নাড়ির টানে ঘরে ফেরা, ঈদযাত্রার অনন্য আবেগ

মোহাম্মদ সোহেল রানা
মোহাম্মদ সোহেল রানা মোহাম্মদ সোহেল রানা , গণমাধ্যমকর্মী ও ফিচার লেখক
প্রকাশিত: ০৯:৪৬ এএম, ১৭ মার্চ ২০২৬
ছবি: মোহাম্মদ সোহেল রানা

ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই প্রিয়জনের কাছে ফিরে যাওয়ার গভীর আকাঙ্ক্ষা। বছরের অন্য সময় জীবিকার তাগিদে কিংবা নানা কারণে যারা পরিবার থেকে দূরে থাকেন, ঈদের সময় এলেই তাদের মন ছুটে যায় শেকড়ের টানে গ্রামের বাড়ির দিকে। এ সময় সড়ক, রেলপথ ও নৌপথজুড়ে নামে ঘরমুখো মানুষের ঢল। রাজধানীসহ দেশের বড় বড় শহর থেকে লাখো লাখো মানুষ নাড়ির টানে ছুটে চলেন।

ঈদের অন্তত এক সপ্তাহ আগে থেকেই শুরু হয় বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি। পরিবারের জন্য কেনাকাটা, টিকিট সংগ্রহ-সব মিলিয়ে কর্মব্যস্ত মানুষের দিন কাটে এক অন্যরকম ব্যস্তায়। ভোররাত থেকেই বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন কিংবা লঞ্চঘাটে বাড়তে থাকে বাড়ি ফেরা মানুষের ভিড়। এই যাত্রাপথে থাকে টিকিট পাওয়ার সংগ্রাম, দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি; আবার থাকে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার আনন্দও।

jagonewsঈদযাত্রায় অনেকের প্রথম পছন্দ ট্রেন। নিরাপদ ও আরামদায়ক হওয়ায় ট্রেনের টিকিটের জন্য অনলাইনে শুরু হয় তীব্র প্রতিযোগিতা। নির্ধারিত সময়ের আগেই হাজারো মানুষ মোবাইল বা কম্পিউটারের সামনে অপেক্ষা করেন একটি টিকিটের আশায়। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব টিকিট শেষ হয়ে যাওয়ায় অনেকেই হতাশ হয়ে পড়েন। কেউ কেউ আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন টিকিটের জন্য। আর টিকিট হাতে পেলে মনে হয় বাড়ি ফেরার নিশ্চয়তাটা যেন সত্যিই হাতে ধরা দিল।

ট্রেনযাত্রার আরেকটি আলাদা আনন্দও আছে। ট্রেনের ভেতরেই যেন তৈরি হয় এক ছোট্ট উৎসবের পরিবেশ। সহযাত্রীরা গল্পে মেতে ওঠেন, কেউ গান শোনেন, কেউবা সঙ্গে আনা খাবার ভাগাভাগি করেন। অনেক সময় দেখা যায়, অচেনা মানুষও কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়ে ওঠেন আপনজনের মতো। দীর্ঘ পথ তখন হাসি আর আড্ডার মধ্যেই কেটে যায়।

অন্যদিকে, যারা ট্রেনের টিকিট পান না বা যেসব অঞ্চলে ট্রেনের সুবিধা নেই, তাদের ভরসা হয়ে ওঠে বাস। রাজধানীর বিভিন্ন বাস টার্মিনালে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত লেগেই থাকে যাত্রীদের ভিড়। কারো হাতে বড় ব্যাগ, কারো হাতে নতুন কাপড় বা উপহার সামগ্রী। অনেক পরিবারের সঙ্গে থাকে ছোট ছোট শিশুও। সড়কে দীর্ঘ যানজট থাকলেও বাড়ি ফেরার আনন্দে সেই কষ্ট যেন অনেকটাই ভুলিয়ে দেয়।

jagonewsনদীপথের ঈদযাত্রারও রয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। ঈদের সময় সদরঘাটসহ বিভিন্ন লঞ্চঘাটে দেখা যায় উৎসবমুখর পরিবেশ। মানুষের ঢলে মুখর হয়ে ওঠে ঘাট। কেউ লঞ্চের ডেকে বসে নদীর শীতল বাতাস উপভোগ করেন, কেউ পরিবারের সঙ্গে গল্পে মেতে ওঠেন। রাতভর নদীপথে চলতে চলতে ঢেউয়ের শব্দ আর বাতাসের ছোঁয়া ভ্রমণকে ভরিয়ে তোলে অন্যরকম অনুভূতিতে। অনেকের কাছেই এই লঞ্চযাত্রা ঈদভ্রমণের সবচেয়ে উপভোগ্য অংশ।

এসব যানবাহনের পাশাপাশি অনেকেই কাভার্ডভ্যান, পিকআপ কিংবা ট্রাকেও করে বাড়ি ফেরেন। সময় মতো গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য তারা এসব পণ্যবাহী যানেও যাত্রা করেন, তবে এতে ঝুঁকিও রয়েছে। আবার অনেকেই স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভেবে নিজের ব্যক্তিগত গাড়িতে পরিবারসহ গ্রামের বাড়ির পথে রওনা দেন।

তবে ঈদযাত্রা সব সময় খুব সহজ হয় না। দীর্ঘ যানজট, অতিরিক্ত ভিড়, কখনো দেরিতে যানবাহন ছাড়ার মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় যাত্রীদের। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষাও করতে হয়। তবুও বাড়ি ফেরার তাগিদে এসব কষ্ট যেন তুচ্ছ হয়ে যায়। কারণ গ্রামের বাড়িতে অপেক্ষা করেন মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান, দাদা-দাদি, আত্মীয়স্বজন আর শৈশবের স্মৃতিমাখা সেই চেনা পরিবেশ।

jagonewsবাড়ি ফেরার পথে অনেকেই মনে ভেসে ওঠে নানা স্মৃতি। ছোটবেলার ঈদ, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা, গ্রামের মাঠে ছুটে বেড়ানো- এসব ভাবতেই মন ভরে ওঠে আনন্দে। কেউ কেউ দীর্ঘদিন পর গ্রামের বাড়িতে ফিরছেন বলে ভেতরে ভেতরে বাড়তি উচ্ছ্বাস অনুভব করেন। সব মিলিয়ে ঈদকে ঘিরে এই ঘরমুখো যাত্রা হয়ে ওঠে এক অনন্য আবেগের গল্প।

ঈদযাত্রার আরেকটি আনন্দঘন দিক হলো পরিবারের জন্য কেনাকাটা নিয়ে বাড়ি ফেরা। শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় নতুন কাপড়, মিষ্টি, খেলনা কিংবা নানা উপহার। বিশেষ করে শিশুদের জন্য থাকে আলাদা আয়োজন। এসব উপহার নিয়ে বাড়িতে পৌঁছানোর মুহূর্তটি হয়ে ওঠে গভীর আবেগে ভরা।

ঈদযাত্রা শুধু একটি ভ্রমণ নয়; এটি এক গভীর আবেগের নাম। প্রতি বছর লাখো লাখো মানুষ নানা বাধা পেরিয়ে বাড়ি ফেরেন, কারণ প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিলেই তা হয়ে ওঠে পূর্ণ। এভাবেই ঈদযাত্রা হয়ে ওঠে আনন্দ, আবেগ আর ফিরে পাওয়ার এক অনন্য গল্প- যেখানে সব কষ্টকে ছাপিয়ে জয়ী হয় নাড়ির টান।

আরও পড়ুন
রমজানে ভিন্ন ছন্দ মালিনীছড়া চা বাগানে
মাঝরাতে জমে ওঠে ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বেনারসির হাট

কেএসকে

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।