁড়ির সহকারী উপ-পরিদর্শক সেলিম রেজা তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। আমরা তার বিচার দাবি করছি।

jagonews24

তবে বাঁশতৈল পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সখিনার সাবেক স্বামী মফিজ ও লেবু মিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছিল। রাতে তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হলে পৃথক হাজতখানায় রাখা হয়েছিল। ভোরে লেবু মিয়া টয়লেটের ভেন্টিলেটরে থাকা রডের সঙ্গে প্লাস্টিকের রশি দিয়ে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। সকালে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আমিনুল ইসলাম বুলবুল লেবুর সুরতহাল করেন। পরে মরদেহ মর্গে পাঠানো হয়।

মির্জাপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আমিনুল ইসলাম বুলবুল বলেন, লেবু মিয়াকে টয়লেটের ভেন্টিলেটরে থাকা রডের সঙ্গে সাদা প্লাস্টিকের রশি দিয়ে ফাঁস লাগানো অবস্থায় পেয়েছি। রশি আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে। তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ আবু সালেহ মাসুদ করিম বলেন, সখিনা বেগমের সঙ্গে লেবু মিয়ার পরকীয়া ছিল। লোকলজ্জার ভয়ে লেবু মিয়া গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তদন্ত শেষে ও ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়সার বলেন, এ ঘটনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মীর মনির হোসেনকে প্রধান করে সখিপুর সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার এস এম রাকিবুর রাজা ও পরিদর্শক (ক্রাইম) সুব্রত কুমার সাহাকে সদস্য করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া আসামির পাহাদার কনস্টেবল সুব্রত সরকারকে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে।

এস এম এরশাদ/এমআরআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।