পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ডালরুটি খেয়েছেন কখনো?

ফিচার ডেস্ক
ফিচার ডেস্ক ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:২১ পিএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০

পুরান ঢাকার কোনো গলিপথে হাঁটার সময় দেখবেন এটি। রাস্তার পাশে দুই পিঠে হালকা তাওয়ার সেক (পোড়াদাগ) সমেত আটার মোটা রুটির মতো অদ্ভুতদর্শন হাতের তালুর সাইজের দেখতে অনেকটা পিঠার মতো। এটি পেতে পারেন হাতের কাছেই। দেখে কোনোক্রমেই খাওয়ার উপযোগিতা দূরে থাক কেনার উপযোগীও হয়তো মনে হবে না। বড়জোর মনে হতে পারে পুরি কিংবা পরোটার জন্য তৈরি আটার তাল এটি। বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে, এটি আসলে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু এবং সাস্থ্যকর খাবার ‘ডালরুটি’। বিস্তারিত জানাচ্ছে মো. জহির উদ্দিন-

এটি মূলত সম্পূর্ণ তেল ছাড়া তৈরি এক বিশেষ ধরনের রুটি। বানাতে ব্যবহার করা হয় সেদ্ধ মটর ডাল, যা পিষে গুড়া করা হয়। সাথে থাকে ধনেপাতা এবং কাঁচা মরিচ কুচি। চালের আটা দিয়ে বানানো ছোট তালের মধ্যে পুর হিসেবে দেওয়া হয় ডালের এ মিশ্রণ। তারপর রাখা হয় লোহার তাওয়ায়। গড়ে ৫-৬ মিনিট সময় লাগে একটি পিঠা গরম করতে। দুই পিঠে একটু সেক লাগলেই সরিয়ে রাখা হয় তাওয়ার মাঝের গরম অংশ থেকে, মানে পিঠা বিক্রয়ের জন্য তৈরি। গরম পিঠা ভাঙলেই মধ্যের ডাল মনে হয় ভাপা পিঠার আটার মতো, সাবলীল একটা গরম ভাপ। খাওয়ার জন্য এ পিঠার সাথে পাওয়া যায় বিভিন্ন রকম ভর্তা।

রাজধানীর দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অধীন পুরান ঢাকা ইতিহাস-ঐতিহ্যে পরিপূর্ণ। বাকরখানি, হাজী বিরিয়ানি, ছন ঘরের তেহারি, ঝুনু পোলাওসহ বিখ্যাত সব আইটেমের মতো ডালরুটিও মিশে আছে নগরীর এ পুরোনো অংশের ঐতিহ্যের সাথে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, বাকি সবকিছু নিয়ে অনেক লেখালেখি হলেও ঐতিহ্যবাহী এ ডালরুটি অবহেলিত হয়েছে যেকোনো ধরনের লেখালেখি থেকে। তার প্রমাণ মেলে গুগলে খোঁজ নিয়ে।

jagonews24

বিক্রেতাদের কাছ থেকে জানা যায়, মূলত শীত আগমনের সাথে সাথে এ পিঠা তৈরি শুরু হয় পুরান ঢাকার বিভিন্ন গলিতে। ঠিক কখন থেকে এ পিঠার প্রচলন শুরু হয়েছে এ বিষয়ে অনেককে জিজ্ঞেস করেও কোন সদুত্তর পাওয়া যায়নি।

একেকজন একেক কথা বললেও দু’জন বিক্রেতা বলেছেন, এ পিঠার প্রচলন শুরু হয়েছে পাকিস্তান আমল থেকে। তবে বাকরখানি কিংবা হাজী বিরিয়ানির মতো এ বাকরখানির কারিগর ঢাকার বাইরের নয়। গলির মধ্যে নিজ বাড়ির সামনে কিংবা রাস্তার পাশে ছোট্ট একটু জায়গায় বিকেল ৪টার দিকে ডালরুটির পসরা সাজিয়ে বসেন বিক্রেতারা। তারপর বানাতে শুরু করেন ডালরুটি। কেউ আবার ঘর থেকেই বানিয়ে নিয়ে আসেন, শুধু তাওয়ায় সেকে বিক্রি করে।

প্রতিটি রুটি ১০ টাকা করে। এ রুটি পাওয়া যায় রায়সাহেব বাজার মোড়, নারিন্দা মোড়, কলতা বাজার মক্কা বিরিয়ানির সামনেসহ আরও কয়েকটি জায়গায়। তবে বাকিসব যায়গার পিঠাগুলোর থেকে কলতা বাজার মক্কা বিরিয়ানির সামনে তৈরি পিঠার আকার সমমূল্যে তুলনামূলক বড়। যাদের জন্য তৈলাক্ত খাবার নিষেধ; তাদের জন্য ডালরুটির বিকল্প খুঁজে পাওয়া কষ্ট।

এ বিষয়ে সূত্রাপুর থানার জাস্টিস লাল মোহন দাস লেন নিবাসি ইতিহাস গবেষক জাফর তামামের সাথে কথা হয়। তিনি জানান, ডালরুটি আসলে ব্রিটিশ আমল থেকেই আছে এখানে। এটি মূলত উড়িষ্যা, বিহার অঞ্চল থেকে এ নগরীর ইতিহাসের সাথে যুক্ত হয়েছে। অনেকটা অর্থনৈতিক কারণে এ খাবারের উদ্ভব। এটি খুবই সহজলভ্য উপাদানে তৈরি। এটি অল্প খরচে প্রয়োজনীয় শর্করা এবং আমিষের অভাব পূরণ করে। তৎকালীন ঢাকার ধনী শ্রেণির লোকেরা গরুর মাংস, মুরগি কিংবা হাসের মাংসের সাথে এ পিঠা খাওয়ায় অভ্যস্ত ছিল।

এসইউ/এমকেএইচ