গৃহবধূর চুল কেটে নেয়া, প্রতিবেদন জমা দিলেন এসপি

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:৪৯ পিএম, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯

মিথ্যা অপবাদ দিয়ে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় দুই সন্তানের জননীর মাথার চুল বঁটি দিয়ে কেটে দেয়ার ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে হাইকোর্টে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন স্থানীয় পুলিশ সুপার (এসপি)।

প্রতিবেদনে প্রধান আসামি জেলহাজতে বলে উল্লেখ করে বলা হয়, বাকি আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।

আদালতে বুধবার রাষ্ট্রপক্ষে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার। তিনি বলেন, বুধবার এমন প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর আদালত বাকি চার আসামি আটক না হওয়ায় অসন্তুষ্ট হয়েছেন এবং বলেছেন, বাকি আসামিদের গ্রেফতার না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি নজরে রাখবেন। এ বিষয়ে প্রতিবেদন দিয়ে আদালতকে অগ্রগতি জানাতে হবে।

প্রতিবেদনে পুলিশ সুপার (এসপি) টুটুল চক্রবর্তী বলেন, মামলার পর হতে গ্রেফতার এড়ানোর লক্ষ্যে আত্মগোপনে থাকা আসামিদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আসামিদের গ্রেফতারে স্থানীয় এলাকায় একাধিক সোর্স নিয়োগ করেন। সোর্সের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক ও তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে জানা যায় যে, আসামিরা পল্টন ও মতিঝিল থানা এলাকায় অবস্থান করছেন। এমন তথ্য মোতাবেক আসামিদের গ্রেফতারের লক্ষ্যে উল্লাপাড়া থানার পুলিশ পরিদর্শক তদন্ত এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্টন ও মতিঝিল থানা পুলিশের সহায়তায় আসামিদের গ্রেফতারের লক্ষ্যে পুলিশি অভিযান পরিচালনা করে। প্রযুক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে দেখা যায় যে, আসামিরা ঘন ঘন তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেন। পুলিশি তৎপরতার কারণে ১ নম্বর আসামি মো. আব্দুর রশিদ ১০ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির হয়ে আত্মসমর্পণ করেন। বর্তমানে তিনি জেলহাজতে। মামলাটির সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে ওই আসামিকে ১০ দিনের পুলিশ রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।

এর আগে এ বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন ৮ ডিসেম্বর আদালতের নজরে আনেন আইনজীবী ইশরাত হাসান। ওইদিন বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা জানতে চান। সে অনুসারে সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার ও উল্লাপাড়ার স্থানীয় পুলিশের পক্ষে প্রতিবেদন দেয়া হয়।

একটি জাতীয় দৈনিকে গত ৭ ডিসেম্বর ‘মাছকাটা বঁটি দিয়ে গৃহবধূর মাথার চুল কেটে দিল আ.লীগ নেতা’ শীর্ষক প্রকাশিত প্রতিবেদন আদালতের নজরে আনা হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, মিথ্যা অপবাদ দিয়ে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় দুই সন্তানের জননীর মাথার চুল বঁটি দিয়ে কেটে দিয়েছে এক আওয়ামী লীগ নেতা। ভুক্তভোগী ওই গৃহবধূর বাড়ি উধুনিয়া ইউনিয়নের গজাইল গ্রামে।

awamilig

অভিযুক্ত উপজেলার উধুনিয়া ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. আব্দুর রশিদ। ঘটনার সময় তার সঙ্গে চার সহযোগী ছিল বলে জানা গেছে।

গত ২৫ নভেম্বর রাতে চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে। এ ঘটনায় ওই গৃহবধূ নিজেই বাদী হয়ে ২ ডিসেম্বর উল্লাপাড়া মডেল থানায় ওই আওয়ামী লীগ নেতা ও তার চার সহযোগীর বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০/৩০ ধারায় একটি মামলা (নম্বর-২) করেন। মামলার অন্য আসামিরা হচ্ছে- গজাইল গ্রামের মোজাহারের ছেলে মুনসুর (৩৮), বাহের প্রামাণিকের ছেলে আব্দুস সালাম (৪৫), নাসির উদ্দিন (৪০) ও শহীদুল ইসলাম (৩২)।

মামলার পর থেকে আসামিরা ভুক্তভোগীকে হুমকি দিয়ে আসছে। একের পর এক হুমকির ভয়ে ওই গৃহবধূ পার্শ্ববর্তী তরফ বায়রা গ্রামের বাবার বাড়ি গিয়ে আশ্রয় নেন। এ ঘটনার পর থেকে গ্রেফতার এড়াতে ওই আওয়ামী লীগ নেতা ও তার সহযোগীরা আত্মগোপনে থেকে প্রভাবশালীদের মাধ্যমে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে জোর চেষ্টা চালান।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী গৃহবধূ বলেন, গত ২৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় আমি আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার জন্য ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেলের খোঁজে বের হই। পথিমধ্যে একই গ্রামের মৃত আবেদ আলীর ছেলে সাইফুল ইসলামের বাড়ির পাশে উধুনিয়া ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ও গজাইল গ্রামের মৃত বেলায়েত সরকারের ছেলে মো. আব্দুর রশিদ ও তার চার সহযোগী আমার পথরোধ করে। এরপর সাইফুল ইসলামের সঙ্গে আমাকে আপত্তিকর অবস্থায় আটক করেছে বলে চিৎকার শুরু করে।

‘এ সময় গ্রামের লোকজন ছুটে এলে তাদের সামনে আমাকে বিবস্ত্র করে মারপিট করে। এতেও তারা ক্ষ্যান্ত হয়নি। কয়েকশ লোকের সামনে মাছকাটা বঁটি দিয়ে আমার মাথার চুল কেটে উল্লাস করে। এ সময় আমি তাদের কাছে নানা কাকুতি-মিনতি করলেও তারা বিন্দুমাত্র সাহায্য না করে নির্দয়ভাবে আমার মাথার চুল কেটে দেয়।’

ওই গৃহবধূ আরও বলেন, আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রশিদ দীর্ঘদিন ধরে আমাকে নানাভাবে কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিল। এতে আমি রাজি না হওয়ায় এবং আমার বাড়ির ডিস সংযোগ লাইন বারবার কেটে দেয়া নিয়ে তার সঙ্গে পূর্ববিরোধের জের সে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। আমাকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে সবার সামনে মাথার চুল কেটে নির্যাতন করা হয়েছে। এতে আমি সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হয়েছি। এ ঘটনার পর থেকে আমি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছি এবং ভেঙে পড়েছি। রাতে ঠিকমতো ঘুমাতেও পারছি না।

‘এমনকি সমাজের কাছে মুখ দেখাতে পারছি না। লজ্জা ও ঘৃণায় বাড়ি থেকে বের হতে পারছি না। ফলে এক রকম নিজ বাড়িতে অবরুদ্ধ হয়ে গৃহবন্দি হয়ে পড়ে রয়েছি,’ যোগ করেন তিনি।

এফএইচ/এমএআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।