কেবল একটি ‘কাগজ’ দিতেও টাকা নিচ্ছে এফডিসি

মইনুল ইসলাম
মইনুল ইসলাম মইনুল ইসলাম , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:৩৬ পিএম, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন এখনও ধরে রেখেছে পুরাতন আমলের নিয়ম ও ফি

আগে সিনেমা বানাতে প্রায় সব সহযোগিতা নিতে হতো বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি)। এখন সেসব লাগে না বললেই চলে। বিএফডিসির সাহায্য ছাড়াই স্বাধীনভাবে সিনেমা বানাচ্ছেন নির্মাতারা। তবু সার্টিফিকেটের জন্য জমার আগে দরকার হয় তাদের অনাপত্তিপত্র। অনাপত্তিপত্র নামের ওই ‘কাগজ’টির জন্যও অর্থ নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি, যাকে অযৌক্তিক বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

চলচ্চিত্র নির্মাণে সেন্সর ও ‘অনাপত্তি’ সনদ (এনওসি) নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছিলেন দেশের স্বাধীন নির্মাতারা। তাদের অভিযোগ, কোনো সেবা না দিয়ে কেবল একটি এনওসির জন্য ২০ হাজার টাকা নেওয়া অর্থহীন, যা কদিন আগেও ছিল ১৫ হাজার। ক্ষেত্রবিশেষে এই টাকায় একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রও বানিয়ে ফেলেন অনেক স্বাধীন নির্মাতা।

কেবল একটি ‘কাগজ’ দিতেও টাকা নিচ্ছে এফডিসি

দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন কামরুল আহসান লেনিন। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, “অ্যানালগ সময়ে এ ধরনের নিয়মকানুন তুলনামূলকভাবে যুক্তিসংগত ছিল। তখন স্টুডিওর সংখ্যা কম ছিল এবং প্রায় সব ধরনের কারিগরি সহায়তা এফডিসি থেকে নিতে হতো। সে সময় সেন্সর বোর্ড থেকে ‘অনাপত্তি’ সনদ নিতে সরাসরি উপস্থিত হওয়ার বিষয়টিও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।”

ইদানীং সবকিছু বদলে গেছে উল্লেখ করে কামরুল আহসান লেনিন বলেন, ‘এখন হাতে থাকা মোবাইল ফোন দিয়েই ছবি নির্মাণ করা হচ্ছে। শর্টফিল্ম নির্মাণে আলাদা কোনো অবকাঠামোগত সহায়তারও তেমন প্রয়োজন পড়ে না। তা সত্ত্বেও কেন আগের মতো বাধ্যবাধকতা রয়ে গেছে, সেটি বোধগম্য নয়।’ এই নির্মাতার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই এখন অনেক ফিল্ম ও শর্টফিল্মের প্রদর্শন এবং প্রচার হচ্ছে, সেখানে এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ অযৌক্তিক।’

তরুণ নির্মাতা গোলাম রাব্বানী জানান, সার্টিফিকেশন বোর্ডের নির্ধারিত ফি দিতে তার আপত্তি নেই। কিন্তু বিএফডিসি থেকে ‘অনাপত্তি’ সনদের জন্য আলাদাভাবে ১৫-২০ হাজার টাকা নেওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘অনেক নির্মাতা ৫ হাজার টাকার মধ্যেই একটি শর্টফিল্ম নির্মাণ শেষ করেন। সেখানে কোনো সেবা না দিয়ে শুধু একটি প্যাডে দু-একটি কথা লিখে দেওয়ার জন্য এই অর্থ দাবি করা রীতিমতো অন্যায়।’

সার্টিফিকেশন বোর্ডের কাছে সনদের জন্য নতুন সিনেমা জমা দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি এফডিসির এনওসি। অথচ সহজ প্রযুক্তির এই যুগে এই প্রক্রিয়া আরও সহজ হওয়া উচিত বলে মনে করেন গোলাম রাব্বানী। তার মতে, অনলাইনে একটি তথ্যভাণ্ডার থাকলে সার্টিফিকেশন বোর্ড সহজেই যাচাই করতে পারে নির্মাতার সঙ্গে এফডিসির কোনো চুক্তি আছে কি না। এজন্য নির্মাতাকে টেবিলে-টেবিলে ঘুরে ফি দিয়ে এনওসি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। সদিচ্ছা থাকলেই তথ্যমন্ত্রণালয় দ্রুত এই সমস্যার সমাধান করতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।

কেবল একটি ‘কাগজ’ দিতেও টাকা নিচ্ছে এফডিসি

অনেক নির্মাতার চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার শুরু হয় স্বল্পদৈর্ঘ্য দিয়ে। তাদের একজন পূর্ণদৈর্ঘ্য ‘নয়া মানুষ’-এর নির্মাতা সোহেল রানা বয়াতী। শর্টফিল্ম বানিয়ে আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলেছিলেন তিনি। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘বাস্তবতা হলো, শর্টফিল্মের জন্য কোনো বাজেট পাওয়া যায় না। তার ওপর আবার এনওসি ও সেন্সর ফিসহ ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা খরচ করার কথা ভাবাই কঠিন। সেসবের মধ্যে এফডিসির এনওসি অন্যতম।’

সোহেল রানা বয়াতি জানান ‘জল ও পানি’, ‘সেলাই জীবন’ ও ‘টিয়ার গপ্পো’ নামে তিনটি স্বল্পদৈর্ঘ্য নির্মাণ করে বিদেশের বেশ কয়েকটি উৎসবে দেখিয়েছেন তিনি। কিন্তু অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে দেশে সেন্সর করাতে পারেননি। তাই এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে নির্বাচিত হয়েছিল নবীন নির্মাতা শরীফ নাসরুল্লাহর বানানো প্রথম সিনেমা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছবিটি জমা দেননি তিনি। কেন? জানতে চাইলে শরীফ বলেন, ‘“এই শহরে” নামের ছবিটির দৈর্ঘ্য ৩১ মিনিট। এটার এনওসির জন্য আমি এত টাকা কেন খরচ করবো? যেখানে আমি তাদের কোনো সার্ভিসই নিইনি।’

চলচ্চিত্র প্রযোজক শিমুল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘এই টাকার বিনিময়ে যদি তারা সত্যিকারের কোনো সেবা দিত, তাহলে এটা মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু অডিটের নামে তারা যা করে, সেটা অপ্রয়োজনীয়।’ নির্মাতা রাশিদ পলাশ বলেন, ‘বিএফডিসি নিজেদের অপ্রয়োজনীয় করে তুলেছে। শুধু কর্তৃত্ব ধরে রাখার জন্য এই নিয়ম চালু রেখেছে।’

চলচ্চিত্র, বিশেষ করে শর্টফিল্মের ক্ষেত্রে এখনও কেন এমন ব্যবস্থা? নির্মাতা ও চলচ্চিত্র শিক্ষক মতিন রহমান মনে করেন, স্বাধীন নির্মাতারা নিজেদের মতো করে গল্প বলতে চান। সেই সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করার বদলে তাদের স্বাধীনতাই হরণ করা হচ্ছে। তাদের একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে বেঁধে রাখার চেষ্টাও হতে পারে এটি। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়গুলো নিয়ে আমরা বহুবার কথা বলেছি। কোনো কার্যকর সমাধান আসেনি।’

কেবল একটি ‘কাগজ’ দিতেও টাকা নিচ্ছে এফডিসি

কীভাবে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে? 

ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের পরিচালক আহমেদ মুজতবা জামাল বলেন, ‘তরুণ নির্মাতাদের এত নিয়মের বেড়াজালে না বাঁধাই ভালো। তাদের জন্য বিষয়গুলো আরও সহজ করা উচিত। শুধু ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে দেখানোর জন্যও যে সেন্সর করাতে হচ্ছে, এটাও একটা ঝক্কি।’ তিনি মনে করেন, অন্তত ফেস্টিভ্যালের ছবি ফি-এর আওতার বাইরে থাকা উচিত।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমান তানি নিজেও একজন নির্মাতা। পুরোনো দিনের এসব ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে কি না জানতে চাইলে জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘নির্মাতারা কী ধরনের সমস্যার মধ্যে কাজ করেন, তা আমি ভালোভাবেই জানি। বিশেষ করে শর্টফিল্ম মেকাররা। এই বিষয়টি ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ের একাধিক মিটিংয়ে তুলেছি। শর্টফিল্মের জন্য “অনাপত্তি” সনদ নিতে কোনো ফি যাতে দিতে না হয়, অথবা হলেও সেটা যেন সামান্য হয়, সেই প্রস্তাব করেছি। তাদের বলেছি যে, এটা করা গেলে তরুণ নির্মাতারা আরও বেশি ফিল্ম নির্মাণে আগ্রহী হবেন।’

আহমেদ মুজতবা জামাল বলেন, ‘ফিল্ম কমিশনকে এ বিষয়ে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই সরকার ঝুঁকি নিতে চায়নি। নতুন সরকার এলে তাদের কাছে দাবী-দাওয়া তুললে হয়তো সমস্যাটির সমাধান হবে। তবে এজন্য জনমত গড়ে তুলতে হবে।’

তবে সম্পূর্ণ ব্যবস্থাটিকে একেবারে নিয়ন্ত্রণহীন রাখারও পক্ষে নন কামরুল আহসান লেনিন। তার প্রস্তাব, চাইলে একটি ছোট কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যারা শুধু বিষয়বস্তু যাচাই করবে এবং এরপর একটি সার্টিফিকেট দেবে। এতে একদিকে যেমন নির্মাতারা হয়রানি-মুক্ত থাকবেন, অন্যদিকে একটি যৌক্তিক কাঠামোও বজায় থাকবে।

এনওসি ও সেন্সর প্রসঙ্গে খ্যাতিমান ইরানি চলচ্চিত্রকার জাফর পানাহির ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেন নবীন নির্মাতা শরীফ নাসরুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘জাফর পানাহি গোপনে একটি সিনেমা বানিয়ে পেনড্রাইভে করে পাঠিয়েছিলেন আরেক দেশের উৎসবে। সেখানে যদি তাকে বলা হতো, এনওসি দিন, সেন্সর করিয়ে আনুন, তার সিনেমাটি পেনড্রাইভেই থেকে যেত।’

এমআই/আরএমডি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।