রাগ কমাতে চাইলে কী করবেন?

ফিচার ডেস্ক
ফিচার ডেস্ক ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:২০ এএম, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

শেখ আনোয়ার

‘রাগ থেকে রোগ হয়’ কথাটি আপাতঃ দৃষ্টিতে মজার শোনালেও রাগের সঙ্গে রোগের যে একটা অদৃশ্য বন্ধন রয়েছে এবং এ বন্ধন যে মাঝেমধ্যেই মারাত্মক রূপ ধারণ করতে পারে, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। করোনাকালে মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন আসায় ও কাজের চাপ অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় রাগের প্রবণতাও পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। রাগকে আমরা একটা মানসিক আবেগ হিসেবে চিহ্নিত করলেও রাগের উৎপত্তি ঘটে মূলত মস্তিষ্কে। যা পরবর্তীতে প্রভাব ফেলে শরীর ও মনে। তাই রাগ করার হাজারটা কারণ থাকা সত্ত্বেও যারা রাগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন তারাই প্রকৃত বুদ্ধিমান।

এবার জেনে নেওয়া যাক, রাগ কেন পায়? আমাদের মস্তিষ্কের এক বিশেষ অঞ্চল লিম্বিক সিস্টেম। মাস্টার গ্ল্যান্ড বা পিট্যুইটারি আর হাইপোথ্যালামাসের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে লিম্বিক হাইপোথ্যালামাস পিট্যুইটারি অ্যাক্সিস। এ অ্যাক্সিসের বৃদ্ধির কারণেই সৃষ্টি হয় ক্রোধ বা রাগ। রাগ, দুঃখ, ভয়ের পেছনেই রয়েছে মূলত দু’টো নিওরো-হরমোনের নির্দিষ্ট মাত্রার ওঠা-নামা। হরমোন দু’টো হলো- অ্যাড্রিনালিন ও এরঅ্যাড্রিনালিন। এদের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় মানুষ রেগে ওঠে। আর ক্রমাগত চাপা রাগ এ দুই হরমোনের মাত্রা আরও উর্ধ্বমুখী করে তোলে।

জ্বি হ্যাঁ। রেগে গেলে আমাদের শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। নাড়ির গতি ও নিশ্বাস-প্রশ্বাসের হার স্বাভাবিকের তুলনায় দ্রুত হতে থাকে। এর সঙ্গে সঙ্গে কথা বলার ধরন এবং কণ্ঠস্বরের মধ্যেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। মূলত হঠাৎ করে রক্তচাপ বেড়ে বা কমে যাওয়ার জন্যই এসব শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। অনেক সময় হৃৎকম্পন বেড়ে গিয়ে হার্ট অ্যাটাক ও সেরিব্রাল অ্যাটাকের সম্ভাবনা থাকে। এ ছাড়া রাগ যাদের প্রতিদিনের সঙ্গী অর্থাৎ কথায় কথায় যারা রাগ করে বসেন, তাদের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী কিছু রোগ যেমন- মাইগ্রেন, ডায়েরিয়া ইত্যাদি দেখা দেয়। শুধু তা-ই নয়, অ্যাজমা, বাত, ডায়াবেটিস, কুষ্ঠ রোগীরা রাগের ব্যাপারে সাবধান। কারণ আপনার অতিরিক্ত রাগ এসব রোগের মাত্রা অনেকাংশেই বাড়িয়ে তুলতে পারে।

অতিরিক্ত রাগের কারণে পারসোন্যালিটি ডিজ অর্ডার দেখা দিতে পারে। এ ধরনের রোগীদের আচরণে অ-সামঞ্জস্যতা লক্ষ্য করা যায়। যে বিষয় নিয়ে রাগ করার কোনো কারণ নেই সেই বিষয়গুলো নিয়েও এরা রাগারাগি করে থাকেন। মাঝেমধ্যে এদের রাগ রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। রাগের ফলে অনেকের মধ্যেই বিষণ্নতা কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে রাগটা হয়তো নিজের ওপর হতে থাকে, কিন্তু প্রকাশটা হয় অন্যের ওপর। বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশনের কারণেও রাগ বা খিটখিটে মেজাজ দেখা দিতে পারে। অনেক সময় রাগ চেপে রাখতে রাখতে মানসিক সমস্যা দেখা যায়। এসব রোগীরা ছোটখাটো বিষয় নিয়ে অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে। এদের মধ্যে মনঃসংযোগের ক্ষমতা কমে যায় ও অস্থিরতা বেড়ে যায়। অনেকে রাগ করে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেন। আবার উল্টোটাও দেখা যায় অর্থাৎ কিছু কিছু রাগী মানুষের খাওয়ার পরিমাণ বেড়ে যায়। যেমন- অনেক ডায়বেটিস রোগী রেগে গেলে নিষিদ্ধ খাবার বেশি খেয়ে ফেলেন। রাগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে মানুষের মধ্যে অসংযমী আচরণ বৃদ্ধি পায়। ফলে গালি-গালাজ, জিনিসপত্র ভাঙচুর, অন্যদের মারধর, এমনকি নিজের ওপর রাগ করে আত্মহত্যা ও খুন করার প্রবণতাও দেখা দিতে পারে।

রাগ কমাতে চাইলে কী করবেন?
যখনই রাগের ব্যারোমিটারটা বাড়তে শুরু করবে; তখন এক থেকে একশ উল্টোভাবে গুনতে শুরু করবেন। অর্থাৎ একশ, নিরানব্বই, আটানব্বই এভাবে এক পর্যন্ত গুনুন। চাহিদা পূরণ না হলেই সাধারণত রাগের সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে আপনার চাহিদা যদি হয়, ছেলেকে ক্লাসে সব সময় ফার্স্ট হতে হবে, বাড়ির সবাই আপনার নির্দেশমতো চলবে, মা-বাবাকে ভুলে গিয়ে স্বামী শুধু আপনার কথা ভাববে। শিক্ষিত ও যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও বাড়ির বউ চাকরি করতে পারবে না ইত্যাদি। তাহলে বুঝতে হবে, আপনার এ চাহিদাগুলো মোটেই যৌক্তিক নয়। তাই এসব অযৌক্তিক চাহিদা পূরণ না হলে এসব নিয়ে রাগ করা নেহায়েত বোকামি ছাড়া কিছু নয়। কাজেই নিজের অপূর্ণ চাহিদাগুলো কতটুকু যৌক্তিক, তা আগে বিচার করুন। এরপর রাগকে প্রশ্রয় দিন।

রাগ যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে শুরু করে; তখন ‘মুন্না ভাই এমবিবিএস’র ড. খোড়ানার মতো ‘হাসি থেরাপি’ কাজে লাগাতে পারেন। অর্থাৎ রাগের মাত্রা বেড়ে যাওয়া মাত্রই হাসতে শুরু করে দিন। এতে আর যা-ই হোক, আগুনে ঘি ঢালার মতো রাগের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। মিউজিক থেরাপি রাগ প্রশমনের ওষুধ হিসেবে অনেক সময় কাজ করে। তাই রাগ দেখা দিলে ধীর লয়ের মিউজিক শুনতে শুরু করুন। একসময় দেখবেন সব রাগ পানি হয়ে গেছে। কথায় বলে, ‘অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা’। অলস মস্তিষ্ক অনেক ক্ষেত্রে রাগের উৎস হিসেবেও পরিগণিত হয়। তাই সব সময় কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করুন। নিজের মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় থাকা শখগুলো (যেমন- বাগান করা, ছবি আঁকা, গান শেখা) নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করুন। এসব শখ আপনার মধ্যে আত্মতৃপ্তি বোধ তৈরিতে সহায়তা করবে ও অহেতুক রাগ থেকে আপনাকে রক্ষা করবে।

করোনার সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ভুগছেন সবাই। সেটাই স্বাভাবিক। এই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থেকে মনের ওপর তৈরি হয় বাড়তি চাপ। আতঙ্ক, অহেতুক রাগ বা অবসাদ দেখা দিতে পারে। কিন্তু যেকোনো বিপদ মোকাবিলার সময় চাই ধৈর্য, দায়িত্বশীল আচরণ আর সাহস।

লেখক: বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এসইউ/এএ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]