বালিশ-কেটলি ওঠানোর খরচ শুনে হাসলেন বিচারপতিরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:১০ পিএম, ২০ মে ২০১৯

পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আওতাধীন গ্রিন সিটি প্রকল্পের আসবাবপত্র কেনা ও ফ্লাটে ওঠানোয় অনিয়মের বিষয়ে হাইকোর্টের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার দুপুর দেড়টার দিকে শুনানি শুরু হয়ে চলে ১৫ মিনিটের মতো। এর মধ্যে আদালত রিটকারী ও রাষ্ট্র উভয়পক্ষের শুনানি শেষে মামলাটি স্ট্যান্ডওভার (মুলতবির) আদেশ দেন।

এ ছাড়া অবকাশকালীন ছুটি শেষে ঈদের পর কোর্ট খোলার এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন দুটি দাখিল করতে বলেন আদালত।

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন রিটকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তার সঙ্গে ছিলেন ডেপুর্টি অ্যাটর্নি জেনারেল আমাতুল করিম।

এর আগে রিট মামলাটি শুনানির জন্য কজলিস্টের (কার্যতালিকার) দ্বিতীয় নম্বরে ছিল। অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতে আসার পর এ বিষয়ে শুনানি করেন আদালত।

প্রথমে রিটকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ সাইয়েদুল হক সুমন বালিশ ও কেটলি ওঠানোর খরচের বিষয়টি যখন আদালতে তুলে ধরছিলেন তখন বিচারপতিরা হাসছিলেন। এ সময় হাইকোর্টের এজলাস কক্ষে উপস্থিত সব আইনজীবীরাও হাসাহাসি করছিলেন। আগে থেকেই এ রিট মামলার শুনানিতে ভিড় করেন সুপ্রিম কোর্টের উৎসুক আইনজীবীরা।

রিটকারী আইনজীবী শুনানিতে বলেন, ‘১২৫টি ফ্ল্যাটের মালামাল কিনতে ও ওঠাতে ২৫ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে, যা প্রত্যেক ফ্ল্যাটের জন্য খরচ পড়ে ২২ লাখ ৭০ হাজার টাকার মতো।’

সুমন বলেন, ‘একটি বালিশ কিনতে ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা আর এটা ফ্ল্যাটে ওঠাতে ৭৬০ টাকা খরচ হয়। আর এক কেজির একটি কেটলি কিনতে এবং ফ্ল্যাটের ওপরে তুলতে অস্বাভাবিক খরচ গুনতে হয়। এটা কেমন শোনায়। এ বিষয়টি সোস্যাল মেডিয়াতে খুব আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে।’

এ সময় আদালত জানতে চান কতগুলো ফ্ল্যাটে আসবাবপত্র কিনতে ২৫ কোটি টাকা খরচ করেছে।

সুমন জানান, এসব পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়েছে। আমার কাছে প্যাসিফিক হিসাব নেই। আদালত বলেন, এটা কি লোকাল অফিসারদের জন্য নাকি ফরেনারদের জন্য। রিটকারী আইনজীবী বলেন, লোকাল অফিসারদের ফ্ল্যাটের আসবাবপত্র।

এ পর্যায়ে রিটের আদেশের বিরোধিতা করে শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ওই ঘটনায় গণপূর্তের করা দুটি তদন্ত কমিটির কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘এরই মধ্যে দুটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তারা সাত দিনের মধ্যে রিপোর্ট দেবে। এ রিপোর্টটা আগে আসুক। তারপর যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। সে পর্যন্ত স্ট্যান্ডওভার রাখা যেতে পারে।’

এ সময় আদালতের শুনানিতে ব্যারিস্টার সুমন আবারও বলেন, ‘রূপপুর প্রকল্প নিয়ে আমার কোনো প্রশ্ন নেই। তাদের সততার বিষয়েও কোনো প্রশ্ন তুলছি না। কিন্তু তারা ফ্ল্যাটে ওঠানোর জন্য আসবাবপত্র কিনতে যে খরচ করেছেন তা অস্বাভাবিক। আর যে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে সেটা গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের। যেহেতু বিষটি পূর্ত মন্ত্রণালয়ের সেখানে তাদের তদন্ত কতটুকু নিরপেক্ষ হয়। সেটা যাতে একটি স্বতন্ত্র কমিটির মাধ্যমে তদন্ত করা হয়। তাই নির্দেশনা চেয়েছিলাম।’

এর আগে ওই গ্রিন সিটি আবাসন পল্লীর বিছানা, বালিশ, আসবারপত্র অস্বাভাবিক মূল্যে কেনা ও তা ভবনে তোলার ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়ে রোববার (১৯ মে) হাইকোর্টে রিটটি করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন জনস্বার্থে এ রিট করেন।

পরে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন ভবনে আসবাবপত্রসহ অন্য আনুষঙ্গিক কাজের দরপত্রের বিষয়ে জুডিশিয়াল ইনকোয়ারি চেয়ে করা রিটের শুনানি স্ট্যান্ডওভার (মুলতবি) করেন হাইকোর্ট।

সোমবার হাইকোর্টের বিচারপতি তারিক উল হাকিম ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়ারদীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

আদেশের পর ব্যারিস্টার সুমন সাংবাদিকদের বলেন, ‘গ্রিন সিটি আবাসন পল্লীতে ফার্নিচার, বিভিন্ন বালিশসহ জিনিসপত্র তোলার নামে দুর্নীতির যে অভিযোগ, সে অভিযোগ নিয়ে রিট করেছিলাম। রিটে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, পাবনার গণপূর্ত অফিসারসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়। রিট করার পর পরই ওইদিন (১৯ মে) বিষয়টি তদন্তে গণপূর্ত বিভাগ দুটি তদন্ত কমিটি করেন।’

‘আজকে আমরা ওই রিটের শুনানি করি। অ্যাটর্নি জেনারেলও শুনানি করেছেন। আমরা বলেছি, আমরা একটি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনকোয়ারি কমিটি চাই, আমরা জুডিশিয়াল ইনকোয়ারি চাই। আমরা বলেছি, প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখিয়েছেন। আমরা এখানে বসে থাকতে পারি না। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন দুটি কমিটি গঠন হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেয়ার কথা বলা আছে। আদালত দুই পক্ষের কথা শুনে সাত দিনের মধ্যে যে রিপোর্ট দেয়ার কথা, সেটা ঈদের ছুটির পর এক সপ্তাহের মধ্যে হাইকোর্টে জমা হবে। এ রিপোর্ট আসার পর এটাকে সামনে নিয়ে আবার শুনানি করতে স্ট্যান্ড ওভার রাখা হয়েছে,’ বলেন ব্যারিস্টার সুমন।

এদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন ভবনে আসবাবপত্রসহ অন্য আনুষঙ্গিক কাজের দরপত্রের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে তা তদন্তে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

রোববার (১৯ মে) গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. ইফতেখার হোসেন স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ডেলিগেটেড ওয়ার্ক হিসেবে গণপূর্ত অধিদফতর নির্মাণাধীন ৬টি ভবনে আসবাবপত্রসহ অন্য আনুষঙ্গিক কাজের জন্য দাফতরিক প্রাক্কলন প্রণয়নপূর্বক ৬টি প্যাকেজে ই-জিপিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়। প্যাকেজের প্রতিটির ক্রয়মূল্য ৩০ কোটি টাকার নিম্নে প্রাক্কলন করায় গণপূর্ত অধিদফতর অনুমোদন ও ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়। এ ক্ষেত্রে দাফতরিক প্রাক্কলন প্রণয়ন, অনুমোদন ও ঠিকাদার নিয়োগে মন্ত্রণালয়ের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

এ বিষয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে একজন অতিরিক্ত সচিব এবং গণপূর্ত অধিদফতর থেকে একজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর নেতৃত্বে আলাদা দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের পেমেন্ট বন্ধ রাখতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে ইতোমধ্যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

আলোচ্য কাজের বিপরীতে এখনও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে বিল পরিশোধ করা হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশের আলোকে বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে বিল পরিশোধের বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে।

গ্রিন সিটিতে আসবাবপত্র ও অন্যান্য জিনিসপত্র ক্রয়ে লাগামছাড়া দুর্নীতির তথ্য সম্প্রতি ফাঁস হয়। এতে দেখা যায়, একটি বালিশের পেছনে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৬ হাজার ৭১৭ টাকা। এর মধ্যে এর দাম বাবদ ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা আর সেই বালিশ নিচ থেকে ফ্ল্যাটে ওঠাতে খরচ ৭৬০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারি টাকায় আকাশ সমান দামে এসব আসবাবপত্র কেনার পর তা ভবনের বিভিন্ন ফ্ল্যাটে তুলতে অস্বাভাবিক হারে অর্থ ব্যয়ের এ ঘটনা ঘটিয়েছেন গণপূর্ত অধিদফতরের পাবনা গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা।

কেজি খানেক ওজনের একটি বৈদ্যুতিক কেটলি নিচ থেকে ফ্ল্যাটে তুলতেই খরচ হয়েছে প্রায় তিন হাজার টাকা। একই রকম খরচ দেখানো হয়েছে জামা-কাপড় ইস্ত্রি করার কাজে ব্যবহৃত প্রতিটি ইলেকট্রিক আয়রন ওপরে তুলতে; প্রায় আট হাজার টাকা করে কেনা প্রতিটি বৈদ্যুতিক চুলা ফ্ল্যাটে পৌঁছে দিতে খরচ দেখানো হয়েছে সাড়ে ছয় হাজার টাকার বেশি।

শুধু তাই নয়; প্রকল্পটির গাড়ি চালকের বেতন ৭৩ হাজার ৭০৮ টাকা, যা একজন সচিবের কাছাকাছি। বর্তমানে সচিবের বেতন ৭৮ হাজার টাকা। তবে প্রকল্পটির গাড়িচালকরা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দায়িত্বও পালন করতে পারবেন। এতে আরও ১৮ হাজার টাকা পাবেন গাড়িচালকরা। এতে তাদের বেতন দাঁড়াবে ৯১ হাজার ৭০৮ টাকা। প্রকল্পটির সর্বনিম্ন বেতন রাঁধুনি বা মালির। প্রকল্প থেকে তিনি বেতন পাবেন ৬৩ হাজার ৭০৮ টাকা। আর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালন করলে অতিরিক্ত পাবেন ১৬ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে তার বেতন পড়বে ৭৯ হাজার ৭০৮ টাকা, যা সচিবের বেতনের চেয়েও বেশি।

এফএইচ/জেডএ/এনডিএস/এমকেএইচ/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :