মার্শাল আর্ট দিয়ে ঢালিউড কাঁপানো এক লড়াকু নায়কের গল্প
বাংলা চলচ্চিত্রের অ্যাকশন ঘরানার কথা উঠলেই যে নামটি সবচেয়ে আগে মনে পড়ে তিনি হচ্ছেন জনপ্রিয় নায়ক রুবেল। কুংফু, কারাতে আর মার্শাল আর্টের দুর্দান্ত মিশেলে যিনি এক সময় ঢালিউডে তৈরি করেছিলেন আলাদা এক ধারা। অনেকে তাকে ভালোবেসে ঢালিউডের ব্রুসলি বলেও ডাকেন। আজ এই লড়াকু নায়কের জন্মদিন।
রুবেলের আসল নাম মাসুম পারভেজ রুবেল। ১৯৬০ সালের ৩ মে বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। কিংবদন্তি অভিনেতা সোহেল রানা-এর ছোট ভাই হিসেবে শোবিজ অঙ্গনে তার পরিচিতি থাকলেও নিজের প্রতিভা দিয়েই তিনি গড়ে তুলেছেন স্বতন্ত্র অবস্থান।
মাত্র ২২ বছর বয়সেই টানা দুইবার জাতীয় কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণপদক জয় করে নিজের দক্ষতার জানান দেন রুবেল। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় বড় ভাইয়ের প্রযোজনায় ও শহিদুল ইসলাম খোকন পরিচালিত ‘লড়াকু’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে তার। প্রথম ছবিতেই অ্যাকশন হিরো হিসেবে দর্শকের নজর কাড়েন তিনি।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে প্রায় ২০০টির মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন রুবেল। তবে তার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মার্শাল আর্ট। নিজের প্রতিটি সিনেমায় নতুন নতুন ফাইট স্টাইল এনে দর্শকদের চমকে দিতেন তিনি। ‘ড্রাঙ্কিং কুংফু’, ‘উইপিং কুংফু’, ‘ড্যান্সিং কুংফু’ কিংবা ‘ব্লাইন্ড কুংফু’- এমন বৈচিত্র্যময় কৌশল ব্যবহার করে অ্যাকশন দৃশ্যকে নিয়ে গেছেন এক অন্য উচ্চতায়।
শুধু নায়ক হিসেবেই নয়, ফাইট ডিরেক্টর হিসেবেও তিনি ছিলেন সমান সফল। ‘দ্য অ্যাকশন ওয়ারিয়র্স’ নামে নিজের একটি ফাইটিং টিম গড়ে তুলেছিলেন, যা সেই সময়ের সিনেমায় আলাদা মাত্রা যোগ করে। তার হাত ধরেই বাংলাদেশে মার্শাল আর্টভিত্তিক সিনেমার জনপ্রিয়তা বাড়ে, অনুপ্রাণিত হয় অসংখ্য তরুণ।
তার কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিলো। যেমন কোনো জুটি প্রথায় আবদ্ধ না হয়ে একাধিক নায়িকাকে নিয়ে তিনি সফল ছবি উপহার দিয়েছেন। কাঞ্চন-দিতি, কাঞ্চন-চম্পা, মান্না-চম্পা, নাঈম-শাবনাজ জুটি যখন তুমুল জনপ্রিয় তখনও রুবেল নিজের আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন নিজস্ব ধারায় তেমনি সানি-সালমানদের যুগেও তিনি ছিলেন তুমুল জনপ্রিয় নায়ক।
দীর্ঘ দিনের ক্যারিয়ারে রুবেল অভিনয় করেছেন দুই বাংলার প্রায় ৫০ জন নায়িকার সঙ্গে। তারমধ্যে কবিতা ও পপি হচ্ছেন সর্বাধিক ছবির নায়িকা। রুবেলের অন্যান্য নায়িকারা হলেন রানী, জিনাত, শতাব্দী রায় (কলকাতা), সন্ধ্যা, চম্পা, সাথী, মিশেলা, সুচরিতা, পরী, দিতি, একা, মৌসুমি, অরুণা বিশ্বাস, লিমা, নন্দিনী, শিল্পী, তামান্না, সিমলা, কেয়া, সোনিয়া, শাহনাজ, সাহারা, শাহনূর প্রমুখ।
তবে দুজন ভিলেনের সঙ্গে রুবেলের জুটি ছিলো জমজমাট। অনেক ভিলেনকেই রুবেলের সঙ্গে সফল হতে দেখা গেছে। তবে ইলিয়াস কোবরা ছিলেন অনন্য। কারণ এই কোবারও ছিলেন মার্শাল আর্টে পারদর্শি। তার সঙ্গেই বেশি জমে উঠতো রুবেলের অ্যাকশান। আর হুমায়ূন ফরীদি ছিলেন রুবেলের সিনেমার কমন ভিলেন। দারুণ একটি জুটি গড়ে উঠেছিলো রুবেল-ফরীদির। আর তাদের সেই জুটিকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রয়াত নির্মাতা শহিদুল ইসলাম খোকন।
৯০-এর দশকের শেষ দিকে তিনি নির্মাতা হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেন। প্রযোজনা ও পরিচালনায় তৈরি করেছেন একাধিক ব্যবসাসফল সিনেমা, যা তার বহুমুখী প্রতিভারই প্রমাণ। তিনি এ পর্যন্ত ১৭টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন যার সবগুলোই ছিলো বাম্পার হিট। তার প্রযোজিত ও পরিচালিত ছবিগুলো হচ্ছে বিচ্ছু বাহিনী, মায়ের জন্য যুদ্ধ, প্রবেশ নিষেধ, বাঘে বাঘে লড়াই, টর্নেডো কামাল, বিষাক্ত চোখ, রক্ত পিপাসা, সিটি রংবাজ, খুনের পরিণাম, অন্ধকারে চিতা, চারিদিকে অন্ধকার ইত্যাদি।
ব্যক্তি জীবনে রুবেলের দাম্পত্য সঙ্গী সুলতানা পারভেজ নীলা। সুখের সংসারে তাদের রয়েছে এক পুত্র সন্তান। নাম তার নিলয় পারভেজ। চলচ্চিত্রের নন্দিত অভিনেতা, পরিচালক ও প্রযোজক সোহেল রানার ছোট ভাই রুবেল।
কুংফু-কারাতে আর দুর্দান্ত অ্যাকশন দিয়ে যিনি বাংলা সিনেমায় গড়ে তুলেছেন নিজস্ব সাম্রাজ্য, সেই রুবেল আজও রয়ে গেছেন দর্শকদের হৃদয়ে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে। জন্মদিনে এই অ্যাকশন কিংয়ের জন্য রইল শুভকামনা। দীর্ঘদিন তিনি বেঁচে থাকুন ভক্তদের ভালোবাসায়।
এলআইএ