পর্নোগ্রাফিতে নারী ভিকটিমের বিষয়টি সহজভাবে দেখার সুযোগ নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:১৯ পিএম, ১৮ জুন ২০১৯

পর্নোগ্রাফিতে নারীর ভিকটিমের বিষয়টি সহজভাবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট। রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে ভাড়া বাসায় অর্থের বিনিময়ে অনলাইনে নগ্ন ভিডিও চ্যাটিংয়ের ঘটনার তথ্য গোপন ও জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তি না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে করা রিটের শুনানিতে এমন মন্তব্য করেন আদালত।

সঙ্গে রুল জারি করেছেন আদালত। জারি করা রুলে, পর্নোগ্রাফি আইন অনুযায়ী যথাযথ শাস্তি না দিয়ে জড়িতদেরকে ঘটনার একদিন পরে একমাসের কারাদণ্ড দেয়া কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না রুলে তা জানতে চাওয়া হয়েছে।

আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, আইন সচিব, পুলিশের (মহাপরিদর্শক) আইজিপি, গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও গোদাগাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন সংযুক্ত করে জনস্বার্থে করা রিটের শুনানি নিয়ে মঙ্গলবার হাইকোর্টের বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এমন মন্তব্য করে রিটের বিষয়ে রুল জারি করে আদেশ দেন।

আদালতে আজ রিটের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান। তার সঙ্গে ছিলেন অ্যাডভোকেট মশিউর কবীর। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ইকরামুল হক টুটুল।

আদেশের পর ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ইকরামুল হক টুটুল ও রিটকারী আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান জাগো নিউজকে বলেন, কোনো ঘটনায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে হলে তাকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সেটা নিজের চোখে দেখে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা (শাস্তি প্রদান) করবেন। কিন্তু এখানে অনলাইনে অর্থের বিনিময়ে নগ্ন ভিডিও চ্যাটিং করায় গোদাগাড়ীর দুই নারীসহ তিনজনকে যে শাস্তি দেয়া হয়েছে তা ঘটনার একদিন পর একমাস করে তাদেরকে কারাদণ্ড হয়েছে। এটা মোবাইল কোর্টের আইনের পরিপন্থী। তাই সেই বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করে জনস্বার্থে একটি রিট করা হয়েছিল ওই রিটের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন।

আইনজীবীরা জানান, ‘পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২’ এর ৮ এর (১) অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি পর্নোগ্রাফি উৎপাদন করলে বা করবার জন্য অংশগ্রহণকারী সংগ্রহ করে চুক্তিপত্র, করিলে অথবা কোনো নারী, পুরুষ বা শিশুকে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করলে অথবা কোনো নারী, পুরুষ বা শিশুকে প্রলোভনে অংশগ্রহণ করাইয়া তার জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে স্থিরচিত্র, ভিডিও চিত্র বা চলচ্চিত্র ধারণ করিলে তিনি অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবে এবং অপরাধের জন্য তিনি সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

রিটকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান জাগো নিউজকে বলেন, পর্নোগ্রাফির ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ভিকটিসাইজ হয় নারীরা। যে নারী বা শিশুটি ধর্ষণের শিকার, সে পরে অবহেলিত হয়। কারণ এ ধরনের পর্নোগ্রাফি সাধারণত মেয়েটির অগোচরেই করা হয়। আর সে পরে সমাজে হয়ে যায় একেবারেই অবহেলিত।

তার পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন সমাজে হেয় প্রতিপন্ন হয়। আর রাজশাহীর গোদাগাড়ীর একটি এলাকা বাসা ভাড়া নিয়ে অশালীন কাজ করে আবার তারা পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয় তোমরা কাজে যোগ দান করো। সমাজের অবস্থা এখন কত জঘন্য পর্যায়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, এমন অশালীন কাজ চালানোর পর স্থানীয় জনগণের চোখে ধরা পড়ে। আর সেই ঘটনায় জড়িতদের বাঁচানোর জন্য গ্রেফতার করার একদিন পর পুলিশ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ঘটনা ধাঁমাচাপা দেয়ার জন্য তড়িঘড়ি করে এক মাসের সাজা দিয়ে দিলো। এই ঘটনা সাংবাদিকরা পত্রপত্রিকায় প্রকাশ না করতো তা হলে কেউ জানতেও পারতো না।

তিনি আরও বলেন, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে শাস্তি হওয়ার কথা ৫ থেকে ৭ বছর। সেখানে ৮ মে ঘটনায় আসামিদের গ্রেফতার করে কারাগারে না পাঠিয়ে পরের দিন ৯ মে মোবাইল কোর্ট দিয়ে এক মাস সাজা দেয়া হলো। তাই গোদাগাড়ীর এই পর্নোগ্রাফিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য নির্দেশনা চেয়ে জনস্বার্থে আমার (ইশরাত হাসানের) পক্ষে আইনজীবী ব্যারিস্টার অনিক আর হক এই রিট করেছিলেন।

উল্লেখ্য, এর আগে গত ১০ মে ‘অশালীন ভিডিও চ্যাটিং তিনজনের কারাদণ্ড’ শিরোনামে দেশের জাতীয় দৈনিকে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজশাহীর গোদাগাড়ী থেকে অনলাইনে অর্থের বিনিময়ে নগ্ন ভিডিও চ্যাটিং চক্রের দুই নারী সদস্যসহ তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ।

৮ মে রাত ১১টার দিকে গোদাগাড়ী পৌর এলাকার মেডিকেল মোড়ের একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ওই তিনজনকে আটক করে পুলিশ। ৯ মে পুলিশ তাদের ভ্রাম্যমাণ আদালতে হাজির করে। পরে নির্বাহী হাকিম গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিমুল আকতার এই দণ্ড দেন।

দণ্ডপ্রাপ্তরা হলো- নাটোরের আলাইপুরের খলিলুর রহমানের ছেলে মেহেদী হাসান (২৫), চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের হযরত আলীর মেয়ে হাবিবা খাতুন (১৮) ও একই উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের সুমন হোসেনের মেয়ে মোছা. সুরভী বেগম (১৮)।

একই সঙ্গে, তিনি জব্দকৃত দুটি ল্যাপটপ, একটি কম্পিউটার, বিভিন্ন কোম্পানির ৩৫টি সিম কার্ড, ২৫টি ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ধ্বংস করার নির্দেশ দেন।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দন্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বিভিন্ন অপারেটরের ৩৫টি সিম ব্যবহার করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে ভিডিও কল করতেন। তারা নগ্ন ছবি ও ভিডিও পোস্ট করে আসছিলেন। বিকাশে টাকা দিলে তারা ভাইবার, ইমো, মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় ভিডিও সেক্স চ্যাটিং করতেন। এমনকি তারা বিদেশি বিভিন্ন চ্যাটিং সাইটে যুক্ত হয়েও নগ্ন ভিডিও চ্যাটিং করে আসছিলেন। তাদের এ কাজে লোক বাড়াতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিও দিয়েছিল এই চক্র।

পুলিশ জানায়, আটক মেহেদী হাসান এবং ওই দুই নারী সহকারী তিন মাস আগে গোদাগাড়ী পৌরসভার মেডিকেল মোড় এলাকার একটি বাড়িতে দুটি কক্ষ ভাড়া নেয়। বাড়িতে ওঠার পর তারা বাইরে বের হতেন না। আশপাশের মানুষের সঙ্গেও মিশতেন না। সন্দেহ হওয়ায় এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা বিষয়টি পুলিশকে জানান। খবর পেয়ে পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে। পুলিশ সেখানে গিয়ে অশ্লীল ভিডিও চ্যাটিং করা অবস্থায় হাতেনাতে তাদের ধরে ফেলে।

এসব ঘটনা পত্রিকায় প্রকাশ হওয়ার পর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জনস্বার্থে রিট আবেদন করেন। রিটে অনলাইনে অর্থের বিনিময়ে নগ্ন ভিডিও চ্যাটিং করায় গোদাগাড়ীর দুই নারীসহ তিনজনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ অর্থাৎ (নিয়মিত মামলা করার নির্দেশ) কেন দেয়া হবে না তার আর্জি জানানো হয়। ওই রিটের শুনানি নিয়ে আদালত আজ এই আদেশ দেন।

আপনার মতামত লিখুন :