জানেন কি সোনা আসলে পৃথিবীর নয়

ফিচার ডেস্ক
ফিচার ডেস্ক ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২:৩০ পিএম, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

সোনা আমরা খুঁজি মাটির গভীরে, খনির অন্ধকারে আর পাহাড়ের বুকে। তাই অনেকেরই ধারণা সোনা বুঝি এই পৃথিবীরই সম্পদ। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। আপনার হাতে থাকা সোনার গয়না কিংবা ব্যাংকের ভল্টে রাখা সোনার বার এর কোনোটিরই জন্ম এই গ্রহে হয়নি। সোনার উৎপত্তি হয়েছিল পৃথিবীর জন্মের বহু আগে, মহাকাশের গভীরে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ নক্ষত্রবিস্ফোরণে। কোটি কোটি বছর ধরে মহাবিশ্ব পেরিয়ে সেই সোনা একদিন এসে জমা পড়েছে পৃথিবীর বুকে। আজ আমরা যে সোনাকে মূল্যবান ধাতু বলে জানি, তা আসলে মহাকাশের এক প্রাচীন ধ্বংসযজ্ঞের স্মৃতি।

সহজ কথায় বললে, সোনা হলো মহাবিশ্বের এক প্রাচীন বিপর্যয়ের স্মারক। কোটি কোটি বছর আগে ঘটে যাওয়া এক ভয়ংকর মহাজাগতিক ঘটনার ছাই থেকেই জন্ম নিয়েছে আজকের এই ঝলমলে ধাতু। কিন্তু ঠিক কীভাবে? চলুন, গল্পটা শুরু করা যাক মহাবিশ্বের একদম শুরুর দিক থেকে।

জানেন কি সোনা আসলে পৃথিবীর নয়মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছিল বিগ ব্যাং নামের এক বিশাল বিস্ফোরণের মাধ্যমে। সেই শুরুর সময়ে চারদিকে ছিল শুধু হাইড্রোজেন আর হিলিয়াম গ্যাস। ভারী কোনো মৌল, সোনা তো দূরের কথা তখনো অস্তিত্বেই আসেনি।

এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জন্ম নিতে থাকে নক্ষত্র। এই নক্ষত্রগুলোই আসলে মহাবিশ্বের প্রথম কারখানা। সূর্যের মতো প্রতিটি নক্ষত্র তার ভেতরে বহন করে এক বিশাল পারমাণবিক চুল্লি, যেখানে প্রচণ্ড তাপ ও চাপে এক মৌল রূপ নেয় অন্য মৌলে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় নিউক্লিয়ার ফিউশন।

নক্ষত্রের ভেতরের সীমাবদ্ধতা

একটি নক্ষত্র তার জীবনের শুরুতে হাইড্রোজেনকে পোড়ায়, তৈরি করে হিলিয়াম। পরে হিলিয়াম থেকে তৈরি হয় কার্বন, অক্সিজেন এভাবে একের পর এক তুলনামূলক ভারী মৌল। কিন্তু এই ধারাবাহিকতার একটা শেষ আছে। নক্ষত্রের ভেতরে ফিউশন প্রক্রিয়া লোহার কাছে এসে থেমে যায়।

কারণ লোহার আগে পর্যন্ত মৌল তৈরি করতে গিয়ে শক্তি উৎপন্ন হয়। কিন্তু লোহা তৈরি হলে উল্টো শক্তি খরচ হয় নতুন শক্তি আর পাওয়া যায় না। ফলে নক্ষত্রের ‘জ্বালানি উৎপাদনের ইঞ্জিন’ তখন বন্ধ হয়ে যায়।

আর সোনা? লোহার তুলনায় অনেক বেশি ভারী ও জটিল একটি মৌল। তাই সাধারণ কোনো নক্ষত্রের ভেতরে সোনা তৈরি হওয়া অসম্ভব।

তাহলে সোনা এল কোথা থেকে?

নক্ষত্রের জীবনের শেষ অধ্যায়েই ঘটে সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনা। সূর্যের চেয়ে অনেক বড় কোনো নক্ষত্র যখন তার জ্বালানি ফুরিয়ে ফেলে, তখন নিজেরই মহাকর্ষের চাপে ভেতরের দিকে ধসে পড়তে থাকে। এই ধসের শেষ পরিণতি হলো এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ সুপারনোভা।

জানেন কি সোনা আসলে পৃথিবীর নয়

মাত্র কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হলেও, এই বিস্ফোরণের শক্তি কল্পনাতীত। সেই সময় ঘটে এক বিশেষ প্রক্রিয়া, যার নাম নিউট্রন ক্যাপচার। প্রচণ্ড শক্তির কারণে লোহার পরমাণুর ওপর অগণিত নিউট্রন আছড়ে পড়ে এবং খুব দ্রুত সেগুলো ভারী মৌলে রূপান্তরিত হয়। এইভাবেই জন্ম নেয় সোনা, প্লাটিনাম কিংবা ইউরেনিয়ামের মতো মৌল। সুপারনোভার ধাক্কায় এসব ধাতু মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে ধূলিকণার মতো। তবে এখানেই গল্প শেষ নয়।

সোনার আসল খনি লুকিয়ে আছে কিলোনোভায়

একসময় বিজ্ঞানীরা ভাবতেন, সুপারনোভাই ভারী মৌল তৈরির প্রধান উৎস। কিন্তু হিসাব মিলছিল না। মহাবিশ্বে যে পরিমাণ সোনা আছে, শুধু সুপারনোভা দিয়ে তার ব্যাখ্যা দেওয়া যাচ্ছিল না। তখনই সামনে আসে আরও ভয়ংকর এক ঘটনা নিউট্রন স্টারের সংঘর্ষ।

বিশাল কোনো নক্ষত্র সুপারনোভা হয়ে ধ্বংস হলে তার কেন্দ্রে থেকে যায় এক অতি ঘন অবশিষ্টাংশ, যাকে বলা হয় নিউট্রন স্টার। এর ঘনত্ব এত বেশি যে এক চামচ উপাদানের ওজন হতে পারে কোটি কোটি টন।

কখনো কখনো মহাকাশে দুটি নিউট্রন স্টার একে অপরের চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে শেষ পর্যন্ত সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এই ঘটনাকেই বলা হয় কিলোনোভা। এই সংঘর্ষের সময় তাপমাত্রা ও চাপ এমন মাত্রায় পৌঁছায়, যেখানে মুহূর্তের মধ্যেই ঘটে র‍্যাপিড নিউট্রন ক্যাপচার প্রসেস। ফলাফল অবিশ্বাস্য পরিমাণ সোনা, রুপা ও প্লাটিনামের জন্ম।

জানেন কি সোনা আসলে পৃথিবীর নয়

বিজ্ঞানীদের মতে, একটি মাত্র কিলোনোভা বিস্ফোরণ থেকে যে পরিমাণ সোনা ছড়িয়ে পড়ে, তা দিয়ে পৃথিবীর মতো একাধিক গ্রহ বানানো সম্ভব। তবে প্রশ্ন হলো এই সোনা তো মহাকাশেই তৈরি হলো। পৃথিবীর মাটির নিচে এল কীভাবে?

প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে পৃথিবী যখন তৈরি হচ্ছিল, তখন এটি ছিল একটি উত্তপ্ত গলিত গোলক। চারপাশের মহাকাশ থেকে আসা ধূলিকণা, পাথর আর গ্যাস জমেই তৈরি হয়েছিল এই গ্রহ। সেই ধূলিকণার সঙ্গেই মিশে ছিল সুপারনোভা ও কিলোনোভা থেকে আসা সোনার কণা।

কিন্তু তখন পৃথিবী গলিত থাকায় ভারী ধাতুগুলো লোহার সঙ্গে সোনা ডুবে গিয়েছিল গ্রহের গভীরে, কেন্দ্রের দিকে। অর্থাৎ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সোনার ভান্ডার আজও আমাদের নাগালের বাইরে।

তাহলে আমরা যে সোনা পাই, সেটা এল কোথা থেকে?

পৃথিবী ঠান্ডা হয়ে শক্ত হওয়ার অনেক পরে, প্রায় ৪০০ কোটি বছর আগে ঘটে এক ভয়াবহ অধ্যায় লেট হেভি বোম্বার্ডমেন্ট। এই সময় অসংখ্য গ্রহাণু ও উল্কাপিণ্ড পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে।

আরও পড়ুন: 

এসব উল্কাপিণ্ড বয়ে এনেছিল বিপুল পরিমাণ সোনা ও অন্যান্য ভারী ধাতু। যেহেতু তখন পৃথিবীর ওপরের স্তর শক্ত ছিল, তাই এই সোনা আর কেন্দ্রে ডুবে যেতে পারেনি। ছড়িয়ে পড়ে ভূত্বকের কাছাকাছি। আজ আমরা খনি খুঁড়ে যে সোনা তুলছি, তার বড় অংশই আসলে সেই প্রাচীন উল্কাপিণ্ডের দেওয়া উপহার।

এই গল্প শুধু কল্পনা নয়। ২০১৭ সালে বিজ্ঞানীরা এর শক্ত প্রমাণ পান। লাইগো ও ভার্গো ডিটেক্টর ব্যবহার করে শনাক্ত করা হয় দুটি নিউট্রন স্টারের সংঘর্ষ থেকে আসা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ যার নাম দেওয়া হয় জিডব্লিউ১৭০৮১৭ (GW170817)।

পরবর্তীতে হাবলসহ বিভিন্ন শক্তিশালী টেলিস্কোপ ওই বিস্ফোরণের আলো বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত করে, সেখানে বিপুল পরিমাণ সোনা ও প্লাটিনাম তৈরি হয়েছে। হিসাব বলছে, ওই একটি সংঘর্ষে উৎপন্ন সোনার ভর ছিল পৃথিবীর ভরের কয়েক গুণ!

জানেন কি সোনা আসলে পৃথিবীর নয়

সোনা মানে মৃত নক্ষত্রের স্মৃতি

একসময় রসায়নবিদেরা লোহা বা সিসা থেকে সোনা বানানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন। তারা জানতেন না সোনা বানানোর ক্ষমতা মানুষের নয়। এই ক্ষমতা কেবল মহাবিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর।

তাই আজ যখন আপনি সোনার গয়না পরেন, সেটিকে শুধু বিলাসিতা ভাববেন না। ওটা কোনো এক মৃত নক্ষত্রের শেষ নিশ্বাস, কোটি কোটি বছর আগের এক বিস্ফোরণের স্মারক।

মহাকাশের ধ্বংসস্তূপ থেকে উল্কাপিণ্ডে চড়ে পৃথিবীতে এসে, হাজারো পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে শেষ পর্যন্ত আপনার হাতে পৌঁছেছে ভাবলেই গা শিউরে ওঠে, তাই না?

তথ্যসূত্র: নাসা, লাইগো ল্যাব, স্পেস ডটকম ও বিবিসি সায়েন্স ফোকাস

জেএস/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।