সৌদির সড়কে নিহত নাজমুলের বাড়িতে শোকের মাতম

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি যশোর
প্রকাশিত: ০৯:৪৬ পিএম, ২৯ মার্চ ২০২৩

‘আমার সোনার ময়না, আমার সোনার পাখিরে, কই চইলে গ্যালো রে...!’ এই আহাজারি করতে করতে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত নাজমুল হোসেনের মা খাদিজা বেগম।

গত সোমবার (২৭ মার্চ) সৌদি আরবে ওমরাহ করতে যাওয়ার সময় সড়ক দুর্ঘটনায় যে ১৩ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন; তাদেরই একজন নাজমুল।

যশোর সদর উপজেলার বসুন্দিয়া ইউনিয়নের ঘুনি মাঠপাড়া এলাকার কাওসার মোল্লার সাত সন্তানের মধ্যে নজরুল ইসলাম ওরফে নাজমুল হোসেন (২৮) পঞ্চম। একবছর আগে সৌদি আরবে চাকরি করতে যান তিনি। রমজান মাসে ১০ দিনের ছুটি পাওয়ায় ওমরাহ করতে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।

বুধবার (২৯ মার্চ) দুপুরে ঘুনি মাঠপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নাজমুলের বাড়িতে প্রতিবেশী ও স্বজনদের ভিড়। নাজমুলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিবেশীরা ছুটে এসেছেন স্বজনদের সান্ত্বনা দিতে। কিন্তু নাজমুলের মা, ভাইদের আহাজারিতে তারাও শোকার্ত হয়ে পড়ছেন। কান্না থামছে না স্বজনদের।

নাজমুলের বড় ভাই কামরুল হোসেন বলেন, চাকরি নিয়ে একবছর আগে নাজমুল সৌদি আরব যায়। সেখানে আভা খামিজ এলাকায় রেস্টুরেন্টে চাকরি করতা। রমজান মাসের শুরুতে সে ১০ দিনের ছুটি পায়। ছুটির মধ্যে ওমরাহ করার নিয়ত করে। সৌদি আরবের তিন রোজার দিন বাড়িতে ফোন দেয়। সবার সঙ্গে কথা বলে; দোয়া চায়। আমরা তার জন্য দোয়া করি। এরপর সে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।

কামরুল আরও বলেন, সৌদি আরবে আমার ছোটভাই রায়হানসহ আরও আত্মীয়-স্বজন আছে। ২৭ মার্চ দুর্ঘটনার পরপরই আমরা খবর পেয়ে যাই। রায়হানসহ আমাদের লোকজন ওই এলাকার হাসপাতালে হাসপাতালে খুঁজেছে। পরে স্থানীয় একটি হাসপাতাল থেকে জানানো হয়েছে নাজমুল মারা গেছে। মরদেহ হাসপাতালে আছে। তবে আমাদের স্বজনরা এখনো মরদেহ দেখতে পায়নি।

নাজমুলের মেজো ভাই হাদিউজ্জামান বলেন, নাজমুল আমাদের অনেক আদরের ছিল। এর আগে সে দুবাইয়ে চাকরি করেছে। দুবাই থেকে ফিরে চার বছর দেশে ছিল। দুই বছর আগে বিয়ে করেছে। বৌ রেখে একবছর আগে সৌদি যায়। কিন্তু সৌদিতে এভাবে তার প্রাণ যাবে তা কোনোদিনও ভাবিনি।

নাজমুলের মা খাদিজা বেগম আহাজারি করতে করতে বলেন, ‘আমার সোনা বাবাটা কত ভালো ছিল। কাজকর্মের মধ্যি নামাজ পড়তো। ওমরায় যাওয়ার আগে নাজমুল ফোন করিলো। কইলো, মা আমার জন্যি দোয়া কইরো। তুমি মা; তুমার দোয়া আল্লাহ কবুল করবে। আমি তো দোয়া করিলাম; বাড়ির সবাই দোয়া কইরলো। কিন্তু এ কী হয়ে গেলো। ও আল্লা এ তুমি কী করইলে! আমার সোনার ময়না, আমার সোনার পাখিরে, কই চইলে গ্যালো রে...!’

নাজমুলের মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে গ্রামের পরিবেশ। অশ্রু মুছছেন স্বজন-প্রতিবেশীরাও। প্রতিবেশী দুঃসম্পর্কের আত্মীয় নাজমুল হোসেন বলেন, ‘নাজমুল আর আমার একই নাম। আমরা বন্ধু ছিলাম। ওমরায় যাওয়ার আগে আমারেও ফোন করিলো। দোয়া চাইলো। ওই কথা মনে পড়লি বুকটা ফাইটে যাচ্চে।’

নাজমুলের বাবা কাওসার মোল্লা বলেন, আমার অন্য সন্তানদের চেয়ে নাজমুল শান্ত প্রকৃতির। সৌদি যাওয়ার আগে বিয়ে করেছিল। বউ রেখে সংসারের হাল ধরবে, নিজে প্রতিষ্ঠিত হবে বলেই বিদেশ গেছে। আমার সেই ছেলেটা এভাবে চলে যাবে কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি।

নাজমুলের চাচা আবুল কালাম বলেন, নাজমুলের শরীরের অধিকাংশই পুড়ে গেছে। তার মরদেহ স্থানীয় একটি হাসপাতালে আছে। পরিচয় নিশ্চিতের জন্য ডিএনএ টেস্ট হয়েছে। আমরাও সরকারিভাবে যোগাযোগ করছি দ্রুত নাজমুলের মরদেহ দেশে আনতে।

ওই দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যেও ঘুনি গ্রামের দুইজন আছেন। তারা হলেন ঘুনি শাখারিপাড়া এলাকার কাজী আনোয়ার হোসেনের ছেলে মোশাররফ হোসেন (৩০) ও ঘুনি মাঠপাড়ার গফফার মোল্লার ছেলে সুমন হোসেন (২৬)। তারা দুজনেই কাজের উদ্দেশ্যে পাঁচ বছর আগে সৌদি আরব যান। মাঝে ছুটিতে এসে দেশে কিছুদিন থেকে ফের কর্মস্থলে চলে যান। তারাও একই বাসে চড়ে ওমরাহর করতে যাচ্ছিলেন।

গত সোমবার (২৭ মার্চ) সৌদি আরবের আকাবা শারে ওমরাহযাত্রী বহন করা বাস দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত হন। এর মধ্যে ১৩ জনই বাংলাদেশি নাগরিক।

সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন আল আখবারিয়া জানিয়েছে, ওমরাহযাত্রীদের বাসটি খামিস মুশাইত শহর থেকে রওয়ানা হয়ে মক্কায় যাচ্ছিল। স্থানীয় সময় সোমবার বিকেল ৪টার দিকে আসির প্রদেশের আকাবা শার সড়কে সেটি দুর্ঘটনায় পড়ে।

একটি সেতুর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি পাহাড়ি দেওয়ালে ধাক্কা খায় এবং আগুন ধরে যায়। বাসটির ব্রেকে সমস্যা হয়েছিল বলে জানানো হয়েছে সৌদি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে।

মিলন রহমান/এমআরআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।