চোখ-কান-নাক দিয়ে ঝরছে রক্ত : কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না চিকিৎসকরা

সাদ্দাম হোসাইন
সাদ্দাম হোসাইন সাদ্দাম হোসাইন
প্রকাশিত: ০১:৫৮ পিএম, ২৭ মে ২০১৮

হঠাৎ করেই উপশমের কোনো লক্ষণ ছাড়াই নাক-কান-চোখ এবং মুখ দিয়ে নির্গত হচ্ছে তাজা রক্ত। এমনকি নাভি দিয়েও রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এমন বিরল রোগে আক্রান্তদের মাঝে কেউ কেউ তীব্র যন্ত্রণাসহ অচেতন হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। কিন্তু কেন এমনটা হচ্ছে তার সঠিক কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। পরীক্ষা-নিরীক্ষায়ও কোনো রোগ ধরা পড়ছে না। স্বনামধন্য হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হয়েও মিলছে না কার্যকরী প্রতিকার। এতে ভুক্তভোগী রোগী ও স্বজনদের মাঝে দেখা দিয়েছে শঙ্কা। সেই সঙ্গে রোগের প্রকৃত কারণ বের করতে বিপাকে পড়ছেন চিকিৎসকরা।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ঠিক কী ধরনের রোগ তা নির্ণয় করা খুবই কঠিন। কেননা এ ধরনের রোগ আগে কখনও ঘটেনি। এমনকি এ ধরনের রোগের প্রতিকার নিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানেও তেমন কোনো চর্চা নেই। তাই নিঃসন্দেহে এটি খুবই বিরল রোগ। ধারণা করা হচ্ছে, এটি রক্তনালীর বিকলাঙ্গতা থেকে হতে পারে। তাই চিকিৎসকরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এ রোগের প্রকৃত কারণ ও প্রতিকার উদঘাটন করতে।

দেশে এখন পর্যন্ত এমন বিরল রোগে আক্রান্ত নোয়াখালী, পটুয়াখালী ও মোলভীবাজারের তিন রোগীকে পাওয়া গেছে। যাদের সবার রোগের লক্ষণ প্রায় একই। প্রথমে নাক এবং কান দিয়ে রক্তক্ষরণ হলেও পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তা চোখ-মুখ এবং নাভি দিয়ে ক্ষরণ হচ্ছে। এমন রোগের প্রতিকার খুঁজতে তাদের স্বজনরা জেলা-উপজেলা থেকে শুরু করে শহর-নগরের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছেন। কিন্তু মিলছে না কোনো প্রতিকার। কেউ কেউ দীর্ঘদিন ধরে এ রোগের চিকিৎসায় বিপুল অর্থ ব্যয় করে এখন নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। এখন অবস্থা এমন হয়েছে যে, পরবর্তীতে এ রোগের চিকিৎসা করানোর সামর্থই আর নেই তাদের। তবুও তাদের প্রত্যাশা এ রোগের প্রকৃত চিকিৎসা খুঁজে পাবেন চিকিৎসকরা।

সর্বশেষ এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রামপুর ইউনিয়নের ইমাম উদ্দিনের মেয়ে নাদিয়া আক্তার। সে স্থানীয় বামনী আছিরিয়া ফাজিল মাদরাসার দশম শ্রেণির ছাত্রী। আগামী বছর দাখিল পরীক্ষা দেয়ার কথা তার। ২০১৭ সালের নভেম্বরে একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখে বিছানার বালিশ রক্তে ভিজে গেছে। পরক্ষণে বুঝতে পারে তার নাক এবং মুখ দিয়েই ঝরছে এ রক্ত। বাবা-মা এ দৃশ্য দেখে হতভম্ব হয়ে পড়েন। 

পরে তাকে দ্রুত নোয়াখালী জেলারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে এর কোনো চিকিৎসা না থাকায় ডাক্তাররা তাকে ঢাকা নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। এরপর তাকে ১ সপ্তাহ আগে নিয়ে আসা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে। বর্তমানে সে ঢামেকের ৩০৬ এর মহিলা ওয়ার্ডে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. মুক্তি রাণী মণ্ডলের অধীনে চিকিৎসাধীন আছে। সেখানে ১ সপ্তাহ ধরে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেও প্রকৃত রোগ ধরা না পড়ায় এখনও তাকে কোনো ওষুধ সেবনের নির্দেশনা দেয়া হয়নি। 

Bloodনাদিয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘এর আগেও আমাকে টঙ্গীর হোসেন মার্কেটে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ দেখানো হয়েছে। সেখানে কোনো ব্যবস্থা না হওয়ায় পরে খিদমাহ্ এবং বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে দেখানো হয়েছে। এখন নিরূপায় হয়ে ঢাকা মেডিকেলে আনা হয়েছে। এখানেও এক সপ্তাহ ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিচ্ছে ডাক্তারে কিন্তু কোনো রোগ ধরা পড়ছে না। এজন্য কোনো ওষুধও খাওয়া হচ্ছে না।’ এ রোগের কারণে তার স্বাভাবিক জীবন ও পড়ালেখার ব্যাঘাত ঘটছে জানিয়ে এজন্য নাদিয়া সবার দোয়া ও সহযোগিতা চেয়েছেন।

ঢামেকের নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ ডা. মুক্তি রাণী মণ্ডল বলেন, ‘নাদিয়ার চিকিৎসায় এখনও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। সে সবের কিছু রিপোর্ট পেয়েছি, কিন্তু কোনো রোগ ধরা পড়েনি। তারপর আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। সেগুলোর রিপোর্ট পেলে তার রোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে বসে আলোচনা করা হবে। হাসপাতালের পরিচালক এ বিষয়ে অবগত আছেন। তিনি বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নিয়েছেন। প্রয়োজন হলে বিদেশি চিকিৎসকদেরও পরামর্শ নেয়া হবে বলে তিনি আমাদের জানিয়েছেন। ‘

একই রোগে আক্রান্ত মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের বাবনিয়া গ্রামের আব্দুস শহিদের ছেলে পাবেল আহমদ (১৫) এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়ার ধানখালী ইউনিয়নের পাঁচজুনিয়া গ্রামের মামুন হোসেনের মেয়ে ফাতিমা জিনাত মীম (১৮)। পাবেল স্থানীয় বাবনিয়া হাসিমপুর নিজামিয়া মাদরাসার ৮ম শ্রেণির ছাত্র এবং মীম নারায়ণগঞ্জের সরকারি মহিলা কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী। 

২০১৬ সালের ৪ আগস্ট প্রথম মীমের ডান চোখ দিয়ে রক্ত পড়া শুরু হয়। এরপর দুচোখ এবং নাক-কান ও নাভী দিয়েও রক্ষক্ষরণ হতে থাকে। মেয়ের চিকিৎসায় প্রায় ৭ লাখ টাকা ব্যয় করেছে মধ্যবিত্ত বাবা মামুন হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমি সামান্য একটা ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করি। তারপরও মেয়ের চিকিৎসায় অনেক টাকা ব্যয় করেছি কিন্তু কোনো চিকিৎসা এখনও পেলাম না। কী রোগ সেটাও জানতে পারলাম না।’

একই অবস্থা পাবেলের পরিবারের। তার মা তৈয়বুন বেগম বলেন, ‘প্রায় তিন বছর ধরে খুঁজছি এ রোগের চিকিৎসা, কোথাও পাইনি। চিকিৎসার সন্ধান পেলে ছেলেকে বাঁচাতে প্রয়োজনে বিদেশ নিয়ে যাব।’

মিটফোর্ড হাসপাতালের নাক-কান-গলার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. মনিলাল আইচ বলেন, ‘এটি আসলে কী রোগ তা নির্ণয়ের চেষ্টা চলছে। খুবই বিরল রোগ এটি। এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বিশ্বে খুবই কম। বলতে গেলে হাতে গোনা দু’চার জন। তবে ধারণা করছি, রক্তনালীর বিকলঙ্গতা থেকে হতে পারে এটি। এছাড়া আরও অন্যান্য কারণও থাকতে পারে। আবার এটি হেমোলাক্রিয়া বা টেলেনজেক্টেশিয়াও হতে পারে। তবে দেশে আক্রান্ত ওই তিনজনের ভেতর কোন ধরনের রোগ বিরাজ করছে তা এখনই বলা যাচ্ছে না।‘

ঢামেকের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘আমার দীর্ঘ চিকিৎসা জীবনে এমন রোগের আবির্ভাব দেখিনি। তাই এ রোগ সম্পর্কে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না।’ তার ধারণা এটি বিরল রোগ হলেও বাংলাদেশে এর চিকিৎসা নিশ্চয় সম্ভব হবে। তবে এজন্য বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় বসতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

এসএইচ/এমএমজেড/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :