অবহেলা নয়, যে বিষয়ে জানা জরুরি

রাজীব কুমার দাশ
রাজীব কুমার দাশ রাজীব কুমার দাশ , পুলিশ পরিদর্শক, বাংলাদেশ পুলিশ
প্রকাশিত: ১২:১৪ পিএম, ১৪ অক্টোবর ২০২০

অনুমান মাস সাতেক আগে- বছর পঁয়ত্রিশ তদুর্ধ্ব এক বিদুষী বিধবা নারীর অভিযোগ তদন্ত করি। স্বামীভাগ্য বলতে, বছর দশেক সংসার। দুটি সন্তান নিয়ে শ্বশুরবাড়ির পাশে আলাদা বাড়ি। এ জনপদে একা দুটি সন্তান নিয়ে স্বামীহারা বিধবা নারী কতটা ভালো আছেন; সবাই বুঝতে পারবেন। এ নারীর শ্বশুরবাড়ি, লোকাল মেম্বার-চেয়ারম্যান, প্রতিবেশী হয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে কাঙ্ক্ষিত সব দাবি পূরণ করেছি। সবার সাথে আলোচনা করে নতুন করে রাস্তা বের করে দেওয়া, শ্বশুরবাড়ির সম্পত্তির স্থায়ী হিসাব থেকে শুরু করে নিরাপদ থিতু হতে সেরাটা বের করতে পেরেছি। সবাই হাসিমুখে চলে গেলেন।

এ জনপদের বেশ কিছু কমন ডায়ালগ আছে। কেউ বলেন, ‘আপনি আমার ছেলের মত; আজ হতে বাবা আপনিই আমার ছেলে! আমার এ কাজটা, এটা-সেটা আপনাকে বা তোমাকে করে দিতে হবে।’ যতোই বলি, ‘করবো, করবো, এটা করার জন্যই সরকার আমাকে বেতন-রেশন দেন।’ না, বাদীপক্ষের বিশ্বাস নেই! আমি নতুন-নতুন কথামালা রূপকারদের তোষামোদ হতে রক্ষা পেতে নিঃসন্তান দম্পতির বিয়ের পনেরো বছর পর পৃথিবীর মুখ দেখা ওয়া-ওয়া কান্না নিয়ে নাদুসনুদুস পুত্রসন্তান হয়ে ওদের কোলজুড়ে সন্তান হয়ে যাই। এ জনপদের কথামালা সাহিত্যে, বাবা-ভাই-সন্তান হয়ে একসময় আমাকে আখের ছোবড়া হয়ে আগুনে জ্বলতে হয়। কথামালা, বাবা-মা-সন্তান-ভাই-বন্ধু কেউ পাশে থাকে না।

সপ্তাহখানেক পরে, রাত মনে হচ্ছে তিনটার বেশি-কম। ফোনে এ ভদ্রনারী বিলাপ করে কান্না করছেন, কিছু বলছেন না। আমি বেশ ভয় পেয়ে মনে করছি, ‘একা বাড়ি, নির্ঘাত ডাকাতি হয়েছে।’ মিনিট দশেক কান্নার পরের উত্তরের জন্য কস্মিনকালেও আমি প্রস্তুত ছিলাম না। ‘স্যার, আপনার উপর এটা-সেটা পড়ুক!’ চিৎকার করে বিশ্রী গালমন্দ করেন। যতোই জানার চেষ্টা করছি, কান্নার শব্দ বেড়ে একসময় স্বাভাবিক হয়ে আমার প্রশংসা করেন। কপালের চিকন ঘাম মুছে গুগল দাদুকে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে বেশ জিজ্ঞাসা করি। দাদু বেশ কিছু উত্তর দেন। আসলে আমরা কেউই মানসিকভাবে সুস্থ নেই। ভদ্র এ নারী মুড-সুইং মানসিক রোগে আক্রান্ত।

প্রসঙ্গ: মুড-সুইং, এমন খুব কমসংখ্যক ছেলে আছে; যারা মেয়েদের মুড-সুইংয়ের ব্যাপারে জানে অথবা জেনেও গুরুত্ব দেয় না! আগে না বুঝলেও এখন বুঝতে পারছি, ব্যাপারটা একটা অভিশাপ। আপনি যদি কখনো দেখেন, আপনার মা, বোন, বান্ধবী, প্রেমিকা, স্ত্রী অথবা কন্যা অকারণে ইমোশনাল হচ্ছে, অযথা রাগ দেখাচ্ছে বা করছে, কাঁদছে, চিৎকার করছে, ফ্রাস্ট্রেটেড হয়ে যাচ্ছে; তখন প্লিজ তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হোন! কারণ হরমোন ইমব্যালেন্স, মেন্সট্রুয়াল সাইকেলসহ বিভিন্ন কারণে বেশিরভাগ মেয়ে মুড-সুইংয়ে ভোগে। হঠাৎ হঠাৎ তাদের বিহেভ বা আচরণ পাল্টে যায়। ওভার রিয়্যাক্ট করে।

আমরা মেয়েটিকে সাইকো বলি! কিন্তু মেয়েটি আসলে সাইকো নয়। আবেগ, মায়া-মমতায় ভরা একজন মানুষ। মুড-সুইংয়ে ভোগা মেয়েগুলো পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় প্রাণি। তারা নিজের সাথে যুদ্ধ করে আপনার আমার (বাবা, ভাই, স্বামী, বন্ধু) সাথে নর্মাল বিহেভ করতে চায়। কিন্তু তা মাঝেমধ্যে পেরে ওঠে না। ওভার রিয়্যাক্ট করে ফেলে, তারা ইচ্ছে করে এমন করে না। তাদের শরীরে বিভিন্ন প্রকার হরমোনের প্রভাবে তারা এমন করে। হয়তো সে নিজেও জানে না কিভাবে নিজের মুড-সুইংকে হ্যান্ডেল বা নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। তাদের এই মুড-সুইংটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তার প্রিয় মানুষগুলোর সাথে হয়।

এই দেখছেন সে খুব হাসি-খুশিই আছে। কিন্তু হঠাৎ খেয়াল করে দেখলেন, সে অন্যরকম বিহেভ করছে। হতে পারে সে আপনার কাছ থেকে মনে মনে কিছু চাইছে। কিন্তু সেটা প্রকাশ করতে পারছে না। সে চায়, আপনি বুঝুন তাকে কিন্তু যখন দেখে তার কাছের প্রিয় মানুষটি তার চাওয়াটা পূরণ করবে তো দূরে থাক; বুঝতেই পারেনি সে কী চায়, তখন সে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারে না। সেই আশা পূরণ না হওয়ার কারণে নিমেষেই সে পাল্টে যায়। করে ফেলে আপনার সাথে ওভার রিয়্যাক্ট। আবার কিছুক্ষণ পরেই সে ঠিক হয়ে যায়। আপনি তার মুড-সুইং ব্যাপারটা ধরতে পারেননি বলে তার সাথে তালে তাল মিলিয়ে আপনিও করে ফেলেন মিসবিহেভ কিংবা তাকে এড়িয়ে চলেন। এতে সেই মুড-সুইং হওয়া মেয়েটি আস্তে আস্তে সবার থেকে গুটিয়ে নেয় নিজেকে।

তাদের ন্যাকা, এইমলেস বলে রূঢ় আচরণ না করে বরং এমন একজন মানুষ হন, যার কাঁধে মাথা রেখে কাঁদা যায়! যার কাছে মন খুলে কিছু কথা বলা যায়! যখন ওদের সব কিছু ভুল মনে হতে থাকে, নিজেকেই নিজের আর সহ্য হয় না, সব কিছু অর্থহীন মনে হতে থাকে, তখন চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করে; বিশ্বাস করেন, ওই মুহূর্তে স্রেফ একজন শোনার মানুষের দরকার হয়। যে কি না খুব মনোযোগ দিয়ে ভীষণ অগোছালো আর অর্থহীন (জটিল) কথাগুলো কেবলই শুনে যাবে। হয়তো কথাগুলো বলে সে নিজেকে হালকা অনুভব করবে, আপনি হয়তো কিছু না-ই বুঝলেন।

বাঙালিরা মুড-সুইংকে ন্যাকামি মনে করে, তাই তো ডিপ্রেশনে বেশি ভোগে। শুধু মানসিক যত্ন না নেওয়ার কারণে। তাদের একটু বুঝুন, দেখবেন ঘনঘন মুড-সুইং হওয়া মেয়েটি সাইকো না! সেও কিন্তু শান্ত ও মিষ্টি মেয়ে আর অন্য মেয়েদের মতোই।

এসইউ/এএ/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]