৫০০০ বছর ধরে আগুন জ্বলছে যে পাহাড়ে

ফিচার ডেস্ক
ফিচার ডেস্ক ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:১৪ এএম, ০২ মার্চ ২০২৬
জ্বলন্ত পাহাড় ইয়ানার ডাগ

ঝড়-বৃষ্টি, তুষারপাত কিংবা ঋতু বদল কিছুই থামাতে পারেনি পাহাড়ের বুক থেকে উঠে আসা আগুনের শিখাকে। কোনো কল্পকাহিনি নয়, বাস্তবেই এমন এক বিস্ময়কর স্থান রয়েছে ককেশাস অঞ্চলের দেশ আজারবাইজানে। সেই কারণেই দেশটিকে অনেকে বলেন ‘ল্যান্ড অব ফায়ার’ বা আগুনের দেশ।

রাজধানী বাকু থেকে বেশি দূরে নয়, অ্যাবশেরন উপদ্বীপে অবস্থিত বিখ্যাত জ্বলন্ত পাহাড় ইয়ানার ডাগ। স্থানীয় ভাষায় যার অর্থই ‘জ্বলন্ত পাহাড়’। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে সারিবদ্ধভাবে জ্বলতে থাকা আগুন যেন প্রকৃতির এক অন্তহীন প্রদীপ। দিনের আলোয় এটি যতটা রহস্যময়, রাতের অন্ধকারে তা আরও নাটকীয় কমলা-লাল শিখা অন্ধকার আকাশের পটভূমিতে নেচে ওঠে।

jagonewsএই অনন্ত শিখার রহস্য লুকিয়ে আছে অ্যাবশেরন উপদ্বীপের ভূগর্ভে। অঞ্চলটি প্রাকৃতিক গ্যাসে সমৃদ্ধ। হাজার হাজার বছর ধরে পাথরের স্তরে আটকে থাকা গ্যাস ধীরে ধীরে ফাটল দিয়ে উপরে বেরিয়ে আসে। একবার আগুন ধরলে সেই গ্যাসের প্রবাহ অব্যাহত থাকায় শিখাও জ্বলতে থাকে অবিরাম। বিজ্ঞানীদের মতে, এ ধরনের ‘ন্যাচারাল গ্যাস সিপেজ’ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে দেখা গেলেও এত দীর্ঘস্থায়ী ও দৃশ্যমান আগুন বিরল।

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, অতীতে আজারবাইজানের বিভিন্ন প্রান্তে এমন বহু প্রাকৃতিক আগুন জ্বলত। তবে আধুনিক কালে ব্যাপক গ্যাস উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভস্থ চাপ কমে যায় এবং বেশিরভাগ আগুন নিভে যায়। বর্তমানে ইয়ানার ডাগই সেই প্রাচীন আগুনের অন্যতম শেষ সাক্ষী।

jagonewsঅ্যাবশেরন অঞ্চলের এই অগ্নিশিখা শুধু প্রাকৃতিক বিস্ময় নয়, আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যেরও অংশ। প্রাচীন পারস্যভিত্তিক ধর্ম জোরাস্ট্রিয়ানিজমে আগুন পবিত্রতার প্রতীক। বহু শতাব্দী আগে আগুনকে কেন্দ্র করে উপাসনার প্রচলন ছিল এই অঞ্চলে। ধারণা করা হয়, প্রায় ৪-৫ হাজার বছর আগে এখানকার আধ্যাত্মিক চর্চার পেছনে এই প্রাকৃতিক শিখার বড় ভূমিকা ছিল।

ইয়ানার ডাগের কাছেই রয়েছে ঐতিহাসিক আটেশগাহ ফায়ার টেম্পেল। প্রাকৃতিক গ্যাস নির্গমনের স্থানের ওপর নির্মিত এই অগ্নিমন্দিরে একসময় দূরদূরান্ত থেকে তীর্থযাত্রীরা আসতেন। অনন্ত শিখার সামনে প্রার্থনা করতেন, আগুনকে পবিত্র শক্তির প্রতীক হিসেবে মান্য করতেন। আজও মন্দিরটি দেশটির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।

১৩শ শতকে ভেনিসীয় অভিযাত্রী ম্যাক্রো পোলো তার ভ্রমণবৃত্তান্তে এই অঞ্চলে অদ্ভুতভাবে জ্বলে থাকা আগুনের কথা উল্লেখ করেন। পরে ১৯শ শতকে ফরাসি সাহিত্যিক আলেকজান্ডার ডুমাস-ও অনুরূপ বর্ণনা দেন। তাদের লেখায় স্পষ্ট এই প্রাকৃতিক আগুন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভ্রমণকারীদের কৌতূহল ও বিস্ময়ের উৎস হয়ে আছে।

jagonewsবর্তমানে ইয়ানার ডাগ একটি সংরক্ষিত পর্যটন কেন্দ্র। এখানে তথ্যকেন্দ্র, জাদুঘর ও দর্শনার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট দর্শন এলাকা রয়েছে। শীতের সন্ধ্যায় কিংবা গরমের রাতে স্থানীয় মানুষ ও পর্যটকেরা কাছের চায়ের দোকানে বসে আগুনের দৃশ্য উপভোগ করেন। বাতাসে হালকা গ্যাসের গন্ধ, সামনে দাউদাউ শিখা সব মিলিয়ে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা।

প্রকৃতি, ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার অনন্য মেলবন্ধন ইয়ানার ডাগকে শুধু একটি পর্যটন স্পট নয়, বরং মানবসভ্যতার প্রাচীন বিস্ময়ের জীবন্ত দলিল করে তুলেছে। পাঁচ হাজার বছরের আগুন যেন আজও জানিয়ে দেয় প্রকৃতির কিছু রহস্য সময়ের সীমানা মানে না।

আরও পড়ুন
দেউলিয়ার পর বন্ধ হয়ে গেল ব্রিটিশদের সেই ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’
ফেব্রুয়ারি মাস কেন ২৮ দিনে হয় জানেন?

কেএসকে

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।