সালাম সালাম হাজার সালাম

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ সালাহ উদ্দিন মাহমুদ , লেখক ও সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০৬:৫৩ এএম, ৩০ আগস্ট ২০১৭

স্বাধীন বাংলা বেতারের কণ্ঠযোদ্ধা, বাংলা গানের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আব্দুল জব্বার চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তিনি আর কখনো ফিরবেন না কোন মঞ্চে কিংবা টেলিভিশনের পর্দায়। আমাদের আর শোনাবেন না ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’, ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ কিংবা ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়’ গানগুলো। তবে তিনি ফিরে না এলেও তাঁর কণ্ঠ চিরদিন রয়ে যাবে আমাদের মাঝে। তাঁর গাওয়া গানের অনুরণন আমাদের হৃদয় মাঝে চির ভাস্বর হয়ে থাকবে। আমরা তাঁর গানের মাঝেই খুঁজে পাবো তাঁকে।

jagonews24

আব্দুল জব্বার ১৯৩৮ সালের ৭ নভেম্বর কুষ্টিয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৫৬ সালে মেট্রিক পাস করেন। ১৯৫৮ সাল থেকে পাকিস্তান বেতারে গান গাওয়া শুরু করেন। ১৯৬২ সালে প্রথম চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেন। ১৯৬৪ সাল থেকে বিটিভির নিয়মিত গায়ক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন।

> আরও পড়ুন- বঙ্গবন্ধুর সাহিত্যকর্ম : ভাষণ থেকে রোজনামচা

১৯৬৪ সালে জহির রায়হান পরিচালিত প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সংগম’র গানে কণ্ঠ দেন। চলচ্চিত্রটি একই বছরের ২৩ এপ্রিল ঈদুল আজহায় সমগ্র পাকিস্তানজুড়ে মুক্তি পায়। এ ছবিতে অভিনয় করেন রোজী সামাদ, হারুন রশীদ, খলিলউল্লাহ খান, সুমিতা দেবী প্রমুখ। ১৯৬৮ সালে ‘এতটুকু আশা’ ছবিতে সত্য সাহার সুরে তার গাওয়া ‘তুমি কি দেখেছ কভু’ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ১৯৬৮ সালে ‘পীচ ঢালা পথ’ ছবিতে রবীন ঘোষের সুরে ‘পিচ ঢালা এই পথটারে ভালোবেসেছি’ এবং ‘ঢেউয়ের পর ঢেউ’ ছবিতে রাজা হোসেন খানের সুরে ‘সুচরিতা যেও না কো আর কিছুক্ষণ থাকো’ গানে কণ্ঠ দেন। ১৯৭৮ সালে ‘সারেং বৌ’ চলচ্চিত্রে আলম খানের সুরে ‘ও রে নীল দরিয়া’ গানটি দর্শকপ্রিয়তা পায়।

jagonews24

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ও প্রেরণা জোগাতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ ও ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’সহ অসংখ্য গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। এছাড়া যুুদ্ধের সময় তিনি প্রখ্যাত ভারতীয় কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে মুম্বাইয়ের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরিতে কাজ করেন। কলকাতাতে অবস্থিত বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ঘুরে হারমনি বাজিয়ে গণসংগীত পরিবেশন করেছেন। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের ত্রাণ তহবিলে বিভিন্ন সময় গণসংগীত গেয়ে পাওয়া ১২ লাখ রুপি দান করেছিলেন।

আব্দুল জব্বার তাঁর জীবদ্দশায় সংগম (১৯৬৪), নবাব সিরাজউদ্দৌলা (১৯৬৭), উলঝন (১৯৬৭), পীচ ঢালা পথ (১৯৬৮), এতটুকু আশা (১৯৬৮), ঢেউয়ের পর ঢেউ (১৯৬৮), ভানুমতি (১৯৬৯), ক খ গ ঘ ঙ (১৯৭০), দ্বীপ নেভে নাই (১৯৭০), বিনিময় (১৯৭০), জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০), নাচের পুতুল (১৯৭১), মানুষের মন (১৯৭২), স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা (১৯৭৩), ঝড়ের পাখি (১৯৭৩), আলোর মিছিল (১৯৭৪), সূর্যগ্রহণ (১৯৭৬), তুফান (১৯৭৮), অঙ্গার (১৯৭৮), সারেং বৌ (১৯৭৮), সখী তুমি কার (১৯৮০), কলমিলতা (১৯৮১) সিনেমায় প্লেব্যাক করেন।

jagonews24

তাঁর প্রথম মৌলিক গানের অ্যালবাম ‘কোথায় আমার নীল দরিয়া’ ২০১৭ সালে মুক্তি পায়। অ্যালবামটির কাজ শুরু হয় ২০০৮ সালে। অ্যালবামের ‘এখানে আমার পদ্মা মেঘনা’ গানটি শিল্পী আব্দুল জব্বারের কণ্ঠে রেকর্ড হয় বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারের জন্য। পরে তিনি ওই গানের গীতিকার আমিরুল ইসলামের কাছে একটি অ্যালবাম করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে আমিরুল অ্যালবামের বাকি গানগুলো রচনা করেন এবং সুরকার গোলাম সারোয়ার তাতে সুরারোপ করেন। ২০০৯ সালে অ্যালবামের কাজ শেষ হলেও নানা জটিলতার কারণে অ্যালবামটি মুক্তি পায় ২০১৭ সালে। রেকর্ডের পর থেকে অ্যালবামের গানগুলো বিশেষ করে ‘এখানে আমার পদ্মা মেঘনা’ গানটি বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বেসরকারি বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রচারিত হয়।

> আরও পড়ুন- নায়করাজের যত অর্জন

তাঁর গাওয়া ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়’, ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ ও ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গান তিনটি ২০০৬ সালে মার্চ মাসজুড়ে অনুষ্ঠিত বিবিসি বাংলার শ্রোতাদের বিচারে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। তিনি বাংলাদেশের দু’টি সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘একুশে পদক (১৯৮০)’ ও ‘স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯৬)’ লাভ করেন। এছাড়া বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক (১৯৭৩), বাচসাস পুরস্কার (২০০৩), সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস- আজীবন সম্মাননা (২০১১) এবং জহির রায়হান চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

jagonews24

আব্দুল জব্বার দীর্ঘদিন কিডনি, হার্ট, প্রস্টেটসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগে ৩০ আগস্ট সকাল সাড়ে ৮টায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। আমরা তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি। হাজার সালাম জানাচ্ছি তাঁর আত্মার উদ্দেশ্যে।

এসইউ/আরআইপি