ভারত-যুক্তরাষ্ট্র: শান্তির পদযাত্রায় বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সঙ্গী পথ কুকুর

ফিচার ডেস্ক
ফিচার ডেস্ক ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:২৭ পিএম, ০৯ জানুয়ারি ২০২৬
আলোকা পথ কুকুর থেকে বিশ্বশান্তির বার্তা বাহক

আলোকার দিন কাটে ভারতের কোনো এক ধুলোমাখা রাস্তায়। স্বজাতিদের সঙ্গে খেলায় মেতে ওঠে কখনো কখনো। খাবার আর আশ্রয়ের নিশ্চয়তা নেই। ডাস্টবিন বা মানুষের ফেলে যাওয়া কোনো উচ্ছিষ্ট খাবার তার জন্য রাজকীয় ভোজ। দিন কাটে মানুষের তাড়া খেয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় আশ্রয় খুঁজে। ঘুম পেলে রাস্তার ধারে, কোনো গাছের নিচে কিংবা কোনো দোকানের সামনে ফুটপাতে ঘুমিয়ে নেয়।

এমনই একদিন আলোকার সামনে দিয়েই একদল বৌদ্ধ ভিক্ষু তাদের ধ্যান ও পদযাত্রার পথে এগিয়ে চলেছিলেন। হঠাৎ করেই সেই দলে জুড়ে যায় বাদামি-সাদা রঙের একটি কুকুর। কেউ ডাকেনি, কেউ আদেশও দেয়নি তবু সে যেন নিজের জায়গা ঠিক করে নিয়েছিল। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকায়নি। এখন সে সেই ভিক্ষু দলের প্রধান আকর্ষণ। এই কুকুরটিই আলোকা। এই নামটিও সে পেয়েছে এই ভিক্ষু দলের কাছ থেকেই।

jagonewsনীরব পায়ে শুরু হয়েছিল যাত্রা। কোনো পোস্টার, কোনো স্লোগান নয় শুধু খোলা রাস্তা, গেরুয়া বসন আর সঙ্গে এক আশ্চর্য সঙ্গী। নাম তার আলোকা দ্য পিস ডগ। একসময় ভারতের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো এক ভবঘুরে কুকুর, আজ সে বিশ্বশান্তির বার্তা নিয়ে হেঁটে চলেছে যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে।

ভিক্ষুদের সঙ্গে পথে পথে সে হেঁটেছে টানা ১০০ দিনেরও বেশি সময়। রোদ, বৃষ্টি, কাদা কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। ভিক্ষুরাও তাকে তাড়াননি। বরং নীরবে মেনে নিয়েছেন, এই কুকুরটিও যেন যাত্রারই অংশ। এই পদযাত্রার নাম ‘ওয়াক ফর পিস’ বিশ্বশান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের ১০টি অঙ্গরাজ্য পাড়ি দেওয়ার এক দীর্ঘ যাত্রা। আয়োজন করেছে হুং দাও ভিপাসনা ভাবনা সেন্টার। প্রায় ৩ হাজার ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথচলা শুরু হয় টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থ থেকে, গন্তব্য ওয়াশিংটন ডিসি।

১০ অক্টোবর শুরু হওয়া এই যাত্রা শেষ হতে সময় লাগবে প্রায় ১২০ দিন। ভিক্ষুদের বিশ্বাস, ধীরে ধীরে হাঁটা, নীরবতা আর সহমর্মিতাই মানুষের মধ্যে শান্তির বোধ জাগাতে পারে। তাদের ফেসবুক পেজে লেখা এই পদযাত্রার লক্ষ্য আমেরিকা তো বটেই, সারাবিশ্বে শান্তি, ভালোবাসা ও করুণার সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া।

jagonewsএই যাত্রার সবচেয়ে আকর্ষণীয় চরিত্র এখন আলোকা। কপালের মাঝখানে হৃদয়-আকৃতির একটি দাগ, চোখে অদ্ভুত শান্ত ভাব। সে কোনো ব্যানার বহন করে না, কোনো কথা বলে না তবু মানুষ থমকে দাঁড়ায় তাকে দেখতে। আলোকা এখন আর শুধু একটি কুকুর নয়, সে এই আন্দোলনের অনানুষ্ঠানিক মাসকট। পথে পথে মানুষ তার জন্য পানি আর খাবার নিয়ে আসে, কেউ আদর করে, কেউ ছবি তোলে। সামাজিক মাধ্যমে আলোকাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে আলাদা ভক্তগোষ্ঠী।

ভিক্ষুদের ফেসবুক পোস্টে জানানো হয়, আলোকা নিয়মিত পশু চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকে। দীর্ঘ হাঁটার ধকল সামলাতে দেওয়া হয় প্রয়োজনীয় বিশ্রাম আর যত্ন। কেউ কেউ তার জন্য খেলনা, কেউ বা ট্রিট পাঠান একসময় যে কুকুর রাস্তায় অবহেলিত ছিল, আজ সে ভালোবাসায় ভরে গেছে।

অনেকেই জানতে চান, আলোকা আসলে কোন জাতের কুকুর। ভিক্ষুরা জানিয়েছেন, তারা নিশ্চিত নন। তবে ধারণা করা হয়, আলোকা প্রায় ৪ বছর বয়সী এবং সে সম্ভবত একটি ইন্ডিয়ান প্যারাইয়া ডগ যে জাতের কুকুর সাধারণত ভারতের রাস্তায় দেখা যায়। শক্তপোক্ত শরীর, সহনশীলতা আর অভিযোজন ক্ষমতার জন্য এই জাত পরিচিত যেন দীর্ঘ পথচলার জন্যই তৈরি।

jagonewsওয়াক ফর পিস কেবল একটি ধর্মীয় যাত্রা নয়, এটি মানুষের সঙ্গে প্রকৃতি ও প্রাণীর সম্পর্কেরও এক প্রতীক। আলোকা প্রমাণ করেছে, শান্তির ভাষা বোঝার জন্য শব্দের প্রয়োজন নেই। সহানুভূতি, বিশ্বস্ততা আর ভালোবাসা এই অনুভূতিগুলোই তাকে ভিক্ষুদের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

ভিক্ষুরা বলেন, আলোকা তাদের মনে করিয়ে দেয় মাইন্ডফুলনেস বা সচেতনতার কথা। সে বর্তমানেই বাঁচে, ক্ষুধা পেলে খায়, ক্লান্ত হলে থামে, আনন্দ পেলে লেজ নাড়ে। মানুষের জটিল জীবনের ভেতরে এই সরলতা যেন এক অনন্য শিক্ষা।

আরও পড়ুন
দক্ষতা নিয়ে যাব বিদেশ, রেমিট্যান্স দিয়ে গড়বো স্বদেশ
এসওএস ভিলেজে কেটেছে শৈশব, তাদের অনেকে আজ সমাজ গড়ার কারিগর

কেএসকে

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।