প্রতিশ্রুতি অনেক, অপেক্ষা বাস্তবায়ন দেখার

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:৫১ পিএম, ১৭ এপ্রিল ২০১৯

নতুন মন্ত্রিসভার ১০০ দিন পূর্ণ হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার (১৬ এপ্রিল)। নতুন নতুন প্রত্যয়ে পথচলা শুরু অনেক মন্ত্রীর। দীর্ঘ এ যাত্রাপথের মাত্র কয়েকটা দিন পার হয়েছে। এত অল্প সময়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য তেমন কিছু দেখানো সম্ভব নয়। এরপরও কোন কোন মন্ত্রণালয় কাজের মাধ্যমে সাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। নতুন অর্থমন্ত্রী হিসেবে আ হ ম মুস্তফা কামালও শুরু থেকে বেশকিছু আশার বাণী শুনিয়ে আসছেন। বিশেষ করে ‘অস্থির’ ব্যাংক খাতসহ আগামী বাজেটকে সামনে রেখে নতুন নতুন পরিকল্পনা ও ফলপ্রসূ উদ্যোগ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অপেক্ষায় দেশের সাধারণ মানুষ।

গত ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এরপর ৭ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী করে নতুন সরকার গঠন করা হয়। এ সরকারে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া ২৪ জন মন্ত্রী, ১৯ প্রতিমন্ত্রী এবং তিনজন উপমন্ত্রী রয়েছেন। নতুন মন্ত্রিসভায় আগের বেশির ভাগ মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর ঠাঁই হয়নি।

নতুন মন্ত্রিসভায় ঠাঁই না হওয়াদের একজন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তার জায়গায় নতুন অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান আ হ ম মুস্তফা কামাল। বর্তমান সরকারের গত মেয়াদ থেকেই ব্যাংক খাতের অবস্থা ভালো নয়। তাই দায়িত্ব গ্রহণ করে ব্যাংক খাতকে অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বল খাত হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি এ খাতকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেন। বিশেষ করে শিল্পঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিট তথা ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা এবং ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার ওপর জোর দেন।

সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার জন্য নানা সুবিধা প্রদান করে সরকার। যেমন- ব্যাংক ব্যবসার করপোরেট কর কমানো হয় ২ দশমিক ৫ শতাংশ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর নগদ জমার হার (সিআরআর) কমানো হয় ১ শতাংশ, টানা নয় বছর ব্যাংকের পরিচালক থাকা এবং একই পরিবারের চারজনকে ব্যাংকের পর্ষদে থাকার সুযোগ দিয়ে সংশোধন করা হয় ব্যাংক কোম্পানি আইন। এছাড়া ৫০ ভাগ পর্যন্ত সরকারি আমানত গ্রহণের সুযোগও আদায় করে নেন বেসরকারি ব্যাংক মালিকরা।

বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী দুহাত ভরে দিয়েছেন ব্যাংক মালিকদের। এতে মালিকদের আয় বেড়েছে। কিন্তু যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসব সুবিধা তারা আদায় করে নেন, সেটি বেমালুম ভুলে যান। শুধু তা-ই নয়, বরং এ খাতের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ব্যাংকঋণের সুদহার যেখানে ১০ শতাংশের নিচে হওয়ার কথা, সেখানে অনেক ব্যাংক তারল্য সংকটে পড়ে আমানত নিচ্ছে ১০ শতাংশ পর্যন্ত সুদে। এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানতেও ১০ শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবে ঋণের সুদহার অনেক বেশি। কোনো কোনো ব্যাংকের ঋণের সুদহার ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত বলে জানা যাচ্ছে।

এরপরও হেরে যেতে চান না অর্থমন্ত্রী। তিনি বারবার ব্যাংক মালিকদের সঙ্গে বসছেন। একই সঙ্গে গ্রাহকদের আশ্বাস দিচ্ছেন, খুব শিগগিরই সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নেমে আসবে। মন্ত্রীর এ আশ্বাস কার্যকরের অপেক্ষায় রয়েছেন উদ্যোক্তারা।

এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে নয় লাখ ১১ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা, যা ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে ছিল ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা বা ৯ দশমিক ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ বছর ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৯ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা।

ক্রমান্বয়ে খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনতে পারছেন না- এমনটি মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমাতে উদ্যোগ নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

গত ২৫ মার্চ অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ৭ শতাংশ সুদে তাদের খেলাপি ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেয়া হবে। তবে এ সুবিধা নিতে মূল ঋণের ২ শতাংশ এককালীন পরিশোধ করতে হবে এবং সুদসহ বাকি অর্থ পরিশোধ করা যাবে সর্বোচ্চ ১২ বছরে। নতুন এ নিয়ম ১ মে থেকে কার্যকর হবে।

তবে এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় এখনও কোনো প্রজ্ঞাপন জারি করেনি। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ’র বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দেয়ার জন্য অর্থমন্ত্রী ওয়াশিংটনে অবস্থান করছেন। তিনি দেশে ফেরার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।

এদিকে অর্থমন্ত্রী হিসেবে জীবনের প্রথম ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট জাতীয় সংসদে আগামী ১৩ জুন (বৃহস্পতিবার) উপস্থাপন করবেন আ হ ম মুস্তফা কামাল। ওই বাজেটে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে বেশকিছু নতুন প্রকল্প হাতে নেবেন বলে বিভিন্ন সময় জানান নতুন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আগামী বাজেটে প্রতিটি পরিবারের অন্তত একজনকে চাকরি দেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

‘সরকার বিভিন্নভাবে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী নিয়ে কাজ করছে’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, পরিবারের একজনকে চাকরির ব্যবস্থা করতে পারলে নিরাপত্তা বেষ্টনীতে চাপ কমবে। এখন দেখার বিষয় আদৌ এ প্রতিশ্রুতি আগামী বাজেটে বাস্তবায়ন হয় কি-না?

আগামী বাজেটের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ভ্যাট আইন- ২০১২ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপাচাপিতে করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এবার তা বাস্তবায়ন হবে। কেননা রাজস্ব আদায় বাড়াতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই। যেকোনো দেশের ট্যাক্স জিডিপি রেশিও ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ। অথচ আমাদের মাত্র ১০ শতাংশ। এজন্য সবাইকে ভ্যাট দিতে হবে। তাহলে রাজস্ব আদায় বাড়বে।

তিনি বলেন, নতুন অর্থবছরের প্রথম দিন থেকে ভ্যাট আইন কার্যকর হবে। তবে ভ্যাটের হার আর বাড়বে না। নতুন আইনে ভ্যাটের স্তর হবে তিনটি। যাকে বহুস্তর ভ্যাট ব্যবস্থা বলা হয়। এতে ব্যবসায়ীরাও সম্মতি দিয়েছেন। আইনে ভ্যাটের স্তরগুলো হবে ৫, সাড়ে ৭ এবং ১০ শতাংশ। এছাড়া নিত্যপণ্যে ভ্যাট ছাড় দেয়া হবে।

ভ্যাট আদায়ের বিষয়ে মুস্তফা কামাল বলেন, কাউকে কষ্ট দিয়ে ভ্যাট কিংবা রাজস্ব আদায় করা হবে না। কোনো ব্যবসায়ীকে ভ্যাটের জন্য হয়রানি করা হবে না। কেননা বর্তমান সরকার ব্যবসাবান্ধব সরকার।

অনেকদিন ধরে নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বঞ্চিত হয়ে আসছে। তবে আগামী বাজেটে এমপিওভুক্তি কার্যক্রম হাতে নেয়া হবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তবে কত প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করা হবে সেটা উল্লেখ করেননি তিনি।

আগামী বাজেটের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে অগ্রাধিকার দেয়া হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রফতানি, শিল্প ও প্রবৃদ্ধির ওপর। এছাড়া গ্রামকে শহর বানানো এবং যুব সমাজকে প্রকৃত অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে জোর দেয়া হবে।

যেহেতু বাজেট সংসদে উপস্থাপন হবে আগমী ১৩ জুন। এটি সংসদে পাস হবে জুলাইতে। এ কারণে বাজেট নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অর্থমন্ত্রী যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সেগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না- তা দেখতে আরও কিছুদিন অপেক্ষায় থাকতে হবে।

এছাড়া সঞ্চয়পত্র, কালো টাকা এবং অতিরিক্ত বিনিয়োগ বন্ধ করতে চান অর্থমন্ত্রী। তাই সঞ্চয়পত্র বিক্রির কার্যক্রম পরীক্ষামূলকভাবে অটোমেশন (অনলাইন) পদ্ধতিতে শুরু করেছে জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদফতর। আগামী ৩০ জুনের মধ্যে দেশব্যাপী এটি শুরুর জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এর মাধ্যমে সঞ্চয় স্কিমের সুদ ও আসল সরাসরি গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে পাঠিয়ে দিতে চায় সরকার।

এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের উপ-সচিব মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত একটি সরকারি চিঠি (২৪ মার্চ) সঞ্চয়পত্র সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠানো হয়েছে। এতে বলা হয়, অর্থ বিভাগ কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ : অগ্রাধিকার কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষা (পিইএমএস)’ শীর্ষক কর্মসূচির আওতায় প্রণীত জাতীয় সঞ্চয় স্কিম অনলাইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালুসহ সঞ্চয় স্কিমের সুদ ও আসলের (বিইএফটিএন) মাধ্যমে সরাসরি গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে প্রেরণের বিষয়ে নিম্নবর্ণিত নির্দেশনা অনুসরণের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে অনুরোধ করা হলো।

এদিকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় ভাতাপ্রাপ্তদের হতে সঠিকভাবে ও সহজে ভাতার অর্থ পৌঁছে দেয়ার জন্য মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আরও ছয় ধরনের ভাতা দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে সুবিধাভোগীরা এসএমএসের মাধ্যমে টাকা পেয়ে যাবেন। বর্তমান নিয়মে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে টাকা পান সুবিধাভোগীরা। তারা যাতে দ্রুত এবং আরও সহজে মাসিক ভাতা পান, সেজন্য এ সেবা চালু করা হচ্ছে। ভাতাগুলো হচ্ছে- মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা, বিধবা, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভাতা, অতিদরিদ্রের জন্য দুস্থ ভাতা ও মাতৃত্বকালীন ভাতা।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের আওতায় ভাতাগুলো দেয়ার পদ্ধতি ডিজিটালাইজড করার পরিকল্পনা নেয়া হয়। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সুবিধাভোগীদের এর আওতায় নিয়ে আসা হবে।

বর্তমানে শুধু মাতৃত্বকালীন ভাতা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেয়া হয়। গত বছরের মে মাসে এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। তখন আট উপজেলার ১০ হাজার সুবিধাভোগীকে তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ পাঠানো হয়। গত এক বছর ধরে তিন লাখ উপকারভোগী মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মাতৃত্বকালীন ভাতা পাচ্ছেন।

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ’র বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দেয়ার জন্য ওয়াশিংটনে অবস্থান করায় বিভিন্ন সময় অর্থমন্ত্রীর দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের বিষয়ে তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

এমইউএইচ/এমএআর/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :


আরও পড়ুন