সেমিনারে সতর্কবার্তা
দেশে নীরব মহামারিতে রূপ নিয়েছে হৃদ্রোগ
দেশে হৃদ্রোগ এখন নীরব মহামারিতে রূপ নিয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, মানসিক চাপ, স্থূলতা ও শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া এই হৃদ্রোগ বৃদ্ধির প্রধান কারণ। হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়া প্রতিরোধে এখনই সচেতনতা বাড়ানো এবং জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা জরুরি।
শুক্রবার (৮ মে) চট্টগ্রামে ‘হার্ট অ্যাটাক: প্রতিকার ও প্রতিরোধ’ শীর্ষক সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা এই সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন। নগরের প্রবর্তক সংঘ মাস্টারদা সূর্যসেন মিলনায়তনে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে। এতে চিকিৎসক, সমাজসেবক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
চিকিৎসকরা জানান, হৃদ্রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক রোগী শারীরিক পরিশ্রমের সময় বুকের মাঝখানে চাপ বা ব্যথা অনুভব করেন। অনেক সময় বুক ভারী হয়ে আসে এবং বাম হাত, কাঁধ কিংবা চোয়ালে ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে। কারও কারও ক্ষেত্রে পেটের ওপরের অংশেও অস্বস্তি দেখা দেয়। এসব উপসর্গকে অনেকেই গ্যাস্ট্রিক বা সাধারণ দুর্বলতা ভেবে অবহেলা করেন। অথচ এগুলোই হার্ট অ্যাটাকের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। পরে অতিরিক্ত ঘাম, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা কিংবা সংজ্ঞা হারানোর মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধক একুশে পদকপ্রাপ্ত দৈনিক আজাদীর সম্পাদক এম এ মালেক বলেন, ‘দেশে হার্ট অ্যাটাকের প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। আগে বেশি বয়সী মানুষ আক্রান্ত হলেও এখন তরুণদের মধ্যেও এ রোগ বাড়ছে। মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ও মানসিক চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারলে অনেকাংশে এ সমস্যা মোকাবিলা সম্ভব।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন হৃদ্রোগকে দেশের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি একে নগরের জলাবদ্ধতার সঙ্গে তুলনা করে বলেন, যেভাবে নালা বা খাল বন্ধ হয়ে গেলে পানি জমে যায়, একইভাবে রক্তনালিতে ব্লক তৈরি হলে হার্ট অ্যাটাক হয়।
আরও পড়ুন
মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় কাজের দ্বৈততা কমাতে আসছে সমন্বিত কাঠামো
শিশুকে টিকা দিতে অভিভাবকদের ফোনে যাবে ‘পুশ নোটিফিকেশন’
শাহাদাত হোসেন আরও বলেন, চট্টগ্রামে মেজবানসহ অতিরিক্ত গরুর মাংস খাওয়ার প্রবণতাও হৃদ্রোগ বৃদ্ধির একটি কারণ। অতিরিক্ত চর্বি ও কোলেস্টেরল শরীরে নানা জটিলতা তৈরি করে।
চট্টগ্রাম হার্ট ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি জেনারেল ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদ্রোগ বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. প্রবীর কুমার দাশ বলেন, রক্তনালিতে চর্বি জমে ব্লক তৈরি হওয়াই হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম কারণ। ধূমপান, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল এ ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। বর্তমানে এনজিওগ্রামের মাধ্যমে হার্টের ব্লক শনাক্ত করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সময়মতো চিকিৎসা শুরু হলে রোগীর জীবন বাঁচানোর সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।
সাউদার্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আনোয়ারুল হক চৌধুরী বলেন, দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ও শারীরিক সমস্যার কারণেই ধীরে ধীরে হৃদ্রোগ তৈরি হয়।
অধ্যাপক ডা. এ কে এম মনজুর মোর্শেদ বলেন, যন্ত্রনির্ভর জীবনে মানুষের শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়ায় স্থূলতা ও ডায়াবেটিস বাড়ছে, যা হৃদ্রোগের ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে। তিনি প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটার পরামর্শ দেন।
সেমিনারে বক্তারা হৃদ্রোগ প্রতিরোধে নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান ও মাদক পরিহার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এমডিআইএইচ/একিউএফ