শুরু হলো অমর একুশে বইমেলা
শুরু হলো মাসব্যাপী অমর একুশে বইমেলা ও আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন-২০১৫। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিকেল ৪টায় বইমেলা ও সাহিত্য সম্মেলন উদ্বোধন করেন এবং উদ্বোধনী স্মারকে স্বাক্ষর করেন।
শিল্পী লিলি ইসলামের নেতৃত্বে সংগীত সংগঠন উত্তরায়ণ-এর শিল্পীদের সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনা এবং অমর একুশের ঐতিহাসিক সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহ থেকে পাঠ করা হয়। দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হয় ভাষা-আন্দোলনের অমর শহীদদের।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি। শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রণজিৎ কুমার বিশ্বাস এনডিসি। স্বাগত ভাষণ প্রদান করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান।
অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন জার্মানির সাহিত্যিক হান্স হার্ডার, ফরাসি লেখক ফ্রাঁস ভট্টাচার্য, বেলজিয়ামের সাহিত্যিক ফাদার দ্যতিয়েন এবং ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য, গবেষক ও ভাষাবিদ ড. পবিত্র সরকার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি প্রফেসর এমেরিটাস আনিসুজ্জামান। অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন শিশু শিল্পী সিদরাতুল মুনতাহা। বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধিদের সুবিধার্থে পুরো অনুষ্ঠানটি ইশারা ভাষায় উপস্থাপন করা হয়।
স্বাগত ভাষণে একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, অমর একুশে বইমেলায় এবার বিশেষ সংযোজন চার দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু বাংলা একাডেমিতে প্রথম আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন উদ্বোধনের চার দশক পর বাংলা একাডেমিতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাহিত্য সম্মেলন উদ্বোধন করে নতুন এক মাত্রিকতা যোগ করেছেন।
শুভেচ্ছা বক্তব্যে ড. রণজিৎ কুমার বিশ্বাস বলেন, বই ও জ্ঞানের বাহক বইমেলা। বইয়ের যেমন কোন বিলয় নেই, বইমেলারও কোন বিলয় নেই। জ্ঞানের অনন্ত অন্বেষায় বই হোক আমাদের নিত্যদিনের সাথী।
শুভেচ্ছা বক্তব্যে জার্মানির সাহিত্যিক হান্স হার্ডার, ফরাসি লেখক ফ্রাঁস ভট্টাচার্য, বেলজিয়ামের সাহিত্যিক ফাদার দ্যতিয়েন এবং ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ড. পবিত্র সরকার বলেন, সাহিত্য মানুষের মনের কথা বলে। বহুত্বের মধ্যে ঐক্যের বন্ধন তৈরি করে। এই প্রেক্ষিত থেকে বাংলা একাডেমি আয়োজিত আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন, ভাষা ও সংস্কৃতির দূরত্ব ঘুচিয়ে মানবিক বহুত্বের বার্তা আরো দৃঢ় করবে। তাঁরা বলেন, বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও বাঙালি সংস্কৃতি আজ তার দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী এক অনন্য সাংস্কৃতিক পরম্পরা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লেখক-পন্ডিত-গবেষকেরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে চর্চা করছেন। সারা বিশ্বেই বাংলা একাডেমির একুশে বইমেলা এক নজিরবিহীন জ্ঞানোৎসব হিসেবে পরিণত হচ্ছে। বাংলাকে ভিত্তি করে বিশ্ববোধের জাগরণই হবে আজকের বাঙালির শ্রেষ্ঠ সাধনা।
বিশেষ অতিথির ভাষণে আসাদুজ্জামান নূর বলেন, অমর একুশে বইমেলা বুদ্ধিবৃত্তিক ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মিলনমেলা। আমাদের জাতীয় সাংস্কৃতিক অগ্রগতির অনন্য স্মারক এই বইমেলা। বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতাতে আতঙ্কিত না হয়ে বইয়ের অনন্ত আলোয় আমাদের স্নাত হয়ে সকল অশুভের মোকাবিলা করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, প্রযুক্তির অসামান্য বিকাশের সঙ্গে মুদ্রিত বইয়ের ভবিষ্যত নিয়ে অনেকেই আতঙ্কিত কিন্তু আমরা মনে করি মানুষের কাছে গ্রন্থের আবেদন কখনই পূরণ হবার নয়। কারণ একুশে বইমেলার পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে বইয়ের বিক্রি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বইমেলার পরিসর বৃদ্ধির যে সঙ্গত দাবি ছিল তার বাস্তবায়ন হিসেবে আমরা গত বছর থেকে বাংলা একাডেমি সম্মুখস্থ ঐতিহাসিক সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত বিস্তৃত করেছি। ফলে অধিক সংখ্যক প্রকৃত প্রকশনা প্রতিষ্ঠান যেমন মেলায় যোগদানের সুযোগ পেয়েছে তেমনি পাঠকবৃন্দ তাদের প্রয়োজনীয় বই স্বচ্ছন্দে সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন। ১৯৭১-এর ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদানের স্থান, ৭১’র ১৬ই ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্থান, ১৯৭২-এর ১০ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের স্থান এবং শিখা চিরন্তন ও স্বাধীনতা স্তম্ভসংবলিত পবিত্র এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স¤প্রসারিত হয়ে অমর একুশে বইমেলা যুক্ত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার অাহ্বান চেতনায়। তিনি বলেন, আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে বাংলা একাডেমি এবার অমর একুশে বইমেলার শুরুতে আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে প্রথমবারের মতো এই বাংলা একাডেমিতেই আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করা হয় যার উদ্বোধক ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলা ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে বঙ্গবন্ধু সেদিন যে দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ দিয়েছিলেন তা আজও আমাদের জন্য সমান প্রাসঙ্গিক। বঙ্গবন্ধু সেদিন বলেছিলেন, ‘আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি যেন শুধু শহরের পাকা দালানেই আবদ্ধ না হয়ে থাকে, বাংলাদেশের গ্রাম-গ্রামান্তরে কোটি কোটি মানুষের প্রাণের স্পন্দনও যেন তাতে প্রতিফলিত হয়।’ আমাদের লেখকদেরও মাটি ও মানুষের কথা তাদের লেখনিতে ফুটিয়ে তুলতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ দেশে বিরোধী জোট যে ধ্বংসাত্মক সন্ত্রাসী তৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে তা যেকোনো শুভবুদ্ধির মানুষের কাছেই নিন্দনীয় বিষয়। সাধারণ মানুষের উপর আগুন-সন্ত্রাস চালিয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির বিরুদ্ধে আমি লেখক-শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীসহ দেশের সব মানুষকে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই। একুশ মানে মাথা নত না করা; সে একুশের অবিনাশী চেতনায় আমাদের আগামীদিনের পথচলা সুন্দর ও নিরাপদ করতে, বাংলাদেশকে একটি সুখী- সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০১৪ প্রদান করা হয়। এবার বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০১৪ পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন কবিতা - শিহাব সরকার, কথাসাহিত্য - জাকির তালুকদার, প্রবন্ধ - শান্তনু কায়সার, গবেষণা - ভূঁইয়া ইকবাল, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্য - আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, ভ্রমণ - মঈনুস সুলতান এবং শিশুসাহিত্য - খালেক বিন জয়েনউদ্দীন। প্রবাসে অবস্থানের কারণে মঈনুস সুলতান অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি। অনুষ্ঠানে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকদের হাতে একলক্ষ টাকার চেক, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার এবং বাংলা একাডেমির পরিচালক শাহিদা খাতুন।
গতবারের মত এবারেরও বইমেলাও অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ এবং একাডেমির সমানে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। বইমেলায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৯২টি প্রতিষ্ঠানকে ১২৮টি ইউনিট) এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ২৫৯টি প্রতিষ্ঠানকে ৪৩৭টি ইউনিট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
এবারই প্রথমবারের মতো বাংলা একাডেমিসহ মোট ১১টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে বইমেলায় প্রতিটির জন্য ৪০০ বর্গফুটের প্যাভিলিয়ন প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ১০৬টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ১টি করে ইউনিট, ৯৬টি প্রতিষ্ঠানকে ২টি ইউনিট, ৪৫টি প্রতিষ্ঠানকে ৩টি ইউনিট এবং ১টি প্রতিষ্ঠানকে ৪ ইউনিটের স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
বাংলা একাডেমির অভ্যন্তরীণ অংশে ৩২টি শিশু-কিশোর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ৪২টি ইউনিট, ২৫টি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ৪৪টি ইউনিট, ১৯টি মিডিয়া ও আইটি প্রতিষ্ঠানকে ২০টি ইউনিট এবং ১৭টি অন্যান্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ২২টি ইউনিট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
এবার উন্মুক্ত জায়গাসহ ৭২টি লিটল ম্যাগাজিনকে বর্ধমান হাউজের দক্ষিণ পাশে লিটল ম্যাগাজিন কর্নারে জায়গা করে দেয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র প্রকাশনা সংস্থা এবং ব্যক্তি উদ্যোগে যাঁরা বই প্রকাশ করেছেন তাঁদের বই বিক্রি ও প্রদর্শনের জন্য জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের স্টলে রাখা যাবে।
বইমেলায় বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বই ৩০% কমিশনে, ২০০০ সালের পূর্ব পর্যন্ত প্রকাশিত একাডেমির বই ৭০% কমিশনে এবং মেলায় অংশগ্রহণকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ২৫% কমিশনে বিক্রি করছে। একাডেমি প্রাঙ্গণ এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মিলে বাংলা একাডেমির ৫টি বিক্রয় কেন্দ্র থাকছে। এর একটি সম্পূর্ণ সাজানো হয়েছে একাডেমি প্রকাশিত শিশু-কিশোরতোষ গ্রন্থ দিয়ে।
এবারের বইমেলায় বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ১০০টির বেশি নতুন বই পাওয়া যাচ্ছে। বইমেলা পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছুটির দিন ব্যতীত প্রতিদিন বিকেল তিনটা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। ছুটির দিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা এবং ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা চলবে।
এএ/আরআই