বিয়ের কনে কেনা যায় যে হাটে

ফিচার ডেস্ক
ফিচার ডেস্ক ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২:৪০ পিএম, ০৭ জানুয়ারি ২০২৬

 

বিয়ের প্রথম ধাপ হচ্ছে কনে দেখা কিংবা পাত্র-পাত্রী দেখা। যেখানে আমাদের বাঙালি সংস্কৃতিতে সাধারণত যা হয়, কোনো মেয়েকে পছন্দ হলে ছেলে কিংবা তার পরিবার বিয়ের প্রস্তাব দেন মেয়েকে কিংবা মেয়ের পরিবারকে। এরপর কনে দেখা এবং সব ঠিক থাকলে বিয়ের তারিখ ঠিক করে বিয়ে দেওয়া।

কিন্তু জানেন কি? এমন একটি জাতি আছে যারা এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও বিবাহযোগ্য মেয়েদের বিক্রি করেন বিয়ের হাটে। আচ্ছা আরেকটু সহজ করে বলি, এই সম্প্রদায়ের বাবা-মা তাদের বিবাহযোগ্য মেয়েদের সাজিয়ে নির্দিষ্ট একটি দিনে নিয়ে যান বিয়ের হাটে। সেখানে বিবাহযোগ্য পুরুষরা আসেন পাত্রী বা বউ কিনতে।

jagonews

যে মেয়েকে তাদের পছন্দ হবে তারাই তার দাম ঠিক করে দেবেন। এখানে মেয়েদের গায়ের রং মুখ্য একটি ভূমিকা পালন করে। সেই সঙ্গে মেয়ের সতীত্ব অবশ্যই বজায় রাখতে হবে। এখানে পাত্রী হিসেবে আসেন একেবারে ১২ বছরের কিশোরী থেকে ২৫ বছরের তরুণী। এই দিনটি তাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সম্প্রদায়ে ছেলে-মেয়েদের এভাবেই বিয়ে হয়।

এই রীতি প্রচলিত বুলগেরিয়ার রোমা বা রোমানি জনগোষ্ঠীতে। এই জনগোষ্ঠীকে ঘিরে বহু সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রয়েছে। তাদের মধ্যেই দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে একটি বিতর্কিত প্রথা বিয়ের উপযোগী মেয়েদের নিয়ে আয়োজন করা হয় এক ধরনের ‘বিয়ের হাট’। একে তারা বলেন কালাাইজ্জি ব্রাইড মার্কেট। এখানে পরিবারগুলো নিজেদের মেয়েকে সম্ভাব্য পাত্রদের সামনে উপস্থাপন করে। পাত্রপক্ষ মেয়েদের সঙ্গে কথা বলে, পছন্দ অপছন্দ বিবেচনা করে এবং শেষে অর্থ বা দেনমোহরের পরিমাণ ঠিক করে বিয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। অনেকের কাছে এটি যেন এক ধরনের ‘কেনাবেচা’, আবার স্থানীয়দের কাছে এটি বহু পুরোনো সামাজিক রীতি।

বুলগেরিয়ার নির্দিষ্ট কিছু রোমা বসতিতে বিশেষ উৎসবের সময় এই আয়োজন করা হয়। ওই দিনে মেয়েরা সুন্দরভাবে সাজগোজ করে পরিবারসহ সেখানে আসে। অন্যদিকে পাত্রপক্ষ পরিবার মেয়েদের সঙ্গে দেখা করে কথা বলে এবং ভবিষ্যত পরিকল্পনা শোনে। অনেক সময় সেই কথাবার্তার সঙ্গেই নির্ধারিত হয় বিয়ের খরচ ও অর্থনৈতিক শর্তাবলি। ফলে বিয়েটি কেবল সামাজিক নয়, আর্থিক চুক্তিও বটে।

jagonewsরোমা সম্প্রদায় বহুদিন ধরেই ইউরোপে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্বীকৃতির ঘাটতি তাদের জীবনকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। তাই অনেক পরিবার মনে করে, এই বিয়ের হাট মেয়েদের জন্য ‘উপযুক্ত পাত্র’ খোঁজার একটি কার্যকর উপায়। বিয়ের খরচ আগে থেকেই নির্দিষ্ট থাকায় তাদের দৃষ্টিতে এটি নিরাপদ ও স্বচ্ছ পদ্ধতি।

তবে আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রথা নিয়ে রয়েছে তীব্র বিতর্ক। সমালোচকদের মতে, এখানে সবসময় মেয়েদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অর্থের বিনিময়ে বিয়ে ঠিক হওয়ায় বিষয়টি পণ্য কেনাবেচার মতো মনে হতে পারে। এর পাশাপাশি অল্প বয়সে বিয়ের ঝুঁকি, শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়ার আশঙ্কা এবং নারীর স্বাধীনতার প্রশ্নও জোরালো হয়ে ওঠে।

বুলগেরিয়ায় আইনি বয়সসীমা থাকা সত্ত্বেও, রোমা সম্প্রদায়ের অনেক বিয়ে হয় সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে, যা আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত থাকে না। ফলে আইনগত তদারকি অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল হয়ে পড়ে। এই কারণেও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা আরও গভীর।

jagonewsতবে রোমা সমাজের ভেতরেও এখন পরিবর্তনের ঢেউ লাগতে শুরু করেছে। নতুন প্রজন্মের অনেক তরুণ-তরুণী শিক্ষা ও কাজকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছেন। তারা চান পারস্পরিক সম্মতিতে বিয়ে, মেয়েদের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান এবং অর্থের বিনিময়ে সম্পর্ক নির্ধারণের প্রথা থেকে বেরিয়ে আসতে। অন্যদিকে, রক্ষণশীল অংশ এখনো একে সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবেই দেখে।

এই প্রথায় অংশ নেওয়া মেয়েদের অভিজ্ঞতাও এক রকম নয়। কেউ কেউ এটিকে সুযোগ হিসেবে দেখেন, কারণ এতে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য বিয়ে হয়। আবার কেউ মনে করেন, এটি তাদের ওপর সামাজিক চাপ। তাই বাস্তবতা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন।

রোমা সম্প্রদায়ের এই বিয়ের হাট কেবল একটি সামাজিক আয়োজন নয়, বরং ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সংঘাতের প্রতিচ্ছবি। একদিকে শত বছরের সংস্কৃতি, অন্যদিকে মানবাধিকার ও নারীসমতার প্রশ্ন। শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রথা সময়ের সঙ্গে কীভাবে বদলাবে সেটিই এখন দেখার বিষয়।

আরও পড়ুন
বিয়েতে অতিথিরা বর-কনেকে চুমু খান যে দেশে
যেখানে সবাই মেলায় জীবনসঙ্গী খোঁজে, বিয়ের আগেই মা হয় মেয়েরা

সূত্র: এনডিটিভি

কেএসকে

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।