দেউলিয়ার পর বন্ধ হয়ে গেল ব্রিটিশদের সেই ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’
বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে নির্মম, নির্যাতনের স্মৃতির নাম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। প্রভাবশালী ব্রিটিশ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এটি, যারা বাণিজ্য করতে এসে বাংলা তথা ভারতবর্ষ দখল করে শাসন করেছে। শাসন নয় বলা যায় শোষণ করেছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নীলচাষের নির্মম ইতিহাস আজও কপালে ভাঁজ ফেলে মানুষের।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শুধু একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ছিল না; এটি ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাস, বিশ্বের বাণিজ্য ও রাজনীতির গতি-প্রকৃতি পরিবর্তনে এক বিরাট ভূমিকা পালন করেছিল। তার রাজনীতি, সামরিক অভিযান ও অর্থনৈতিক নীতি আজও ইতিহাসবিদদের আলোচ্য বিষয়। এর নাম বর্ণনা করলে উপনিবেশবাদ, বৈশ্বিক বাণিজ্য, দুর্ভিক্ষ, বিদ্রোহ ও শক্তির সংকট এই সব ইতিহাসের বড় অধ্যায় স্মরণে আসে।
সেই প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানটি এবার দ্বিতীয়বারের মতো দেউলিয়া হয়ে বন্ধ হয়ে গেল। দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার কারণে লন্ডনে বিলাসবহুল পণ্য বিক্রেতা হিসেবে শুরু করা কোম্পানিটির এই পুনর্জন্মের যাত্রা এবার থেমে গেলো। কোম্পানি দীর্ঘ ইতিহাসের পর দুইবার বন্ধ হলো, প্রথমবার ১৮৭০-এর দশকে এবং দ্বিতীয়বার ২০২৫-২৬ সালে। তবে এর নামের ঐতিহ্য ও ইতিহাস আজও বৈশ্বিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে থেকে গেছে।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও বাণিজ্যের ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। ১৬০০ সালে রানি এলিজাবেথ-১ এর রাজকীয় সনদের মাধ্যমে যাত্রা করে প্রতিষ্ঠানটি। কোম্পানিটি মৌলিকভাবে ভিন দেশে ব্যবসা পরিচালনার উদ্দেশে চালু হলেও, পরবর্তীতে এটি রাজনৈতিক শক্তি ও সামরিক ক্ষমতা অর্জন করেছিল। কোম্পানির নিজস্ব সেনাবাহিনী, কর সংগ্রহ ব্যবস্থা ও ব্যুরোক্রেটিক নিয়ন্ত্রনে ভারতসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তৃত অঞ্চল সময়ের সঙ্গে ইংরেজ শাসনের আওতায় চলে যায়।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শুধু একটি বাণিজ্য কোম্পানি ছিল না; এটি একটি শক্তিশালী কর্পোরেট সাম্রাজ্য, যেটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক ও সামরিক দায়িত্বও গ্রহণ করে নিয়েছিল। কোম্পানি ভারতীয় উপমহাদেশে প্রাধান্য বিস্তার করার পর বিভিন্ন এলাকা শাসন করে এবং স্থানীয় রাজা-নেতাদের সঙ্গে লড়াইয়ের মাধ্যমে তাদের শক্তি বৃদ্ধি করে। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর তারা বাংলার শাসনভার নেয়। তাদের শাসনামলে ভারতের ওপর চরম শোষণ চালানো হয় এবং ভয়াবহ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বা দুর্ভিক্ষে প্রায় ৩ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়।
কোম্পানির নীতি ও কর্মকাণ্ড ব্যাপক সমালোচিত ছিল। বাণিজ্য ও কর্পোরেট কাঠামোর কারণে কৃষকদের ওপর চাপ, বিশ্বায়িত অর্থনৈতিক শোষণ এবং চলমান নীতিগুলোর কারণে বহু অঞ্চলে দুর্ভোগ, দুর্ভিক্ষ ও সামাজিক অবক্ষয় দেখা গিয়েছে। ইংরেজদের শোষণের বিরুদ্ধে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ একটি বড় প্রতিক্রিয়া হিসেবে আবির্ভূত হয়।
মূল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক ক্ষমতা ১৮৫৮ সালে বিলুপ্ত হয়।ব্রিটিশ সরকার এই কোম্পানির কাছ থেকে ভারতের শাসনভার সরাসরি নিজেদের হাতে তুলে নেয়। অবশেষে ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট কোম্পানিটিকে পুরোপুরি বিলুপ্ত ঘোষণা করে।
২০০০-এর দশকে ব্রিটিশ-ভারতীয় ব্যবসায়ী সঞ্জীব মেহতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নামের মালিকানা কিনে নেন। তিনি ঐতিহাসিক ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করে ২০১০ সালে লন্ডনের মেফেয়ার এলাকায় নিউ বন্ড স্ট্রিটে ২ হাজার বর্গফুটের একটি বিলাসবহুল খুচরা ব্র্যান্ডের দোকান খোলেন। এখানে তারা প্রিমিয়াম চা, চকলেট, খাদ্যদ্রব্য, মিষ্টি, মসলা ও অন্যান্য উচ্চমানের পণ্য বিক্রি করত।
এই উদ্যোগকে অনেকেই ইতিহাস প্রতিরূপ হিসেবে দেখে, যেখানে পূর্বের শাসিত অঞ্চলের এক ব্যবসায়ী ঐতিহাসিক নামে ব্রিটিশ বাজারে ব্যবসা পরিচালনা করলেন, যা কিছুটা প্রতীকী অর্থে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। ২০১৭ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘একজন ভারতীয় এখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মালিক। এর অর্থ হলো নেতিবাচকতা ইতিবাচকতায় রূপ নিয়েছে।’
কিন্তু আধুনিক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এই পুনরুজ্জীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে কোম্পানিটি ঋণের বোঝা ও আর্থিক দুর্দশার কারণে দেউলিয়া ঘোষণা করে এবং কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। লন্ডনের সেই দোকানো এখন খালি, তাদের ওয়েবসাইটও বন্ধ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানিটি তাদের মূল গ্রুপের কাছে ৬ লাখ পাউন্ডের বেশি (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৯.৮ কোটি টাকা) দেনা রয়েছে। এছাড়া কর বাবদ প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার পাউন্ড এবং কর্মীদের বেতন বাবদ ১ লাখ ৬৩ হাজার পাউন্ড বকেয়া রয়েছে। এছাড়া সঞ্জীব মেহতা-এর অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোও এরই মধ্যে বন্ধ বা দেউলিয়া হওয়ার পথে রয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি, ইন্ডিয়া টুডে
আরও পড়ুন
তিস্তার চরে স্বপ্নের আলো জ্বালাচ্ছে ‘লালমনি বিদ্যাপীঠ’
শোলার তৈরি ফুলেই সংসার চলছে রেখা বিশ্বাসের
কেএসকে