হক সাহেবের আয়নায় যা দেখবেন, সবই বাস্তব

কামরুজ্জামান মামুন
কামরুজ্জামান মামুন কামরুজ্জামান মামুন , সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ০৫:০৯ পিএম, ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
ঢাকার আন্তর্জাতিক উৎসবের অন্যতম সেরা সিনেমা

একটা শীতের রাত, নিস্তব্ধ শহর। ৯০১২ নাম্বার কক্ষ। চারটি বিছানার দুটিতে জামা-বই-মোজাসহ দৈনন্দিন ব্যবহার্যের স্তূপ। নিঃশব্দে দরজা ঠেলে এগিয়ে এলেন তিনি। বলে উঠলেন, ‘শীতের প্যারা আর নেয়া যাইতাছে না’। লম্বা চুলে অদৃশ্য কানের ফাঁকে লুকিয়ে রাখা কাঙ্ক্ষিত শলাকা বের করে বললেন, ‘লাইটার দে’।

বিলম্ব না করে লাইটার এগিয়ে রাজা জিজ্ঞাসা করলো, ‘কই থেইক্কা আইলি?’
... সিনেমা দেখে ...
রাজা হেসে বলল, তুই নিজেই তো একটা সিনেমা।
হক সাহেব বললেন, আরেহ... বাস্তব সিনেমা... আসার সময় দেখলাম হাকিমের গেটে ব্যাপক মারামারি। কে কারে মারতাছে বুঝা যাচ্ছে না... দুই-তিন জনরে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে গেছে।
এতক্ষণে নীরু তার নীরবতা ভেঙে প্রশ্ন করে, তর জুতা কই থেইক্কা কিনছোস?
নীরুর প্রশ্নে সবার চোখ চলে যায় হক সাহেবের জুতায়।
হক সাহেব বলেন, ইম্পোর্টেড। বিজ্ঞানের আলোয় চকচকে জুতার সৌন্দর্যে বিমোহিত চোখগুলো মুহূর্তেই জুতার নাড়ি-নক্ষত্র উদ্ধার করে ফেললো। বেশ দামি জুতা!
... শীত শেষে গ্রীষ্মের এক তুমুল বৃষ্টিতে হক সাহেব যখন ফুটবল খেলছিলেন, জুতাজোড়া তখনো তার পায়েই ছিল।

এ রকম বৈশিষ্ট্যের কেউ যখন সিনেমা বানায়, তখন সেটা যেমন হওয়ার কথা, ‘দ্যা ইউনিভার্সিটি অফ চানখাঁরপুল’ সেরকম সিনেমা।

হক সাহেবের আয়নায় যা দেখবেন, সবই বাস্তব

‘পপুলার সিনেমা’ দিয়ে ভরা সস্তা বিনোদনের এই যুগে হক সাহেব যে আয়না নিয়ে হাজির হয়েছেন, তা তথাকথিত সভ্য সমাজের ঘৃণ্য বাস্তবতার ঝকঝকে প্রতিচ্ছবি। এ আয়নায় প্রতিফলিত হয়েছে একটি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার মতো বাস্তব চিত্র — শিক্ষাব্যবস্থায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ক্ষমতার কাছে শিক্ষকের নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ, শিক্ষার্থীর স্বপ্নভঙ্গের আর্তনাদ। 

ছবিটায় আরও আছে বিভাজনের রাজনীতি, আদর্শিক দ্বন্দ্বে মতাদর্শ ভুলে যাওয়া একদল দস্যুর আরও কিছু লুণ্ঠনের আকাঙ্ক্ষা। যাদের একটাই আদর্শ — দেশের চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে ‘আমি’ বড়। এখানে হাসির আড়ালে আছে যাপিত জীবনের তিক্ত সত্য, আছে বিলাসিতার আড়ালে নগ্ন দারিদ্র্য, আছে প্রেমে ব্যর্থ বিদ্রোহী প্রেমিকের আর্তচিৎকারে কান ফেটে যাওয়া নীরবতা।

দৃশ্যায়নে নেই ভীরুতার লেশমাত্র, আদর্শে নেই মাথানত করা তোষামোদের রাজনীতি। এখানে ক্ষমতার লোভে অন্ধ রাবনের উন্মাদ নৃত্য থামিয়ে দিয়েছে যেন সমতার দেবদূত। ছবির নাম ‘দ্যা ইউনিভার্সিটি অফ চানখাঁরপুল’, নির্মাতার নাম মনিরুল হক আকাশ। সম্প্রতি ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের বাংলাদেশ প্যানারমার পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র শাখায় সমালোচকদের বিচারে সেরা ছবির পুরস্কার জিতেছে এটি।

হক সাহেবের আয়নায় যা দেখবেন, সবই বাস্তবসম্পাদনার টেবিলে ‘দ্যা ইউনিভার্সিটি অফ চানখাঁরপুল’

হাস্যরস আর ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের আড়ালে সমকালীন জীবনে গা সয়ে যাওয়া নানা অন্যায়-অবিচার আর আশাহতের ঘটনা নিয়ে তৈরি হয় ‘পলিটিক্যাল স্যাটেয়ার’ ঘরানার সিনেমা। তৃতীয়বিশ্বের দেশ হিসেবে বাংলায় স্যাটেয়ার গোছের সিনেমায় যারা মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন, তাদের অন্যতম সত্যজিৎ, মৃনাল, ঋত্বিক এবং তারেক মাসুদ।

‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমায় রূপক আর হেয়ালির আড়ালে শাসকশ্রেণির বুকে আদর্শের খঞ্জর বসিয়ে দিয়েছেন সত্যজিৎ। তিনি দেখিয়েছেন, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে শাসকগোষ্ঠীর বিভ্রান্তিকর বাক্যের প্রলাপ আর শিক্ষার আলো নিভিয়ে জিজ্ঞাসার দ্বার বন্ধ করার ব্যর্থ প্রয়াস। ঠিক যেমন ভাবে তারেক মাসুদ তার ‘মাটির ময়না’য় রূপকের আড়ালে ধর্মান্ধ শ্রেণির মুখে সেঁটে দিয়েছেন মানবতার জয়গান।

হক সাহেবের এই সিনেমায় দেখানো হয়েছে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থার করুণ দশা। এতে চিত্রিত হয়েছে শিক্ষক-ছাত্রের মধ্যে যোজন-যোজন দূরত্ব আর শাসকের সিংহাসন টিকিয়ে রাখতে ছাত্র রাজনীতির নামে মাদক-সন্ত্রাসের বিস্তার। হক সাহেব তার দেখা বাস্তব ঘটনাগুলোকে রূপকের আশ্রয়ে যেভাবে অক্ষির সমীপে দাঁড় করিয়েছেন, তা নিশ্চিতভাবে প্রশংসার দাবি রাখে।

হক সাহেবের আয়নায় যা দেখবেন, সবই বাস্তব

যার শব্দই গান, তিনি তাবিব, যিনি এই আয়নার গানওয়ালা। তাবিবের শব্দের ঝংকার আর ছন্দের জাদুতে বিদ্রোহের আগুনে পুড়বে দর্শকের হৃদয়। গানের তালে খুঁজে পাবেন আদরের মানিক হারানো মায়ের কান্নার ঢেউ আর গর্জন।

সিনেমা নিয়ে জাগো নিউজকে পরিচালক আকাশ হক বলেন, ‘এই সিনেমায় খ্যাতিসম্পন্ন একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা এবং আবাসিক হলের ছাত্র রাজনীতির এমন সব বাস্তব চিত্র তুলে আনা হয়েছে, যা বাংলাদেশের কোনো সিনেমায় আগে কখনো দেখা যায়নি।’

শিগগির মুক্তি পেতে যাচ্ছে ‘দ্যা ইউনিভার্সিটি অফ চানখাঁরপুল’। সিনেমাবোদ্ধাদের তৃপ্ত করে এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে পূর্ণদৈর্ঘ্য-এ সিনেমা। অর্জন করেছে ‘ক্রিটিকস চয়েস অ্যাওয়ার্ডস-২০২৬’।

কেএম/আরএমডি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।