শাহজাহানের ‘ময়ূর সিংহাসন’ এখন কোথায়?

ফিচার ডেস্ক
ফিচার ডেস্ক ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:১৬ পিএম, ০৮ আগস্ট ২০২১

সম্রাট শাহজাহান তার প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজের প্রতি ভালোবাসার নিদর্শস্বরূপ নির্মাণ করেছিলেন তাজমহল। বিশ্ববাসীর শত কৌতূহল ঘিরে আজও শাহজাহানের ভালোবাসার নিদর্শন সবার চোখ জুড়াচ্ছে।

তবে জানলে অবাক হবেন, শাহজাহান যত অর্থ ব্যয় করে তাজমহল নির্মাণ করেছিলেন; তার চেয়েও দ্বিগুণ অর্থ ব্যয় করে তৈরি করেছিলেন একটি সিংহাসন।

ইতিহাস মতে, মুঘল স্থাপত্যের এই অনুপম নিদর্শনটি তৈরি হয় বেবাদল খাঁ’র তত্ত্বাবধানে। বেবাদল খাঁর তত্ত্বাবধানে ১৬২৮-১৬৩৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ৮ বছর তৎকালীন ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এটি নির্মিত হয় সিংহাসনটি।

jagonews24

কেমন ছিল ময়ূর সিংহাসন?

বলা হয়ে থাকে, পৃথিবীর সবচেয়ে দামী সিংহাসন না-কি তৈরি করেছিলেন সম্রাট শাহজাহান। স্বর্ণ, দামি দামি রত্নসহ হীরা খচিত ছিল সেই সিংহাসনে। ফারসিতে একে বলা হতো ‘তখত-ই-তাউস'। তখত মানে সিংহাসন, আর তাউস শব্দের অর্থ হল ময়ূর।

তবে সিংহাসনের নাম ‘ময়ূর সিংহাসন’ কেন? কারণ সিংহাসনের পেছনে অনিন্দ্যসুন্দর পেখম ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দু’টি ময়ূরের ছবি ছিল। ময়ূর সিংহাসন ছিল মূল্যবান স্বর্ণ, হীরা ও দূর্লভ মরকত মনি খচিত।

jagonews24

এই সিংহাসনের ৪টি পায়া ছিল নিরেট স্বর্ণ দ্বারা নির্মিত। ১২টি মরকত মনি স্তম্ভের উপর চন্দ্রতাপ ছাদ আচ্ছাদন করা হয়। ছাদের চারদিকে মিনা করা মণি মুক্তা বসানো ছিল। এর ভেতরের দিকের সবটাই মহামূল্যবান চুন্নি ও পান্না দ্বারা মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

প্রত্যেক স্তম্ভের মাথায় মণি-মাণিক্য খচিত এক জোড়া ময়ূর মুখোমুখি বসানো হয়েছিল। প্রতি জোড়া ময়ূরের মধ্যস্থলে একেকটি মণি-মাণিক্য নির্মিত গাছ ছিল। যা দেখলে মনে হতো, ময়ূর দুটি ঠুকরে গাছের ফল খাচ্ছে।

এই সিংহাসনটির এমন কোনো স্থান ছিল না, যেখানে মণি-মুক্তা বাদ পড়েছিল। বিভিন্ন নকশার মধ্যকার ফাঁকা অংশটুকুও ভরাট করা হয় ক্ষুদ্রাকৃতির হিরা দিয়ে। হিরা ও পান্নার কারুকাজ বিশিষ্ট ৩টি সিঁড়ির সাহায্যে সিংহাসনে ওঠা-নামার ব্যবস্থা ছিল।

এ ছাড়াও সিংহাসনের উপরের চাঁদোয়ার চারকোণে বসানো হয়েছিল সারিবদ্ধ মুক্তা। চাঁদোয়াটির নিচেও ছিল হিরা আর মুক্তার বাহারি নকশা। এ ছাড়াও বিরাট আকারের চুনি বসানো ছিল ময়ূরের বুকে।

jagonews24

সেখান থেকে ৫০ ক্যারটের একটি হলুদ রঙের মুক্তা ঝুলে থাকতো। নীল রঙের মণি দিয়ে সাজানো হয়েছিল ময়ূরের লেজ। সিংহাসনটিতে বসার জন্য ভিন্ন ভিন্ন দিকে অগণিত মণি মুক্তা শোভা পেত।

জানা যায়, ১৫৮৭ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে পারস্যের মহামান্য সম্রাট আব্বাস তৎকালীন এক লাখ টাকা মূল্যের একটা হিরা বাদশাহকে উপহার দেন। সম্রাট শাহজাহান পিতার এই উপহার প্রাপ্ত অত্যন্ত দামি হীরাটিও সিংহাসনে যোগ করেন।

কোথায় গেল ময়ূর সিংহাসন?

১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির সম্রাট মোহাম্মদ শাহের শাসনামলে, পারস্য সম্রাট নাদির শাহের ভারতবর্ষ অভিযানকালে লুণ্ঠিত হয় সিংহাসনটি। এর সৌন্দর্য দেখে পাগল হয়ে নাদির শাহ সিংহাসনটি সঙ্গে নিয়ে যান নিজ দেশ পারস্যে অর্থাৎ বর্তমান ইরানে।

jagonews24

এই ময়ূর সিংহাসনের কারণেই ১৭৪৭ সালে তিনি প্রতিপক্ষের হাতে নির্মমভাবে খুন হন। এরপরই আসল ময়ূর সিংহাসনটি হারিয়ে যায়। নাদির শাহের মৃত্যুর ফলে পারস্যে সৃষ্ট গোলযোগে হয়তো এটি চুরি হয়ে হয়েছিল; নয়তো এর বিভিন্ন অংশ খুলে আলাদা করা হয়েছিল।

এটাও ধারণা করা হয়, সিংহাসনটি হয়তো ওসমানীয় সাম্রাজ্যের সুলতানদেরকে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী পরস্যে এমন অনেক সিংহাসন তৈরি হয়েছিল। যেগুলোকে মানুষ ময়ূর সিংহাসন বললেও আসলটির সঙ্গে সেগুলোর মিল ছিল না।

তবে ১৮১২ সালে আলী শাহ কাজার কিংবা ১৮৩৬ সালে মোহাম্মদ শাহ কাজারের তৈরি সিংহাসনের সঙ্গে শাহজাহানের ময়ূর সিংহাসনের কিছুটা মিল পাওয়া যায়। ইতিহাসবিদদের ধারণা, হয়তো মূল ময়ূর সিংহাসনের অংশ বিশেষ এগুলো তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছিল।

আজ কোথাও নেই বিশ্বের মহামূল্যবান ময়ূর সিংহাসনটি। বিভিন্ন রাজাদের হাত-বদলের মাধ্যমে কালের গর্ভে ধ্বংস হয়ে গেছে এটি। বিশ্বখ্যাত কোহিনূর হীরা বসানো হয়েছিল ময়ূর সিংহাসনে। এই হিরা সম্পর্কে হয়তো জেনে থাকবেন।

jagonews24

একসময় ব্রিটিশের হাতে কোহিনূর হীরাটি চলে যায়। এরপর ইংল্যান্ডের রানি ভিক্টোরিয়ার মুকুটে সেটি শোভা পায়। বংশপরম্পরায় ইংল্যান্ডের বর্তমান রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মুকুটেও শোভা পেয়েছিল কোহিনূর হিরা। বর্তমানে ময়ূর সিংহাসনের স্মৃতিস্বরূপ এই হিরাটিই বিদ্যমান আছে।

জেএমএস/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]