চাঁদপুরের সাবেক চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে তলব

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১:১৬ পিএম, ০৯ নভেম্বর ২০২১
ফাইল ছবি

হত্যাকাণ্ডের মামলায় পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে ১৬ বছর বয়সী আসামির স্বীকারোক্তি আদায়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করার বিষয়ে শোকজের যথাযথ জাবাব না দেওয়ায় সাবেক চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও বাগেরহাটের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বর্তমান বিচারক নুরে আলমকে তলব করেছেন হাইকোর্ট।

একই সঙ্গে ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) চৌধুরী আলমকে তলব করেছেন আদালত। পাশাপাশি মামলার আসামির জামিন এক বছর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

স্মার্টফোনের লোভে একটি হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় চিহ্ন থাকার পরও চাঁদপুরের মতলব থানায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণ করায় এবং তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় তাকে তলব করা হয়। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য তাকে আগামী ২২ নভেম্বর সশরীরে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

ব্যারিস্টার রিমি নাহরিন বিষয়টি জাগো নিউজকে নিশ্চিত করেন।

জামিন সংক্রান্ত আবেদনের বিষয়ে শুনানি নিয়ে মঙ্গলবার (৯ নভেম্বর) হাইকোর্টের বিচারপতি একেএম আব্দুল হাকিম ও বিচারপতি ফাতেমা নজীবের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই আদেশ দেন। আদালতে আজ জামিন আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন মো. খুরশিদ আলম খান ও ব্যারিস্টার রিমি নাহরিন।

আইনজীবী রিমি নাহরিন বলেন, আমরা আসামির জামিন চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেছিলাম। ওই জামিন শুনানিতে আসামিকে নির্যাতন করা হয়েছে, সেই ঘটনাটি উঠে আসে। তখন সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তার (আইও) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ম্যাজিস্ট্রেটকে বলেছিলেন হাইকোর্ট। ওই শোকজের জবাবটি সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে জমা দেন। সেটি আজ হাইকোর্টে উপস্থাপন করা হয়।

‘কিন্তু শোকজের জবাবে তিনি (বিচারক) তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে সেখানকার পুলিশ সুপারকে (এসপি) বলেছিলেন ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। পুলিশ সুপার মৌখিকভাবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থার কথা জানান। তাই আদালত শোকজ নোটিশের জবাব দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং বিচারক ও তদন্ত কর্মকর্তাকে (আইও) তলব করেছেন। আগামী ২২ নভেম্বর তাদের সশরীরে উপস্থিত হতে বলা হয়েছে।’

ব্যারিস্টার রিমি নাহরিন জানান, হাইকোর্টের অপর একটি বেঞ্চ গত ১৪ মার্চ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে কারণ দর্শানোর রুল জারি করেছিলেন। স্মার্টফোনের লোভে চাঁদপুরের মতলব থানায় হত্যাকাণ্ডের মামলায় পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে ১৬ বছর বয়সী আসামির স্বীকারোক্তি আদায়কারী সংশ্লিষ্ট জেলার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে কারণ দর্শানোর রুল জারি করেন হাইকোর্ট। এক মাসের মধ্যে এর যথাযথ ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছিল। একই সঙ্গে মামলার আসামি মো. ফরহাদ হোসেন ওরফে খলুকে জামিন দিয়ে তার প্রকৃত বয়স কত সেটি যাচাই করতে বলেছেন আদালত। হাইকোর্টের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহীম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই আদেশ দেন।

আদালতে ওইদিন রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. সারোয়ার হোসেন বাপ্পী। আর আসামি পক্ষে ছিলেন আবুল জাফর মো. সালেহ। তার সঙ্গে ছিলেন ব্যারিস্টার রিমি নাহরিন।

চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জবানবন্দি গ্রহণ করলেও রেকর্ডে উল্লেখ করেন, আসামির দুই হাতের কব্জির নিচে দড়ি দিয়ে দীর্ঘক্ষণ বেঁধে রাখায় কালসিরা দাগ দেখা যায়। এছাড়া পায়ের ফোলা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, রিমান্ডের ভয়ে এই জবানবন্দী দিয়েছেন তিনি।

হত্যাকাণ্ডের শিকার সোহেল রানার বড় ভাই সিএনজিচালক মো. সাইফুল ইসলাম সোহাগের করা মামলার বিবরণে জানা যায়, চাঁদপুরের মতলব (দক্ষিণ থানার) ১ নং নায়েরগাঁও উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের পিয়ারি খোলার বাসিন্দা সোহেল রানা। তিনি দাউদকান্দির একটি মাদরাসায় পড়তেন। লেখাপড়া ভালো না লাগায় ওই বছর বাড়িতে চলে যান।

পরে গাজীপুরের এক আত্মীয়ের ফার্নিচারের দোকানে প্রায় দুই মাস কাজ করেন এবং কোরবানির ঈদের আগের দিন ২০১৯ সালের ১১ আগস্ট দুপুরের দিকে বাড়ি ফিরে আসেন। ওইদিনই বিদেশ থেকে তার মামার আনা একটি স্মার্টফোন ভাইকে (রানার হাতে) দেন। এরপর তাদের পরিবারের সবাই একত্রে ঈদও উদযাপন করেন।

১৮ আগস্ট বাবার নসিমনে করে পিয়ারি খোলা থেকে নারায়নপুর বাজারে যান তিনি। রাতে জিসানের ছেলে জিহাদের সুন্নতে খৎনার অনুষ্ঠানে গান শুনতে যাবে বলে বের হন রানা।

এজাহার থেকে জানা যায়, ওইদিন অনুষ্ঠান শেষে বাসায় আর ফেরেননি রানা। পরের দিন সাইফুল ও রানার মামা আলমগীর বাড়ির পুকুরের উত্তর ও পূর্বপাশে রানার মস্তকবিহীন মরদেহ দেখতে পান।

১৯ আগস্ট মস্তকবিহীন মরদেহ উদ্ধারের পর হত্যামামলা করা হয়। যেখানে কারও নাম উল্লেখ না করে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। অভিযোগে বিদেশ থেকে নিয়ে আসা মামার স্মার্টফোনকে কেন্দ্র করে ২০১৮ সালের ১৮ আগস্ট সোহেল রানার (১৭) হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে বলে উল্লেখ করা হয়।

এ ঘটনায় মামলা হওয়ার পর সন্দেহভাজন মো. ফরহাদ হোসেন ওরফে খলু (১৬), মেহেদী ও মো. রুবেলকে গ্রেফতার করা হয়। যাদের প্রত্যেকেই স্বীকার করেন, তারা মোবাইলের জন্য সোহেলকে খুন করেছেন। এ মামলায় একই বছরের ৩১ ডিসেম্বর চার্জশিট দেয় পুলিশ।

এদিকে গত ৪ জানুয়ারি বিচারিক (নিম্ন) আদালতে জামিন খারিজ হলে হাইকোর্টে আবেদন করেন ফরহাদ। চার্জশিটে মূল আসামি মো. ফরহাদ। জামিন শুনানির সময় দেখা যায়, ফরহাদের বয়স ১৬ বছর। কিন্তু চার্জশিটে দেওয়া হয়েছে ১৯ বছর।

এসময় আদালত বলেন, কোনো বিচারকের দায়িত্ব জবানবন্দি নেওয়ার সময় কাউকে নির্যাতনের চিহ্ন দেখা গেলে পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। আইনজীবীরা জানান, পুলিশের বিরুদ্ধে তদন্ত না করে জবানবন্দি রেকর্ড করার ঘটনায় শোকজ করা হয় ম্যাজিস্ট্রেট নুরে আলমকে।

এফএইচ/জেডএইচ/জেআইএম/ইএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।