‍‍‍‍একটি ‘বিতর্কিত’ নির্বাচন ও বিজেপির নজিরবিহীন জয়, নেপথ্যে কী?

মো: শাহিন মিয়া
মো: শাহিন মিয়া মো: শাহিন মিয়া
প্রকাশিত: ০৫:৩৩ পিএম, ০৫ মে ২০২৬
নরেন্দ্র মোদী ও মমতা ব্যানার্জী/ ছবি: এএফপি (ফাইল)

ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন হয়েছে। এরই মধ্যে নির্বাচনের ফলাফলও ঘোষণা করা হয়েছে। তবে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক যেন থামছেই না।

এই নির্বাচনে নজিরবিহীন সফলতা দেখিয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ২৯৪টি আসনের মধ্যে বিজেপি ২০৭টি আসনে জয় পেয়েছে। ২০২১ সালে দলটি ৭৭টি আসনে জয় লাভ করে। যা ছিল ইতিহাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০১৬ সালের নির্বাচনে বিজেপি মাত্র তিনটি আসনে জয় পায়।

অন্যদিকে ২০২৬ সালের নির্বাচনে প্রায় ভরাডুবি হলো মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের। মাত্র ৮০টি আসনে জয় পেয়েছে। যেখানে ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূলের আসন ছিল ২১৫টি। ২০১৬ সালে পায় ২১১টি।

মমতা ব্যানার্জী এখনো নির্বাচনের ফলাফল মানছেন না। তিনি কারচুপি ও ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ তুলছেন কেন্দ্রীয় সরকারে বিরুদ্ধে। অভিযোগ করে বলছেন শতাধিক আসন লুট করা হয়েছে।

ঠিক তার সুরেই কথা বলছেন ভারতীয় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও। তার দল পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় মাত্র দুইটি আসনে জয় পেয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা এক পোস্টে রাহুল গান্ধী বলেন, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচন নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, যেখানে বিরোধী পক্ষ দাবি করেছে যে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কারচুপি হয়েছে এবং এর পেছনে শাসক দল ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা রয়েছে।

আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন স্পষ্টভাবে প্রভাবিত হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জীর বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে রাহুল বলেন, রাজ্যে ১০০টিরও বেশি আসন ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে পদ্মফুল ফুটেছে বলে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। ফেসবুক পোস্টে মোদী লিখেছেন, পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফুটেছে! ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। জনতার শক্তি জয়ী হয়েছে এবং বিজেপির সুশাসনের রাজনীতি বিজয়ী হয়েছে। আমি পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি মানুষকে প্রণাম জানাই।

তবে এই নির্বাচন নিয়ে চলছে জোরালো বিতর্ক। বিশেষ করে এসআইআর ও বিশাল কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন এবং তাদের ভূমিকা নিয়ে।

এসআইআরের নামে ভারতের নির্বাচন কমিশন প্রায় ৯৫ লাখ মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে, যা মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ।

দেশটির নির্বাচন কমিশন বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তালিকা হালনাগাদ করেছে। তাদের দাবি, মৃত, অনুপস্থিত বা ডুপ্লিকেট ভোটারদের বাদ দেওয়ার জন্য এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে বিরোধী দল ও বিভিন্ন সংগঠন অভিযোগ করেছে, এ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পশ্চিমবঙ্গের যেসব জেলায় মুসলিম জনসংখ্যা বেশি, সেখানে নাম বাদ পড়ার হারও বেশি। যেমন- মুর্শিদাবাদে প্রায় ৪ লাখ ৬০ হাজার নাম বাদ, উত্তর ২৪ পরগনায় ৩ লাখ ৩০ হাজার, মালদায় ২ লাখ ৪০ হাজার। গবেষকদের মতে, কিছু এলাকায় বাদ পড়া ভোটারের ৯৫ শতাংশ পর্যন্তই মুসলিম।

বিরোধীদের দাবি মূলত বিরোধীদের ভোট কমানোই ছিল এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য। কারণ অতীতের নির্বাচনের ভোট বিশ্লেষণে দেখা গেছে মুসলিমদের ভোট সাধারণত মমতা ব্যানার্জীর দলেই যায়। আর মুসলিমদের বিশাল ভোটব্যাংক পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।

তাই বিরোধীদের দাবি, এসআইআরের নামে মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে ক্ষমতায় যেতে চেয়েছে বিজেপি। যার বাস্তব চিত্র এবারের নির্বাচনে দেখা যাচ্ছে।

তাছাড়া বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-কে সামনে রেখে কেন্দ্রীয় বাহিনীর মোতায়েন নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তোলেন মমতা ব্যানার্জী। তিনি অভিযোগ করেন, দুই লক্ষেরও বেশি কেন্দ্রীয় বাহিনী, যার মধ্যে সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স ও বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স রয়েছে, মোতায়েন করা হয়েছে তার দলকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে।

মমতা প্রশ্ন তোলেন, সাঁজোয়া যানসহ এত বিপুল বাহিনী মোতায়েনের উদ্দেশ্য কি ভোটারদের ও তার দলের কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা। তিনি অভিযোগ করেন, এই বাহিনী ভারতীয় জনতা পার্টির পক্ষে কাজ করছে এবং অভূতপূর্ব নির্যাতন চালাচ্ছে।

মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলে বলেন, এই বাহিনী মোতায়েনের মাধ্যমে রাজ্যে ভয়ভীতি তৈরি করা হচ্ছে, যা নির্বাচনের পরিবেশ প্রভাবিত করতে পারে।

তবে এবারের নির্বাচনে যে শুধু এসআইআর বা কেন্দ্রীয় সরকারের নানা পদক্ষেপ প্রভাব ফেলেছে তা নয়। এবারই পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম ভোটারদের মধ্যে বড় বিভাজন দেখা গেছে। এবার সব মুসলিম ভোট তৃণমূলের ব্যালটে পড়েনি। একদিকে হিন্দু ভোটের সংহতি এবং অন্যদিকে মুসলিম ভোটের বিভাজন—এই দুই কারণই দলের সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

মুসলিমদের কিছু ভোট পেয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। আবার কিছু পেয়েছে ভারতীয় কংগ্রেস। বাবরি মসজিদ নির্মাণ করতে যাওয়া হুমায়ন কবিরও মুসলিম ভোটে ভাগ বসিয়েছেন। একইভাবে নওশাদ সিদ্দিকের বাম ফ্রন্ট মুসলিম ভোট আকৃষ্ট করেছে। ফলে স্পষ্টভাবেই মুসলিম ভোটারদের মধ্যে ভাগ দেখা যাচ্ছে।

অন্যদিকে ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা মমতা ব্যানার্জীর দল তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি মানুষ ক্ষুব্ধ। কারণ অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে গত ১৫ বছরে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। ছিল দুর্নীতি ও বেকারত্বের অভিশাপ।

তবে বিজেপির বিভাজনের রাজনীতিও ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলছে। দলটির নেতারা সব সময় তৃণমূলকে মুসলিম ঘেঁষা বলে অভিযোগ করে আসছে। তাদের দাবি ছিল মমতা ব্যানার্জীর সরকার সব সুযোগ সুবিধা মুসলিমদের দিচ্ছে। এমনও দাবি করা হয়েছে মুসলিমরা পশ্চিমবঙ্গ দখল করে ফেলবে। এভাবে দিনের পর দিন ভিত্তিহীন দাবি করে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের ক্ষেপিয়ে তোলা হয়।

এমএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।