সংঘাত চান না ব্যবসায়ীরা


প্রকাশিত: ১২:০৫ পিএম, ২৪ ডিসেম্বর ২০১৪

চলমান রাজনৈতিক কালো মেঘে উদ্বেগ প্রকাশ করে সংলাপ ও আলোচনার আহ্বান জানিয়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে ও ব্যবসা বাণিজ্যের স্বার্থে সরকারের কাছে ২৩ দফা দাবি জানিয়েছে ব্যবসায়ীদের সংগঠন ঢাকা শিল্প ও বণিক সমিতি (ডিসিসিআই)।

সংগঠনটি বলছে, আমরা রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে রেহাই চাই। সব সময় রেহাই চেয়েছি। রাজনৈতিক সংকটে জিডিপির ২ শতাংশ ক্ষতি হয়। আমরা যে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি করছি, সেটি যথেষ্ট নয়। ব্যবসা ও বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ থাকলে প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশ অর্জন করা সম্ভব।

তাই ব্যবসায়ীরা হরতাল অবরোধের মতো নেতিবাচক কোন কর্মসূচি চায়না। বুধবার ডিসিসিআই আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের নব নির্বাচিত সভাপতি হোসেন খালেদ লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন।

তিনি বলেন, আমরা ব্যবসায়ীদের চাহিদা হলো দেশে একটি ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ বজায় রাখা, আর এজন্য আমরা আসন্ন দিনগুলোতে নতুন কোন রাজনৈতিক সংঘাত, হরতাল, অবরোধের মতো ব্যবসা-বাণিজ্যকে ক্ষতি করে এমন কোন কর্মসূচি দেখতে চাই না। আমরা আশা করি, দেশের জিডিপি উন্নয়ন, স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্টকরণে সকলে একযোগে কাজ করবে।

বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি
সংবাদ সম্মেলনে হোসেন খালেদ বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে। তবে আমাদের দেওয়া হচ্ছে না। অতিশিগগিরই পুরানো এবং বিশেষ করে নতুন শিল্প-কারখানায় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাবে দেশের বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন হুমকির মুখে পড়েছে, শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, খরচ বাড়ছে, প্রচুর শ্রম ঘণ্টা অপচয় এবং শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে তা সামগ্রিক অর্থনীতিকে হুমকির সম্মুখীন করবে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে আঞ্চলিক ও স্থানীয় জ্বালানি নীতিমালা থাকা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। তাছাড়া জ্বালানি উৎপাদনে সনাতন পদ্ধতি হিসেবে হাইড্রোইলেকট্রিসিটিকে আরো গুরুত্ব দিতে হবে। সেই সাথে খসড়া কয়লা নীতির দ্রুত বাস্তাবায়ন করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, সেবা নেয়ার ক্ষেত্রে সেবাদানকারী সরকারি অফিসগুলোতে শক্ত হাতে ঘুষ, দুর্নীতি ও হয়রানি বন্ধ করার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে ব্যবসায়িরা ঋণ খেলাপি হচ্ছে বলেও সংগঠনটি মনে করে।  

সুদ হার
শিল্প ও ব্যবসা খাতে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো মাত্রাতিরিক্ত সুদ আদায় করছে বলেও জানান তিনি।

তার মতে, প্রকৃত সুদের হার কর্পোরেটের ক্ষেত্রে ১৭ থেকে ১৮ শতাংশে এবং এসএমই-এর ক্ষেত্রে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে দাঁড়াচ্ছে। ব্যাংকগুলো বর্তমানে ঋণের বিপরীতে প্রতি তিন মাস অন্তর চার দফায় ঋণ ও সুদের উপর সুদ আরোপ করছে। এতে করে মূল ঋণের পরিমাণ ও কিস্তির সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে, যার ফলে বিনিয়োগকারী শিল্পোদ্যোক্তারা ঋণ গ্রহণে পিছু হটছেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদ হার কমালেও শিল্প খাতে তা কমানো হচ্ছে না, ফলে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে।

সুদহার কমিয়ে যুক্তিসঙ্গত পর্যায়ে নির্ধারণ করতে হবে। ঋণ প্রদানের প্রক্রিয়া-পদ্ধতি সহজ করে সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে সুনির্দিষ্ট করতে হবে।

করদাতার আওতা বৃদ্ধি
করের হার বৃদ্ধির মাধ্যমে বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করলে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারিত হতে পারবে না এবং রাজস্ব আয়ও বাড়বে না। বরং তা ব্যবসায়ীদের কর প্রদানে নিরুৎসাহিত করবে। তাই করের আওতা বাড়াতে হবে।

হোসেন খালেদ বলেন, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে মূল্যস্ফীতির বিষয়টা একেবারে অবহেলা না করে সরকার যেন বিষয়টি আলাদাভাবে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে। যেখানে সরকারের রাজস্ব আয়ের গতি ধীর, সেখানে অতিরিক্ত এ টাকা আহরণে যেন ব্যবসায়ীদের উপর নতুন করে কোনো করারোপ করা না হয় সে আহ্বান জানাচ্ছি।

তবে বেসরকারি খাত বিষয়টি কিভাবে সামাল দিবে জানতে চাইলে ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, আমরা সামাল দিতে পারব।

নতুন ভ্যাট আইন
নতুন ভ্যাট আইনসহ সকল আইন ব্যবসাবান্ধব, অসঙ্গতি ও জটিলতা কাটিয়ে সহজিকরণ করতে হবে। এছাড়া নতুন ভ্যাট আইনে সরকার খুচরা পর্যায়ে ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা মারাত্মকভাবে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। যে আইন ব্যবসার ক্ষতি করে সেটা সংশোধন করা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।

বিদেশি বিনিয়োগ
বিদেশি বিনিয়োগ আরো বাড়ানো দরকার। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে হচ্ছে না। নীতি সহায়ক নয় বলে বিদেশি বিনিয়োগ আসছে না। কিন্তু শিগগিরই দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগের সার্বিক অবস্থার পরিবর্তন না ঘটলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের ধীর গতি, অস্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থা, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অবকাঠামোগত সমস্যা ইত্যাদি অনেক কারণে গত কয়েক বছরে বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করা থেকে দূরে সরে গিয়েছে। তাই আগামী ২০১৫ সালে মোট জিডিপির ৩২ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগ উন্নয়নের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তা বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে দেশের অর্থনৈতিক পরিবেশকে বিনিয়োগ বান্ধব করে তোলার পাশাপাশি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য উৎসাহিত করতে হবে। এর পাশাপাশি দেশে অবাধে ব্যবসা-বাণিজ্য করার নিশ্চয়তা প্রদান এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধন করার জন্য জোরদার পদক্ষেপ নিতে হবে।

অযৌক্তিক কর ও শুল্ক প্রত্যাহার
স্থানীয় ঋণপত্র এর উপর পণ্য সরবরাহ বা চুক্তি সম্পাদনের জন্য ঠিকাদার ও সরবরাহকারীর ন্যায় করারোপ করা হয়েছে। স্থানীয় ঋণপত্র খোলার উপর এ ধরনের করারোপ করার ফলে ব্যবসায়ীক ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব প্রত্যাহার করতে হবে।

জবাবদীহিতা ও স্বচ্ছতা
জবাবদীহিতা নিশ্চিত করার স্বার্থে সরকারসহ সকল পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাস্তবায়ন এবং সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব জাতির কাছে স্বচ্ছভাবে উপস্থাপনের বিধান বাস্তবায়ন করতে হবে।

বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোর কার্যকর ভূমিকা
রপ্তানি বাড়াতে বাজার সম্প্রসারণ ও পণ্য বহুমূখীকরণের উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোকে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

সকল ক্ষেত্রে সমতা রক্ষা করে ‘মান’ এর ব্যবহার নিশ্চিত
রপ্তানির পরিমাণ বাড়াতে হলে উৎপাদিত পণ্যের মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে। জাতীয় মান নির্ধারণী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পণ্যের মান নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। এতে দেশে গুণগত মানের শিল্পায়নের ধারা বেগবান হবে। তবে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে প্রতিষ্ঠানটি এখনো বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারছে না। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সকল ক্ষেত্রে সমতা রক্ষা করে মান এর ব্যবহার নিশ্চত হবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

যোগাযোগ ব্যবস্থা
বহুল আলোচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম ও জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ অনেক আগেই শেষ করার কথা থাকলেও তা এখনও সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। ফলে এই মহাসড়কে রাস্তার উভয়দিকে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজে বিলম্ব ঘটায় বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।

বাংলাদেশের বর্তমান আইনশৃংখলা পরিস্থিতি কিছুটা আশাব্যাঞ্জক হলেও সরকারকে মাদক, অবৈধ অস্ত্র, পণ্য চোরাচালান, চাঁদাবাজি-ছিনতাই  ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণে আরও কাঠোর ভূমিকা নিতে হবে।  

বীমা
বীমা কোম্পানির মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ ও অপসারণ প্রবিধানমালা ২০১২ ও বীমা আইন ২০১০ পরিপালন করে বীমা কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ সহজতর নয়। তাই এটি সংশোধন করতে হবে।

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।