দু’টি উপন্যাসই সংকটাপন্ন জীবনের : হারুন পাশা

জাগো নিউজ ডেস্ক
জাগো নিউজ ডেস্ক জাগো নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪:১৫ পিএম, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

হারুন পাশা গল্পকার ও ঔপন্যাসিক। তার সাহিত্যে গুরুত্ব পায় দেশ, সমাজ, মানুষের সংকটাপন্ন জীবন। এ বছর তিনি পেয়েছেন সাহিত্যকর্মের মূল্যায়ন স্বরূপ দুটি পুরস্কার। ‘শওকত ওসমান সাহিত্য পুরস্কার ২০১৯’ এবং ‘কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার ২০১৮’। লেখক হিসেবে তিনি বাস্তববাদী। তরুণ এই লেখকের কাছে লেখা শখ নয়, সামাজিক দায়। মানুষ ও সমাজের প্রতি নিজের দায়িত্ব পালনের একটা মাধ্যম।

এ বছর প্রকাশিত হয়েছে তার দ্বিতীয় উপন্যাস ‘চাকরিনামা’। এ উপন্যাসে লেখক যাপিত জীবন, জীবন সেঁচে নেওয়া অভিজ্ঞতাকে সম্বল করেছেন। বেকার জীবনের বিচ্ছিন্নতাবোধ, সংকট, স্বপ্ন, সম্ভাবনা নিয়ে রচনা করেছেন তার আখ্যান। উপন্যাসটি নিয়েই তার সাথে কথা বলেছেন অনুবাদক শামিম মণ্ডল—

জাগো নিউজ: আপনার দ্বিতীয় উপন্যাসের নাম চাকরিনামা, এ নামকরণ কেন?
হারুন পাশা: উপন্যাসটিতে চাকরিপ্রত্যাশীদের জীবনকথা গুরুত্ব পেয়েছে বলেই এমন নামকরণ। বাংলাদেশে মোটাদাগে যে চাকরিগুলো রয়েছে, সেগুলোর মধ্য থেকে বাস্তবতা উঠে এসেছে এ শিরোনামের ভেতর।

জাগো নিউজ: প্রথম উপন্যাস তিস্তা, একেবারেই গ্রামীণ পটভূমিতে লেখা, এবার মূলত ঢাকা শহর। কেন এই শিফট?
হারুন পাশা: আমি নিরীক্ষা পছন্দ করি। বিষয়গত নিরীক্ষা কিংবা বৈষয়িক বিচিত্রতাও রাখতে চাই। আলাদা আলাদা বিষয়ে কাজ করতে ভালো লাগে। যে জীবনগুলো আমার কাছ থেকে দেখা কিংবা ওই জীবন যাপন করেছি, সেই বিষয়গুলো নিয়ে লিখতে পছন্দ করি। শহর ও গ্রাম দুই জীবনের সাথেই আমার পরিচয় বেশ ভালো। আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা গ্রামে। তিস্তার কোলে। আবার ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় শহরে থাকতে হয়েছে এবং এখনো থাকছি। ফলে দু’টি জীবনই আমাকে শিখিয়েছে অনেক। দিয়েছে বিচিত্র অভিজ্ঞতা। অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই লিখেছি দু’টি উপন্যাস। যেখানে গুরুত্ব পেয়েছে গ্রাম ও শহর। দু’টি উপন্যাসই সংকটাপন্ন জীবনের। তিস্তায় তিস্তাবাসীর সংকট। আর চাকরিনামায় বেকারদের সংকটময় জীবন। এ উপন্যাসে ঢাকা কেন্দ্রে থাকলেও গ্রাম ও শহরের সব চাকরিপ্রত্যাশীর জীবনকেই স্পর্শ করেছে।

জাগো নিউজ: আপনি তরুণ সমাজের মুখের ভাষাকে অবিকৃত রেখেই সংলাপ রচনা করেছেন? এটি কি উন্নত সাহিত্যকর্মের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ?
হারুন পাশা: আপনি হয়তো জানেন আমি উপন্যাসের বর্ণনারীতিতে চালু থাকা রীতি ব্যবহার করি না। প্রচলিত রীতি হলো উপন্যাসের কাহিনি লেখক বর্ণনা করেন। মাঝেমধ্যে থাকে চরিত্রের সংলাপ। এমনকি এক লাইনেই থাকে লেখকের বর্ণনা ও চরিত্রের সংলাপ। আমার গল্প-উপন্যাসে এ রীতি নেই। লেখক নয়, চরিত্ররাই কথক। তারাই যাপিত জীবনের ব্যাখ্যাকারক। চরিত্রের কথনেই উপন্যাস এগিয়ে যায় শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত। এক্ষেত্রে তারা যে ভাষায় কথা বলে আমি ওই ভাষাই ব্যবহার করেছি। ভাষাকে মেকি করতে চাইনি। কৃত্রিমতা কিংবা রাখঢাক ছেড়ে চরিত্ররা যাপিত জীবনের ভাষাকে অবলম্বন করে এগিয়েছে। মৌলিকত্বকে ধারণ করে থাকা চরিত্ররাই নিজেদের ব্যবহৃত ভাষায় কথা বলেছে। এতে বিষয় ও বক্তব্য আকর্ষণীয়, পাঠঘন, রসঘন এবং মৌলিক বা সজীবতার স্বাদ পেয়েছে। আমার মনে হয়, সব মিলিয়ে একটা স্ট্যান্ডার্ড ব্যাপারই গুরুত্ব পেয়েছে।

জাগো নিউজ: এ উপন্যাসে আপনি চাকরিসংক্রান্ত বেশকিছু তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করেছেন সচেতনভাবেই। কেন?
হারুন পাশা: আমি চাই গল্পের ছলে পাঠক ঠিকঠাক কিছু তথ্য জানুক। তারা তো কেবল কাহিনি নয়, এর সাথে জানুক, পড়ুক নিজের দেশ, সমাজ, ইতিহাস, রাজনীতিসহ নানাবিধ বিষয়। আমি যেহেতু লিখতে গিয়ে সামাজিক দায়কে স্বীকার করি সেহেতু এই দিকটাও গুরুত্ব থাকে।

জাগো নিউজ: উপন্যাসের নাম চাকরিনামা কিন্তু মাঝে আবার প্রেম বেশ জমিয়ে তুলেছেন। এটা কি শুধুই বিনোদনের খাতিরে নাকি আবশ্যকতাও আছে?
হারুন পাশা: আবশ্যকতার জায়গা থেকেই এসেছে এই প্রেম। সবুজপরী নামের যে চরিত্রটি আছে, সে-ও কিন্তু বেকার। তার বেকারের ধাঁচটা আলাদা। সে পরিশ্রম করে কিন্তু পারিশ্রমিক পায় না। ঘর সামলায়, বাহিরও সামলায়। বাচ্চাকে স্কুলে নিয়ে যায়, বাজার করে, রান্না করে, ঘর-বাড়ি পরিষ্কার করে। এত কাজ করার পরেও সে পারিশ্রমিক পায় না। এক্ষেত্রেও সে প্রাসঙ্গিক। দ্বিতীয়ত, অন্য চরিত্ররা সমাজ, পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, প্রেমিকার কাছ থেকে বঞ্চিত হয়ে হাহাকারময় জীবন যাপন করছে, তাদের একটু সুখের স্পর্শ দিতে সবুজপরীকে আনা হয়েছে। সবুজপরীর সাথে আয়ানের যে প্রেম প্রেম সম্পর্ক তা শুনবেন আয়ানের মুখ থেকে। রোমাঞ্চকর গল্প শুনে আয়ানের বন্ধুরা অল্প সময়ের জন্য হলেও ভালো থাকতে পারে। তৃতীয়ত, আয়ান চরিত্র বিকাশের জন্য সবুজপরীর প্রয়োজন ছিল। প্রয়োজন ছিল সবুজপরীর মধ্যদিয়ে সংসারে থাকা অন্য নারীর জীবনকে ফোকাসের জন্যও।

জাগো নিউজ: আপনি কি আশাবাদী মানুষ?
হারুন পাশা: হ্যাঁ, আমি আশাবাদী মানুষ। আমি কেন, প্রত্যেকটি মানুষই আশাবাদী। আশা আছেই বলে আমরা গতিশীল হই। এটা হয় নাই, আরেকটায় হবে, সাকসেস আসবে সামনে। এজন্য মানুষ পরের স্টেপে মনোযোগ দেয়। জীবন ও চিন্তা সক্রিয় হয়।

জাগো নিউজ: উপন্যাস শেষ করেছেন বেশ আশাবাদ দিয়ে। এটা কি বাস্তব জীবন না-কি লেখকের স্বপ্ন জীবন-বাস্তবতা?
হারুন পাশা: বাস্তবতায় কোনো কিছুর ঘ্রাণ পেলেই মানুষ স্বাপ্নিক হয়। স্বপ্ন দেখে। হতাশার পাশে আশাবাদের অবস্থান। চেষ্টা ও শ্রম বিনিয়োগ করলে সফলতা আসে। যে সফলতা পাওয়া যায় চরিত্রের মধ্যে।

জাগো নিউজ: এ উপন্যাস কি আপনার প্রথম উপন্যাসের মান ও খ্যাতিকে অক্ষুণ্ন রাখতে পারবে? আপনি কতটুকু আশাবাদী এবং কেন?
হারুন পাশা: মান অক্ষুণ্ন কিংবা নষ্ট হলো কি-না এটা বিচার করবে পাঠক কিংবা সমালোচক। আমি কেবল লেখার চেষ্টা করেছি বেকারদের সংকটাপন্ন জীবনকথা। যার কেন্দ্র চাকরি না থাকা। তিস্তায়ও আছে তিস্তাবাসীর সংকটাপন্ন জীনের আখ্যান। আমি কেবল চেষ্টা করেছি চমৎকার কিছু তৈরির।

এসইউ/এমকেএইচ