কাঁচি-ট্রিমারে বদলায় মানুষের রূপ, বদলায় না নরসুন্দরের ভাগ্য
সাব্বির হোসাইন
মানুষের বাহ্যিক অবয়ব পরিপাটি রাখা এবং সমসাময়িক ফ্যাশনে নিজেকে আকর্ষণীয় করে তোলার পেছনে যাদের অবদান অনস্বীকার্য, তারা হলেন আমাদের সমাজের নরসুন্দর বা ক্ষৌরকার সম্প্রদায়। এক সময় এই পেশাটি কেবল নির্দিষ্ট কিছু সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারের ঐতিহ্যগত জীবিকা হলেও, বর্তমান যুগে ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে সব শ্রেণির মানুষই এই শিল্পে যুক্ত হচ্ছেন।
কালের বিবর্তনে তাদের কাজের পরিবেশ ও প্রযুক্তিতে আধুনিকতা এলেও, জীবনযাত্রার মান ও ভেতরের অন্তর্নিহিত কষ্টগুলো রয়ে গেছে আগের মতোই। সামাজিক অবহেলা আর আর্থিক টানাপোড়েন আজও তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।
অতীতে দেখা যেত হাট-বাজারে বা রাস্তার ধারে গাছের ছায়ায় সামান্য একটা আয়না, কাঁচি, ক্ষুর আর একটি নড়বড়ে চেয়ার নিয়ে বসতেন নাপিতরা। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ও সময়ের আবর্তনে সেই চিরচেনা গ্রামীণ দৃশ্য এখন অনেকটাই বিলুপ্তপ্রায়। সনাতন কাঁচি বা ব্লেডের পাশাপাশি এখন সেলুনগুলোতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক ট্রিমার, ইলেকট্রিক শেভার, হেয়ার ড্রায়ারসহ নানাবিধ আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রসাধন সামগ্রী। ফলে এটি এখন আর কেবল কোনো নির্দিষ্ট বংশগত পেশা হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই, বরং অনেক শিক্ষিত তরুণও আধুনিক ‘জেন্টস পার্লার’ বা সুসজ্জিত সেলুন ব্যবসাকে একটি লাভজনক ও সম্মানজনক পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।
তবে বাহ্যিক কর্মপরিবেশ আধুনিক ও চাকচিক্যময় হলেও এই পেশার সাধারণ কারিগরদের ভাগ্যের চাকা সচল হয়নি। রাজধানীর একটি গলির ভেতর সাধারণ সেলুনে কর্মরত তরুণ কারিগর আবিরের কথাই ধরা যাক। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অক্লান্ত হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে যা উপার্জন হয়, তা দিয়ে বর্তমানের ঊর্ধ্বমুখী বাজারে টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন। আকাশছোঁয়া ঘরভাড়া, ইউটিলিটি বিল আর পরিবারের ভরণপোষণ জোগাতে তাকে নিয়মিত হিমশিম খেতে হচ্ছে।
আবিরের মতো অসংখ্য শ্রমিকের মূল আক্ষেপ হলো শ্রমের ন্যায্য মজুরি না পাওয়া। তারা সারাদিনে গ্রাহকদের সেবা দিয়ে যা উপার্জন করেন, তার একটি বড় অংশই চুক্তিমোতাবেক দিয়ে দিতে হয় দোকান মালিককে। দিনশেষে নিজের পকেটে যা অবশিষ্ট থাকে, তা দিয়ে এই চড়া মূল্যের বাজারে মাস পার করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কেবল ঈদ বা বড় কোনো সামাজিক উৎসবের সময়েই তারা কিছুটা বাড়তি আয়ের মুখ দেখেন, যা দিয়ে পেছনের বকেয়া ঋণ শোধ করতেই শেষ হয়ে যায়।
অর্থনৈতিক সংকটের চেয়েও এই সম্প্রদায়ের বুকে বড় আঘাত হানে সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। আজও আমাদের সমাজব্যবস্থার একটি বড় অংশে এই পেশার মানুষকে অবজ্ঞার চোখে দেখা হয়। এই সামাজিক হীনমন্যতা ও লোকলজ্জার ভয়ে অনেকেই সমাজে নিজের পেশাগত পরিচয় দিতে চরম দ্বিধাবোধ করেন। এমনকি অনেক কর্মীকে লোকচক্ষুর অন্তরালে নিজের পরিবার বা আত্মীয়-স্বজনকেও লুকিয়ে রাখতে হয় যে তারা সেলুনে কাজ করছেন। একটি প্রগতিশীল ও সভ্য সমাজে বাস করেও কেন একজন মানুষকে তার সৎ শ্রমের পেশা নিয়ে লজ্জিত হতে হবে এই মৌলিক প্রশ্নটি আজ আমাদের নাগরিক বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, কোনো সৎ শ্রমই ক্ষুদ্র বা তুচ্ছ নয়। সমাজের প্রতিটি মানুষের পারস্পরিক মেধা ও শ্রমের সমন্বিত রূপেই আমাদের চারপাশ সচল ও সুন্দর থাকে। তাই কাউকে পেশা দিয়ে মূল্যায়ন না করে, তাদের কাজের যথাযথ সামাজিক স্বীকৃতি ও প্রাপ্য সম্মান দেওয়া উচিত। মেহনতি মানুষের প্রতি আমাদের মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। একটি সুন্দর, সাম্যবাদী ও বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে প্রতিটি পেশাকে সমানভাবে শ্রদ্ধা করতে হবে। কোনো পেশাকে খাটো না করে সবার শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন করলেই আমাদের সমাজ প্রকৃত অর্থে আলোর পথে এগিয়ে যাবে।
- লেখক: শিক্ষার্থী, তা'মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা, টঙ্গী
আরও পড়ুন
ফুটপাতে ভাতের হোটেল: ঢাকার শ্রমজীবীদের ৩ বেলা আহারের ভরসা
নারীর নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা: তরুণীদের চোখে বাস্তবতা
কেএসকে