উঁচু ভবন নির্মাণের নেপথ্যের কারিগর দিনমজুরদের দিনপঞ্জি


প্রকাশিত: ১১:০৯ এএম, ১১ জুন ২০১৫

‘আব্বা সামনের সপ্তায় পেমেন্ট পাইলেই ট্যাকা পাঠাইয়া দিমু। আপনি খালি দোয়া কইরেন আল্লাহ যেন শরীর-স্বাস্থ্যডা ভালো রাহে।’ কথা বলা শেষ করে মোবাইল রেখে আবার কাজে যোগ দিলেন দিনমজুর শামসুল হক। জীবিকার তাগিদে দুই সপ্তাহ আগে কুড়িগ্রাম থেকে রাজধানী ঢাকায় এসেছেন তিনি। গ্রামে রিকশা চালাতো। রিকশা চালাতে ভীষণ কষ্ট তাই ঢাকায় এসে পরিচিত এক ঠিকাদারের সহায়তায় আজিমপুর নতুন পল্টন এলাকায় একটি ডেভেলপার কোম্পানিতে কাজ করছেন।

কাকডাকা ভোর থেকে মাগরিবে আযান পর্যন্ত প্রায় বিরামহীন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খাটতে হয় শামসুল হককে। মসজিদের মাইক থেকে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে জোহরের নামাজের আযানের ধ্বনি ভেসে আসছিল। আযান শুনতেই শামসুল হক কাজ বন্ধ করে দিয়ে দ্রুত হাত মুখ ধুয়ে খাবার নিতে দাড়িঁয়ে পড়ল লাইনে। বিত্তবানদের মতো ওদের জন্য ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজিয়ে রাখা হয় না। বসার জন্যও থাকে না চেয়ার কিংবা বেঞ্চ। মাথার ওপর ঘুরে না পাখা। এয়ারকন্ডিশনের শীতল হাওয়া তো ওদের কাছে নিছক স্বপ্নের অতীত। খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে বা বসেই ওদের ৩ বেলা খাবার খেতে হয়।

সকাল থেকেই বৃষ্টিতে ভিজে রড কাটার কাজ করছিল কুড়িগ্রামের দিনমজুর শামসুল হক। ভীষণ ক্ষুধার্ত শামসুল হক খাবার নিয়ে দাঁড়িয়েই খেতে শুরু করলো। খাবারের মেন্যু খুবই সাধারণ, মোটা চালের ভাত, আলু ভাজি ও নলা মাছের ছোট একটা টুকরো। ঘপঘপ করে গোগ্রাসে খাচ্ছিল সে।

ইট পাথরের এ নগরীতে বড় বড় দালানকোঠা শামসুল হকদের শরীরের ঘাম আর পরিশ্রমে গড়ে উঠে। নির্মাণ কাজ কাজ শেষ হওয়ার পর বড় বড় সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবিসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ ওই সব ফ্ল্যাট বাড়িতে আরাম আয়েশে বসবাস করলেও নেপথ্যে থাকা অসংখ্য অভাগা দিনমজুরদের কথা কেউ কোনদিন মনে রাখে না।

শাসমুল হক সেই সব খেটে খাওয়া অসংখ্য দিনমজুরদেরই একজন। আগে কুড়িগ্রামে রিকশা চালাতো। তীব্র গরমে রিকশা চালাতে ভীষণ কষ্ট হয়। বাড়িতে স্ত্রী ও ছেলেসহ খানেওয়ালা চারজন। ওদের মুখে অন্ন জুটাতে পরিচিত এক ঠিকাদারের মাধ্যমে আজিমপুর নিউ পল্টনে একটি ডেভেলপার কোম্পানিতে দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরিতে সম্প্রতি কাজে যোগদান করেছেন। ওদের এলাকার আরো ১৫ জন এ  প্রকল্পে কাজ করে।



কাকডাকা ভোরে ঘুম ভেঙ্গে কাজ শুরু, সন্ধ্যায় মাগরিবের আযান পর্যন্ত হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম। কেউ মাটি কাটে, কেউ মেশিনের সাহায্য রড কাটে, রড বাঁধে আবার কেউ সেগুলো টেনে প্রয়োজনীয় স্থানে নিয়ে যায়। প্রকৌশলীর তৈরি নকশা দেখে ও ঠিকাদারের নির্দেশ অনুসারে কাজ করে।

ফোরম্যান মিলন মিয়া জানান, প্রতিদিন সাধারণ শ্রমিক প্রতি ৩০০ টাকা ও মিস্ত্রিদের ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মজুরি দেয়া হয়। তবে প্রতিদিনের টাকা প্রতিদিন দেয়া হয় না। হাত খরচের জন্য দৈনিক ১০০ টাকা দেয়া হয়। শ্রমিকরা ৩ বেলা খাবারের জন্য ৭০ টাকা পরিশোধ করে। বাকি ৩০ টাকায় বিড়ি সিগারেট ও মোবাইলে রিচার্জ করে।

তবে কোন কোন দিন কাজের চাপ থাকলে শ্রমিকদের দিয়ে অতিরিক্ত কাজ আদায় করে নেন তারা। সেক্ষেত্রে মাগরিবের পর থেকে রাত ১০-১১- ১২ ও অনেক সময় ১টা পর্যন্ত কাজ করলে সাধারণ দিনমজুরদের একদিনের সমপরিমাণ ৩০০ টাকা অতিরিক্ত মজুরি দেয়া হয়।

জায়েদ নামের আরো একজন দিনমজুর জানায়, গ্রামে তার বুড়ো বাবা ও ছোট দুই ভাই-বোন থাকে। অভাবের সংসার। বাবা টাকার জন্য খালি মোবাইলে ফোন দেয়। কিন্তু ঠিকাদার প্রতিদিন ১০০ টাকার বেশি দিতে চায় না। প্রতিমাসের ১০ তারিখে হিসাব করে টাকা বুঝিয়ে দেয়া হয়। অনুরোধ করলে বলে, না পোষাইলে কাজ ছ্যাইড়া দে।

লিটন নামের আরেক দিনমজুর জানায়, সারাদিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের পর শরীর-হাত-পা অবশ হয়ে আসে। কাম (কাজ) করতে আর মন চায়না। প্রতিদিন রাতে স্ত্রীর সাথে মোবাইল ফোনে কথা হয়। ওই সময় তিন বছরের মেয়ের সাথে কথা বললে সাময়িকাবে বিষ-বেদনা দূর হয় বলে মনে হয়। মেয়ের সাথে কথা বলে শরীর মন দুটোই ভালো হয়ে যায়।

লিটন আরো জানায়, ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে পরদিন সকালে আবার জীবন সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়াই আমাদের ললাটের (কপাল) লিখন।

এমইউ/আরএস/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।