খেয়াঘাটেই আটকে যায় ওদের স্বপ্ন

জুনাইদ আল হাবিব
জুনাইদ আল হাবিব জুনাইদ আল হাবিব
প্রকাশিত: ০৩:১০ পিএম, ২২ ডিসেম্বর ২০১৮

প্রতিদিনের সংগ্রাম ওদের স্কুলে যাওয়া। আবার বাড়ি ফিরে আসা। তবে রাস্তা আছে কিন্তু সেতু দূরের কথা, একটা সাঁকোও নেই! তাই নিরুপায় মাধ্যম খেয়া। খাল পার হয়েই যেতে হয় স্কুলে। এই চিন্তা যখন সুমি, হাবিব, রাসেল, সুমন, মেহেদির মাথায় ঘুরপাক খায়, তখন ওরা ৫ টাকার ভাড়ায় খাল পার হয়। খাল পেরিয়ে কেউ স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, কেউবা প্রাইমারি স্কুলের পাঠ চোকাতে যায়।

প্রতিদিন খেয়াঘাটে নৌকা নিয়ে মাঝি তাদের জন্য অপেক্ষা করে। বিনিময়ে তার পেট চলে। কখনও কখনও তিনি থাকেন না। তখন বৈঠা অথবা বাঁশ দিয়ে ওরাই খেয়ার মাঝি হয়। ওরা যখন মাঝি, তখন টাকা লাগে না। আবার এমনটাও নয় যে, মাঝি জোর করে ভাড়া আদায় করেন। যার কাছে আছে, সে দেয়। খেয়া নৌকার টাকা মাঝি চায়ের খরচ বা খেয়া মেরামতের জন্য ব্যয় করেন। দু’মুঠো ভাতের জন্য এ আয় যথেষ্ট নয়। তিনি যখন খেয়াঘাটে নেই, তখন সবাই বুঝে নেয়- তিনি ছোট-খাটো ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।

kheya-in

প্রতিদিনের এই দুর্ভোগ দেখেও একটি সেতুর উদ্যোগ মিলছে না। অভিভাবকরা বহুবার দাবি করেছে, এখানে একটি সেতু করার জন্য। সেতুর জন্য গ্রামবাসী আজও অপেক্ষা করছেন। সংকটের এই চিত্রটি উপকূলের মেঘনাতীরের জনপদ চাঁদপুরের হাইমচরের চর ভৈরবী খেয়াঘাটের। একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চল হওয়াতে কারো চোখ পড়ছে না এদিকে।

> আরও পড়ুন- নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবতার দেয়াল

নতুন প্রজন্ম রীতিমতো বই, খাতা, কলম বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেয়ায় চড়ে খাল পেরোয়। এমন দৃশ্য এখানে বহু প্রশ্নের জন্ম দেয়। কবে মিলবে সেতু? খেয়ায় চড়ে খাল পেরিয়ে পাঠশালায় যায় চর ভৈরবী ইউনিয়নের এমজেএস বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, চর ভৈরবী উচ্চ বিদ্যালয়, চর ভৈরবী গাউছুল আজম ছবরিয়া দাখিল মাদ্রাসাসহ চার-পাঁচটি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থী।

এমজেএস বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী সুমি আক্তার। সামনেই তার এসএসসি পরীক্ষার লড়াই। সে লড়াইয়ের মাঝে রোজ এ প্রকৃতির সাথে লড়াই করে তাকে স্কুলে যেতে হয়, ফিরতে হয়। তার প্রশ্ন, ‘এ সমস্যা থেকে আমরা কবে রেহাই পাবো? আমরা তো সব সময় এভাবেই খাল পার হই। জোয়ারের পানি বেশি থাকলো তো আরও সমস্যা। সেতু আছে অনেক দূরে। বেড়ির রাস্তায় উঠতে অনেক ঘুরতে হবে। তাই আমরা সংক্ষেপে সারি।’

kheya-in

চর ভৈরবী উচ্চ বিদ্যালয়ের হাবিব রহমান। স্কুলের পথ ধরাসহ নানা কাজেই তাকে আসতে হয় চর ভৈরবী বাজারে। বাজারে আসতে সহজ উপায় খেয়া চড়া। এক মিনিটের খেয়ার পথ। তাই সে এ প্রন্থাই অবলম্বন করে। নিজের প্রতিক্রিয়া জানায় এভাবে, ‘শহরের ছেলে-মেয়েরা কত সুন্দরভাবে পড়তে যেতে পারে। আমাদের কপালে তা নেই। তাদের থেকে আমাদের পড়াশোনাটা অনেক কষ্টের। এই যে একটা খাল পার হতে আমাদের খেয়ায় উঠতে হয়। আমাদের উন্নত কোন যাতায়াত ব্যবস্থা নেই।’

> আরও পড়ুন- রোভার মুটের শতবর্ষে অংশ নিলো ২ হাজার স্কাউট

এমজেএস বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সরদার মো. মাহবুব জাগো নিউজকে বলেন, ‘কত চাপ সামলাবো? আমার স্কুল পরপর কয়েকবার নদীতে ভেঙে গেছে। আবার স্কুল দাঁড় করিয়েছি। স্কুলের খরচ থেকে শিক্ষার্থীদের চলাচলের জন্য রাস্তা মেরামত করেছি। আমাদের তো অঢেল অর্থ নেই। এমন হাজারো সমস্যায় জর্জরিত আমাদের ছাত্র-ছাত্রীরা। স্কুলের ফলাফলও জেলার শীর্ষে। আশা করি, এ সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্টরা এগিয়ে আসবেন।’

এসইউ/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :