জননী, তোমায় পড়ে মনে


প্রকাশিত: ০২:২৫ পিএম, ০৩ মে ২০১৫

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পৌঁছে দেয়ার বীর নারী জাহানারা ইমাম। যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তির জন্য দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের প্রসবিনী জাহানারা ইমাম। তার হাত ধরেই স্বাধীন বাংলাদেশে নতুন করে শুরু হয়েছিল আরেকটি যুদ্ধ। স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখার সে যুদ্ধ।

আজ ৩ মে, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ৮৫তম জন্মবার্ষিকী। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক ‘একাত্তরের দিনগুলি’র রচয়িতার জন্ম ১৯২৯ সালের ৩ মে অবিভক্ত ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুর গ্রামে।

তার পারিবারিক নাম জাহানারা বেগম ওরফে জুড়ু। তিনি ১৯৪২ সালে এসএসসি, ৪৪ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৪৫ সালে ভর্তি হন কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে। এরপর ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড শেষ করেন। ১৯৬৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৫ সালে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ করেন।

সাত ভাইবোনের মধ্যে জাহানারা ইমাম ছিলেন সবার বড়। বাবার কাছে তার শিক্ষা জীবনের শুরু। শিশুকাল থেকে দশ থেকে বারো বছর বয়স পর্যন্ত জাহানারার সময় কেটেছে কুড়িগ্রামে। বাবার চাকরির (ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট) কারণে কখনো সেতাবগঞ্জ, কখনো ঠাকুরগাঁ, কখনো খেপুপাড়া বসবাস করতে হয়েছে তাকে।

জাহানারা ইমামের কর্মজীবন কেটেছে ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয়, ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে শিক্ষকতা করে। ১৯৯১ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। এ ছাড়াও তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার।

আমাদের গৌরবময় স্বাধীনতা যুদ্ধে তার ছেলে শাফী ইমাম রুমী শহীদ হন। কী দুর্ভাগ্য জননীর ! মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বামী শরীফ ইমামও মারা যান। ‘৭১ সালে স্বামী আর সন্তান হারানো জননী স্বাধীনতা উত্তর এদেশের মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী এবং অসাম্প্রদায়িক শক্তির পক্ষে তিনি ছিলেন প্রথম কাতারের সৈনিক।

তবে তিনি শহীদ জননী হিসেবে সমগ্র বাংলাদেশে জনপ্রিয়তা লাভ করেন নব্বইয়ের দশকের প্রথম দিকে ধর্মান্ধ মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির উত্থানকে রুখে দিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে।

১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারী ১০১ সদস্যবিশিষ্ট ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ গঠিত হয় জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে। এরপর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী প্রতিরোধ মঞ্চ, ১৪টি ছাত্র সংগঠন, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক জোট, শ্রমিক-কৃষক-নারী এবং সাংস্কৃতিক জোটসহ ৭০টি সংগঠনের সমন্বয়ে পরবর্তীতে ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ গঠনে তিনিই মূল ভূমিকা রাখেন।

শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দেশব্যাপী গণস্বাক্ষর, গণ সমাবেশ, মানববন্ধন, সংসদ যাত্রা, অবস্থান ধর্মঘট, মহা সমাবেশ ইত্যাদি কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে আন্দোলন আরো বেগবান হয়। ২৬ মার্চ ১৯৯৩ স্বাধীনতা দিসবে গণআদালত বার্ষিকীতে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণ তদন্ত কমিটি ঘোষিত হয় এবং আরো ৮ জন যুদ্ধাপরাধীর নাম ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৪ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে গণআদালতের ২য় বার্ষিকীতে গণ তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান কবি বেগম সুফিয়া কামাল ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটের সামনে রাজপথের বিশাল জনসমাবেশে জাহানারা ইমামের হাতে জাতীয় গণ তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট হস্তান্তর করেন।

এ সময় খুব দ্রুত তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। ১৯৯৪ সালের ২ এপ্রিল চিকিৎসার জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান ডেট্রয়েট হাসপাতালের উদ্দেশে রওয়ানা দেন। ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন তিনি মারা যান।

মরণব্যাধি ক্যান্সারের সাথে লড়তে হয়েছে উনাকে। অসুস্থ্য শরীর নিয়েই দীর্ঘদিন একাত্তরের ঘাতক, যুদ্ধাপরাধীসহ স্বাধীনতাবিরোধী সকল অপশক্তির বিরোদ্ধে লড়াই করেছেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। জীবনের শেষমুহূর্তেও তিনি তাঁর দায়িত্বের কথা ভুলে যান নি। মৃত্যুর আগে কাঁপা কাঁপা হাতে তিনি লিখে গেছেন দেশবাসীর উদ্দেশ্যে তার শেষ চিঠি, ‘আমি না থাকলেও আপনারা আমার সন্তান-সন্ততিরা - আপনাদের উত্তরসূরিরা সোনার বাংলায় থাকবেন।’

তিনি চলে গেলেন, আমরা রয়ে গেলাম। আজকের এই দিনগুলোর সাক্ষী হয়ে। যে দিনগুলোর জন্য কত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছেন জননী- তা বাঙ্গালি মাত্রই জানেন। কত কষ্ট, গঞ্জনা সইতে হয়েছে তাকে। কত ধর্মান্ধের নষ্ট ভাষার শিকার হয়েছেন বারবার। এমনকী রাষ্ট্রদ্রোহীতার অপবাদও সইতে হয়েছিল। আর তা কেবলমাত্র যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাইবার অপরাধেই(!)।

জাতির কাছে আজ সেই দিন ধরা দিয়েছে। এরইমধ্যে কাদের মোল্লা ও কামারুজ্জামনের মতো ঘৃণ্য দুই রাজাকারের মৃতুদণ্ড কার্যকর করেছে বাংলাদেশ। তালিকায় আছে আরোও বেশ ক’জন।

আজকের এই বিজয়ের আনন্দে জননী তোমাকে জড়িয়ে ধরে উল্লাস করতে না পারা কষ্টই তো জল এনে দিয়ে যায় চোখে বারবার। তোমার মত করে আর তো কেউ সন্তানদের এভাবে জ্বলে উঠতে শিখায়নি, দাবি আদায় করতে শিখায়নি। উত্তাল শাহবাগে যখন ফাঁসির দাবির মহাস্রোতে হেঁটে গিয়েছি তখন অনুভব করেছি তুমি আছো। ফাঁসি আদায়ের আনন্দের স্রোতেও মনে হয়েছে তুমি আছো। জননীরা যে সন্তানের সাথে সাথেই থাকেন। দাবি আদায়ের সকল সংগ্রামে, হতাশায় প্রেরণা হয়ে। থাকেন বিজয়ের উচ্ছ্বাসেও।

জানতে চায় মন, তোমার আদরের রুমীর কোলে শুয়ে কী তুমি দেখতে পাও, কোটি কোটি রুমীরা তোমাকে দেয়া কথা রেখেছে? যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার সে কথা। খুব জানতে ইচ্ছে করে।

এলএ/আরআই

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।