ভাতশাইল প্রগতি সংঘ লাইব্রেরি

সংস্কারের অভাবে ভেঙে পড়ছে ভবন, নষ্ট হচ্ছে শত বছরের সংগ্রহ

আব্বাস আলী
আব্বাস আলী আব্বাস আলী , জেলা প্রতিনিধি নওগাঁ
প্রকাশিত: ০৪:২১ পিএম, ১৫ ডিসেম্বর ২০২২

নওগাঁয় সত্তর বছরেরও অধিক সময় ধরে জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে ‘ভাতশাইল প্রগতি সংঘ লাইব্রেরি’। জ্ঞানের ক্ষুধা নিবারণে দূর দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে ছুটে আসেন। এখানে হাতের লেখা কুরআন, তালপাতা ও কলাপাতায় লেখা পুঁথিসহ রয়েছে শিল্প-সাহিত্যের বিশাল সম্ভার। তবে ঐতিহ্যের আঁতুড়ঘরটি ধ্বংসের পথে। সংস্কারের অভাবে নষ্ট হয়ে পড়ছে পুরো সংরক্ষণগুলো।

১৯৫০ সালে জেলার বদলগাছী উপজেলার ভাতশাইল গ্রামে লাইব্রেরিটি গড়ে ওঠে। এলাকায় জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে ওই গ্রামের মরহুম মোশাররফ হোসেন চৌধুরী লাইব্রেরিটি প্রতিষ্ঠা করেন।

jagonews24

সবুজে ঘেরা টিন শেডের ঘরের চারটি কক্ষে ৪৩টি আলমারিতে অন্তত ২২ হাজার বই থরে থারে সাজানো রয়েছে। জীবদ্দশায় নিজ হাতে গড়া লাইব্রেরিটি নিজেই দেখভাল করতেন। প্রায় ৭০ বছর ধরে দুর্লভ কোনো বই, তালপাতা বা কলাগাছের বাকল ও পাতায় লেখা পাণ্ডুলিপির সন্ধানে মাইলের পর মাইল ছুটে বেড়াতেন তিনি। ২০১৪ সালে ৩১ জানুয়ারি ৮৩ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান মোশাররফ হোসেন চৌধুরী। এরপর থেকে এক সময়ের জনপ্রিয় লাইব্রেরিটি খুঁড়িয়ে চলছে। দিনে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা খোলা হয় লাইব্রেরিটি।

১৯৪৭ সালে নিজের কাছে থাকা ঠাকুমার ঝুলি, আলীবাবা, আনোয়ারা, সালেহা আর মুসলিম পঞ্চসতী এ পাঁচটি দিয়ে লাইব্রেরির যাত্রা শুরু। তখন মোশাররফ হোসেন চৌধুরী সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। এরপর আর থেমে থাকেননি তিনি। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়েন বন্ধু-আত্মীয় ও পরিচিতদের কাছে।

jagonews24

তিন বছর পর তার চাচা আব্দুল মতিন চৌধুরী লাইব্রেরি তৈরির জন্য ১৫ শতাংশ জমি দান করেন। সেখানে ৫০ হাত দৈর্ঘ্য ও ১৫ হাত প্রস্থের একটি মাটির ঘর তৈরি করে দিলেন চাচা শফিউদ্দীন চৌধুরী। নতুন ঠিকানা পেলো ‘ভাতশাইল প্রগতি সংঘ লাইব্রেরি’। মোশাররফ হোসেন চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক করে লাইব্রেরি পরিচালনা কমিটি গঠন করা হলো।

লাইব্রেরি নিয়ে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করেন মোশাররফ হোসেন চৌধুরী। লাইব্রেরিতে খবরের কাগজ ও ম্যাগাজিন রাখা শুরু করেন তিনি। উপজেলা সদর এখান থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় খবরের কাগজও ঠিকমতো আসতো না। গ্রামে পোস্ট অফিস ছিলো না। শেষ পর্যন্ত তার একক প্রচেষ্টায় পোস্ট অফিস হলো। যুবকদের নিয়ে একটি ক্লাব গঠন করেন তিনি।

১৯৯১ সালে বন্যায় মাটির ঘরটি ভেঙে যায়। এতে বেশকিছু বই ও পত্রিকা নষ্ট হয়ে যায়। পরে জেলা পরিষদ থেকে চার কক্ষের একটি ইটের ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়। চারটি কক্ষের ৪৩টি আলমারিতে সাজানো হাজার হাজার বই।

jagonews24

এ লাইব্রেরিতে গল্প, উপন্যাস, জীবনীগ্রন্থ, প্রবন্ধ, ইতিহাস, কবিতা, দর্শন, বিজ্ঞান ও রাষ্ট্রচিন্তা শত শত বই রয়েছে। গবেষণা বিভাগে তালপাতা, কলাগাছের বাকল ও পাতা এবং কাগজে লেখা ৭৭টি প্রাচীন পাণ্ডুলিপি রয়েছে। কোনো কোনোটি ২০০ বছরের অধিক বলে ধারণা করা হয়। লোক কবিদের কাহিনীমূলক বই আছে ২৫০টি। এখানে ৩০০ বছর আগের হাতে লেখা কুরআন শরিফ সংরক্ষিত রয়েছে।

১৯৫৬ সালে এক বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারেন নাটোরে এক জমিদার বাড়িতে বেশকিছু পুরনো পুঁথি রয়েছে। মোশাররফ হোসেন জমিদার বাড়িতে কয়েকবার যোগাযোগ করে পুঁথি সংগ্রহে ব্যর্থ হন। পরে খবর পেলেন জমিদার ভারত চলে যাবেন। সুযোগ বুঝে তিনি আবারও জমিদার বাড়িতে গিয়ে সে পুঁথি সংগ্রহ করে ফিরলেন। একই কৌশলে নওগাঁর মান্দা উপজেলার ফেট গ্রাম থেকে রামচন্দ্র নামে এক বন্ধুর কাছ থেকেও বেশকিছু পুঁথি সংগ্রহ করেন মোশাররফ হোসেন। মহাদেবপুর উপজেলার সহযোগী অধ্যাপক হাবিবুর রহমানের কাছে বেশকিছু পুঁথি সংগ্রহ ছিল। তার আবেদনের প্রেক্ষিতে হাবিবুর রহমান পুঁথিগুলো ভাতশাইল লাইব্রেরিতে দান করেন।

১৯৭৯ সালে সরকারের ক্রীড়া ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে আসা ব্রিটিশ লাইব্রেরি বিশেষজ্ঞ জে. স্টিফেন পার্কার লাইব্রেরিটি পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন বইয়ে তিনি লিখেছিলেন- ‘পৃথিবীর বহু দেশে অনেক লাইব্রেরি দেখেছি। কিন্তু বাংলাদেশের সুদূর পল্লিতে এমন বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত লাইব্রেরি খুবই কম দেখেছি।’

লাইব্রেরিতে আসা দশম শ্রেণির ছাত্র সাব্বির হোসেন জানায়, স্কুল ছুটির পর মাঝেমধ্যে লাইব্রেরিতে গিয়ে গল্পের বই পড়ি। কখনো কখনো পছন্দের বই বাড়ি নিয়ে পড়া হয়। পড়া শেষে বই জমা দেওয়া হয়।

jagonews24

ভাতশাইল প্রগতি সংঘ লাইব্রেরির কোষাধ্যক্ষ শফিকুল ইসলাম বলেন, লাইব্রেরিটি প্রতিদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খোলা রাখা হয়। স্কুল ছুটির পর কিছু শিক্ষার্থী ও আশপাশের কিছু ছাত্র লাইব্রেরিতে আসে।

ভাতশাইল দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় সহকারী প্রধান শিক্ষক বিভূতি চন্দ্র বলেন, এতো বড় লাইব্রেরি অন্যকোনো গ্রামে আছে কিনা আমার জানা নেই। মোশাররফ হোসেন চৌধুরী কর্মজীবনে কোনো পেশার সঙ্গে না জড়িয়ে পুরো সময়টা লাইব্রেরির পেছনে ব্যয় করেছেন।

বদলগাছী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আলপনা ইয়াসমিন বলেন, লাইব্রেরিটি অনেক পুরনো। এখানে অনেক মূল্যবান বই সংরক্ষিত রয়েছে। লাইব্রেরির পাশে দুটি বিদ্যালয়ে রয়েছে। স্কুল চলাকালীন সময়ে খোলা রাখলে শিক্ষার্থীরাও পড়াশুনার সুযোগ পাবে। উপজেলায় যেসব বরাদ্দ আসে আগামীতে সেখান থেকে লাইব্রেরি উন্নয়নে সহযোগিতা করা হবে।

আব্বাস আলী/আরএইচ/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।