ভেজা সন্ধ্যা আর ঈদ আনন্দ
এখন ঈদ দুই প্রকার। ছোটবেলার ঈদ আর বড়বেলার ঈদ। শৈশবে আনন্দের মাঝে সময় কেটে যেতো, বড় হয়ে উপলক্ষ তৈরি করে আনন্দ পেতে হয়। আমার ঈদ শুরু হয় চন্ডিবের সুমন মোল্লা ভাইয়ের বাসা থেকে। একদিকে উনার সহধর্মিণী ওয়াহিদা আমিন পলি আমাদের খাওয়াতে বেশ ভালোবাসেন আরেকদিকে সুমন ভাই সালামি দিতে ভালোবাসেন। সেখানে সবার সঙ্গে দিনভর আড্ডা চলে, তারপর চলে যাই ছয়সূতি আমার স্ত্রী প্রিয়াংকার নানুবাড়ি। এভাবে এবারের ঈদ কেটে গেলো। তারপর যেন বাসায় বন্দী, কোনো কাজ নেই, শুধু খাওয়া আর ঘুম। এভাবে দুইদিন কেটে যাওয়া পর নাফিসের ফোন-
-চলেন বের হই, আর ভালো লাগছে না বাসায়।
-মনের কথা বললে। কোথায় যাওয়া যায়।
-ব্রিজের দিকে আসেন।
-ঠিক আছে।
প্রতিবছর ঈদ উপলক্ষে ভৈরবের সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতু (স্থানীয়ভাবে আমরা বলি মেঘনা ব্রিজ) এখানে যেন আনন্দের এক মিলনমেলা বসে। তিন সেতুর নিচে একত্রিত হন নানা জায়গার মানুষ, কেউ পরিবার নিয়ে, বন্ধুবান্ধব নিয়ে কেউবা প্রিয় মানুষকে নিয়ে। একসময় শুধু ঝালমুড়ি আর বুট বাদাম পাওয়া যেতো, কিন্তু এখন বেশ কয়েকটি ফুড কার্ট, নানা ধরণের চায়ের দোকান দর্শনার্থীদের চাহিদা মেটাচ্ছে। প্রিয়াংকাকে নিয়ে রওনা হলাম ব্রিজের দিকে। তিন রাস্তার মোড় থেকে প্রিয়াংকা কিনে নিলো ১০ টাকার বাদাম। তারপর বলল-
-হেঁটে হেটে বাদাম খাই কি বল?
-ঠিক আছে।
বলার পর কিছুক্ষণ হেঁটে রিকশা নিয়ে নিলাম। প্রিয়াংকা অভিমান করলো। অবশেষে পোঁছালাম ব্রিজে।
প্রিয়াংকা: আমরা এই প্রথম দুজনে ব্রিজে এসেছি তাইনা?
আমি: হ্যাঁ ঠিক বলেছো। অন্যরকম লাগছে।
আরও পড়ুন:
বাসার খুব কাছেই মেঘনা ব্রিজ। এর আগে কোনো উপলক্ষ কিংবা সবার সঙ্গে আসা হয়েছে, আমরা দুজনে এই প্রথম এলাম। আমার ভেতর অন্যরকম একটা আনন্দের অনুভূতি কাজ করছে। আমরা গিয়ে বসলাম ছোটভাই ইফতির ‘কাবাব ঘর’ এ। নদীর ঢেউ, শীতল হাওয়া, ভেজা বাতাসের ঘ্রাণ, গাছের পাতার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে নতুন চাঁদ, সবমিলিয়ে চমৎকার আবহ তৈরি করলো। কিছুক্ষণ পর যুক্ত হলো নাফিস, আদিব এবং আনাস। কাবাব ঘরের বিখ্যাত কাবাব আর তেলবিনুন রুটি খাওয়া পর আদিব বায়না করলো মিটবক্স খাবে।
রিকশা নিয়ে চললাম বাজারের দিকে আদিবের বায়না মেটাতে। গন্তব্য বোমপট্টিতে অবস্থিত ফুডকার্ট গুলো। এই জায়গাটাতেও বেশ কয়েকটি ফাস্ট ফুডের কার্ট হয়েছে। দিন দিন কার্ট গুলোর সংখ্যা যেন বাড়ছে, এখানে এলে আমার ঢাকার কথা মনে হয়। আজ প্রতিটি কার্টের সামনে লোকসমাগম অনেক। আমরা গিয়ে বসলাম ছোটভাই রাজনের ক্রেভিংসে। এখানে যোগ দিলো মোশারফ রাব্বি। রাব্বির গানের গলা বেশ। প্রায়ই আমাদের গান শোনায়। মিটবক্স আসা মাত্রই আদিব যেন একেবারে লুফে নিলো। ওর আগ্রহ নিয়ে খাওয়া দেখতে খুব ভালো লাগছে। আমাদের আড্ডা জমে উঠলো। আকাশের মেঘের গুঞ্জন আর বিদ্যুতের ঝলকানি মনে করিয়ে দিলো বাসায় যেতে হবে।
নাফিস আর আদিবকে রিকশা করে দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম পুলের তলের বাজারের দিকে। এখানে সন্ধ্যার পর সবজি আর মাছের বাজার জমে উঠে। এই জায়গার আরেকটি নাম ‘মনা মরা ব্রিজ’ এমন নামকরণের কারণ এখানে মনা নামের কেউ একজন ব্রিজ থেকে পড়ে মারা গিয়েছিল সেই থেকে এই জায়গার নাম। বাজারে ঢুকা মাত্রই শুরু হলো প্রবল বর্ষণ। দোকানিরা জিনিসপত্র রেখেই আশ্রয় নিলো নিরাপদ জায়গায়।
ব্যস্ত বাজার মুহূর্তেই যেন নীরব হয়ে গেলো, শোনা যাচ্ছে শুধু মেঘের গর্জন আর বৃষ্টির শব্দ, মাঝে মাঝে কয়েকটা রিকশা আর গাড়ি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে। এর মাঝেই প্রিয়াংকা কিনে নিলো ৬ কেজি ওজনের বিগ্রেড মাছ আর পুঁইশাক। বৃষ্টি কমে এলো। বৃষ্টি হবার পর বাতাসের গন্ধ আমার মন ভালো করে দেয়, বুক ভরে সেই বাতাস টানতে টানতে আমরা চললাম বাড়ির দিকে। ভেজা সন্ধ্যার ঈদ আনন্দ মনে থাকবে অনেকদিন।
লেখক: নাহিদ হোসাইন
শিক্ষক, ব্লু বার্ড স্কুল, ভৈরব, কিশোরগঞ্জ
জেএস/